বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
টঙ্গীতে বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার-২ ঢাকায় ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট আমলের সব সার ডিলার বাতিল: চিফ হুইপ ইসির সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আপিলের ঘোষণা মনিরা শারমিনের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করে পরীক্ষার্থীদের খোঁজ-খবর নিলেন বিরোধী দলীয় নেতা বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমেছে, দেশে ভরি কত নতুন করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে কঠোর নির্দেশনা দিলেন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী এক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ পুলিশের ইউনিফর্ম পরিবর্তন প্রক্রিয়া বন্ধ চেয়ে আইনি নোটিশ কৃষি উৎপাদন খরচ কমাতে মাঠ পর্যায়ে ন্যানো-ইউরিয়া সারের সফলতা

কৃষি উৎপাদন খরচ কমাতে মাঠ পর্যায়ে ন্যানো-ইউরিয়া সারের সফলতা

অনলাইন ডেস্ক
  • আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ০ বার
কৃষি উৎপাদন খরচ কমাতে মাঠ পর্যায়ে ন্যানো-ইউরিয়া সারের সফলতা

দেশের কৃষিতে শস্য উৎপাদনে ইউরিয়া সার অত্যন্ত অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। কৃষকরা অন্যান্য সারের তুলনায় এটির ওপর বেশি নির্ভরশীল। তবে মাঠ পর্যায়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে ইউরিয়া প্রয়োগে ব্যাপক অপচয় ঘটে। মাঠে প্রয়োগ করা সারের উল্লেখযোগ্য অংশ বাষ্পীভূত হয়ে যায়, গাছ গ্রহণ করতে পারে না। আবার কিছু অংশ মাটির নিচে লিচিং হয়ে পানিদূষণ ঘটায় কিংবা গ্রিন হাউজ গ্যাস হিসেবে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে। ফলে একদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে পরিবেশ ঝুঁকিতে পড়ছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবেশবান্ধব বায়োচার (কার্বন) সমৃদ্ধ ন্যানো-ইউরিয়া সার মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগে সফলতা দেখিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) পরিচালিত মাঠ পরীক্ষণে ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে ধান ফসলের প্রাথমিক সফলতা পেয়েছেন বলে জানান গবেষকদল।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন এ গবেষণা কার্যক্রমের প্রধান গবেষক ও বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আহমেদ খায়রুল হাসান বাদল। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটেরর (ব্রি) গবেষণা উইংয়ের পরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) সিনিয়র স্পেশালিস্ট ও মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ড. মো. মনোয়ার করিম খান, ব্রি’র মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক, পিএইচডি ফেলো আমজাদ হোসেনসহ এমএস শিক্ষার্থীরা।
বায়োচার (কার্বন) সমৃদ্ধ ন্যানো-ইউরিয়া সার সম্পর্কে গবেষকরা জানান, এই গবেষণায় ইউরিয়া সারের কণাকে ন্যানো আকারে (প্রায় ২০ থেকে ৫০ ন্যানোমিটার) রূপান্তর করে বায়োচার দ্বারা আবৃত করা হয়। যা ধীরে ধীরে নাইট্রোজেন মুক্ত করে ফসলের চাহিদা অনুযায়ী দীর্ঘ সময় ধরে পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করে। ন্যানো-কার্বনকোটেড ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে নাইট্রোজেন ব্যবহারের দক্ষতা ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি অ্যামোনিয়া অপচয় ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।
উদ্ভাবিত এই ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম ইউরিয়া সার ব্যবহার করেও সমপরিমাণ বা অধিক ফলন পাওয়া সম্ভব। যা কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া ধানের ফলন ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং ফসলের গুণগত মান উন্নয়নের সম্ভাবনাও লক্ষ্য করা গেছে।
