দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা ভিডিও কনটেন্টের মাধ্যমে শেয়ার করে থাকেন ভিডিও শেয়ারিং প্লাটফর্ম টিকটক ব্যবহারকারীরা। বিভিন্ন ধরনের ভিডিওর মধ্যে জনপ্রিয় ভিডিও হচ্ছে স্কিন কেয়ার বা ত্বকের যত্ন। টিকটকে প্রবেশ করলে প্রায়ই দেখা যায়, তরুণীরা তাদের ত্বকের যত্নের প্রসাধনীগুলোর ব্যবহারিতা শেয়ার করছেন।
ত্বকের যত্নে বিভিন্ন প্রসাধনীর ব্যবহার পদ্ধতি এবং ত্বকের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন পরামর্শও দিয়ে থাকেন টিকটক ব্যবহারকারীরা। কিন্তু এক গবেষণায় দেখা গেছে, জনপ্রিয় এই ট্রেন্ডগুলো ভালো কিছু করার থেকে বরং ক্ষতিই বেশি করছে, বিশেষ করে তরুণীদের ক্ষেত্রে। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম সিএনএন’র এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে এ ব্যাপারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা। এতে দেখা গেছে, টিকটকে শেয়ার করা স্কিন কেয়ার রুটিন তরুণীদের ত্বকের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর হতে পারে। প্লাটফর্মে থাকা সেসব রুটিন বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা, যা ৭ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়ে টিকটকাররা শেয়ার করেছেন।
গবেষণায় জানা গেছে, এসব রুটিনে গড়ে ছয়টি পণ্য ব্যবহৃত হয়। যেগুলোর মধ্যে কিছু ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে। যা ত্বকের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বা আজীবন অ্যালার্জিজনিত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশ হয়েছে পেডিয়াট্রিকস জার্নালে। গবেষণায় স্কিন কেয়ার রুটিনের ঝুঁকি নিয়ে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। জানানো হয়েছে, প্রতিটি তরুণীর পণ্য ব্যবহারের গড় খরচ মাসে প্রায় ১৬৮ ডলার এবং ক্ষেত্র বিশেষ তা ৫০০ ডলারেরও বেশি। যদিও এসব রুটিনে রকমারি পণ্য ব্যবহৃত হয়, আর মাত্র এক-চতুর্থাংশ স্কিন কেয়ারে সানস্ক্রিনের ব্যবহার রয়েছে। যা সব বয়সের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, টিকটকে সর্বাধিক ভিউ পাওয়া ভিডিগুলোয় গড়ে ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে ১১টি। যা ত্বককে সূর্যের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীল করে তুলতে পারে এবং ত্বকে এমন অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে, যা আজীবন আপনাকে ভোগাতে পারে। এটি এমন সমস্যা, যা সাধারণ সাবান-শ্যাম্পু কিংবা প্রসাধনীও ব্যবহার কঠিন হয়ে যায়।
নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ফেইনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনের ডার্মাটোলজিস্ট ও গবেষণার প্রধান লেখক ড. মলি হেলস বলেন, অনেক সময় দেখা যায় একই উপাদান একাধিক পণ্যে ব্যবহার করা হয়। এতে করে তরুণীরা নিজের অজান্তেই সেসব উপাদান বারবার ব্যবহার করতে থাকেন, যা ত্বকে অতিরিক্ত জ্বালাপোড়ার কারণ হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হাইএড্রাক্সি অ্যাসিড একাধিক উপাদানে থাকলে সেসব উপাদান ব্যবহারে অতিরিক্ত আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে ত্বকে।
গবেষণায় উদাহরণে দেখানো হয়েছে, একটি টিকটক ভিডিওতে এক তরুণী মাত্র ৬ মিনিটে ১০টি আলাদা পণ্য ব্যবহার করেছেন। ভিডিও চলাকালীন ওই তরুণীর ত্বকে সেসবের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। গবেষকরা উদ্বেগের বিষয়ও তুলে ধরেছেন। অনেক ভিডিওতে সূক্ষ্মভাবে কিছু বার্তা দেয়া হয়, যা ত্বকের রং উজ্জ্বল বা উজ্জ্বল করার দিকে উৎসাহিত করে। এমন বার্তা সৌন্দর্য ও ভোক্তা সংস্কৃতির লাইফস্টাইলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত, যা তরুণদের মনে সৌন্দর্যের মানদণ্ড তৈরি করে। একইসঙ্গে এসব বার্তা তাদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মমূল্যায়নে প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রাখে। টিকটকের স্কিন কেয়ার রুটিনগুলো তরুণ-তরুণীদের ত্বকের স্বাস্থ্যে কোনো উপকারে তো আসে না, বরং এটি তাদের মধ্যে আরও হীনম্মন্যতা সৃষ্টি করে। ক্ষেত্র বিশেষ এই মানদণ্ড ফর্সা হওয়া, পাতলা শরীর ও ত্রুটিহীন ত্বকের ধারণার ওপর গড়ে উঠে।
ড. মলি হেলস সতর্ক করে বলেন, সেলফ-কেয়ার (নিজের যত্ন) হিসেবে যা কিছু তুলে ধরা হচ্ছে, সেসব ক্ষতিকারক সৌন্দর্য মানদণ্ডের প্রচারণা হতে পারে।
এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহের জন্য এক গবেষককে নিয়ে ড. মলি হেলস টিকটকের ১৩ বছর বয়সী হওয়ার অঙ্গীকার জানিয়ে একাধিক অ্যাকাউন্ট তৈরি করেছেন। প্লাটফর্মটির ‘ফর ইউ’ পেজ থেকে স্কিন কেয়ার সংক্রান্ত ১০০টি ভিডিও সংগ্রহ করেছেন তারা। সেসব ভিডিওতে ব্যবহৃত পণ্য, ক্রয় খরচ এবং উপাদানগুলো ব্যাপকভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। পরবর্তীতে উপাদানগুলোকে অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদানের সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, অনলাইনে থাকা ক্ষতিকর স্কিন কেয়ার রুটিনের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রভাবিত হতে পারেন তরুণীরা। কখনো কখনো তরুণীদের অভিভাবক ও চিকিৎসকরা এ ব্যাপারে জানতেও পারেন না। সেসব উপাদান দীর্ঘমেয়াদে ত্বক ও তরুণীদের স্বাস্থ্যের দৃষ্টিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
Leave a Reply