এ বিষয়ে প্রধান গবেষক ও বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমেদ খায়রুল হাসান বলেন, প্রতি বছর সরকারকে ইউরিয়া সারে প্রচুর পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হয়। কৃষকরাও সবচেয়ে বেশি এই ইউরিয়া সারই ব্যবহার করেন। যা নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের জটিলতা বা সমস্যা দেখা দেয়। এসব বিষয় মাথায় রেখেই সারের খরচ কমানো এবং পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে আমার গবেষণার কাজ শুরু করি। প্রাথমিকভাবে আমার যে অনুমান ছিল, সেই অনুমানে মাঠ পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে আমরা সফল।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে আরও কিছু পরীক্ষণের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারব যে, আমাদের এই ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তিটি কতটুকু সফল হয়েছে। তবে আমি আশাবাদী যে, আগামী মৌসুমেই আমরা এ বিষয়ে একটি পরিষ্কার ধারণা দিতে পারব। এটি যদি বৃহত্তর পরিসরে উৎপাদন করা যায় এবং মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা করা যায় তবেই এটি নিশ্চিতভাবে বলা যাবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ধান চাষের জন্য এই ন্যানো ইউরিয়া সার একটি অত্যন্ত কার্যকর প্রযুক্তি হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পিএইচডি ফেলো আমজাদ হোসেন বলেন, ন্যানো ইউরিয়া সিনথেসিস এবং বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে আমরা সফল হয়েছি। মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগে আমরা প্রায় সাফল্যের পথে। যদি ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারে ফলন সমান থাকে তবুও আমরা সফল বলব। কারণ, প্রথাগত ইউরিয়া তিন বার দিতে হয়, কিন্তু ন্যানো একবারে দিয়ে হবে। যেহেতু বায়োচার আকারে দিবে এতে কার্বন এমিশন কম হবে। মাটির গুণাগুণ বজায় থাকবে, সমৃদ্ধি হবে। আর্থিকভাবেও কৃষক লাভবান হবে।
মাটির কার্বন সমৃদ্ধের বিষয়ে ব্রি’র মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, প্রথাগত ইউরিয়া ব্যবহারে গ্রিনহাউস গ্যাস বিশেষ করে নাইট্রাস গ্যাস এমিশন বেশি হয়। এতে পরিবেশ হুমকির মধ্যে পড়ে। তবে যদি ইউরিয়াকে বায়োচর সমৃদ্ধ করে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে ২০-২২ শতাংশ কার্বন এমিশন কমানো যাবে। এতে মাটির কার্বন সমৃদ্ধ হয়ে উর্বরতা বৃদ্ধি করবে। এটা অনেক বড় অর্জন হবে।
এ বিষয়ে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ড. মো. মনোয়ার করিম খান বলেন, এখানে ৮০ শতাংশ ন্যানো ইউরিয়া আর ১০০ শতাংশ প্রিলড ইউরিয়া ব্যবহার করা হয়েছে। যদি দুইটার ফলাফলকে আমরা পাশাপাশি রাখি, তাহলে দেখতে পারব উভয়ই প্রায় একই রকম ফলন দিচ্ছে। যদি ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তির মাধ্যমে সাধারণ ইউরিয়ার মতোই ফলন পাই, তাহলে এটাকে প্রিলড ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে পারব এবং এটি কৃষকদের জন্যও অনেক সাশ্রয়ী হবে। পাশাপশি সরকারের ওপর কৃষি সারের বড় অঙ্কের ভর্তুকি, গত বছরও যেটার পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা; সেই চাপ হ্রাস পাবে।
ব্রি’র গবেষণা উইংয়ের পরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম মূল লক্ষ্য ‘প্রিসিশন এগ্রিকালচার’ বা সূক্ষ্ম কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষণে দেখা গেছে, যেখানে সাধারণ ইউরিয়া সার তিনবার এবং বিপুল পরিমাণে প্রয়োগ করতে হয়, সেখানে ন্যানো ইউরিয়া মাত্র একবার ব্যবহার করেই আমরা কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারছি। এতে আমাদের কৃষকদের শ্রম ও খরচ উভয়ই কমবে। সাধারণ ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে ধান ক্ষেতের মাটি থেকে যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরিত হয়, ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই নিঃসরণ কমিয়ে আমরা একটি নির্মল পরিবেশ গড়ে তুলতে পারব।

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories