ইন্টারনেট ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসার পর বিশ্বের এক প্রান্তে বসে অন্যত্র সহজেই যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে। আবেগ বা দিনের বিভিন্ন কার্যক্রম একে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেন ব্যবহারকারীরা। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক কিংবা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা দিনদিন বেড়েই চলেছে। ফলে নেটিজেনরা এখন সংবাদের সঙ্গেও এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল।
খবরের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা বা সেন্সর থাকলেও সামাজিক মাধ্যমে বাঁধা কম। কমিউনিটি গাইডলাইন মেনে সব তথ্য প্রকাশের ক্ষমতা রাখেন একজন ব্যবহারকারী। তবে এক্ষেত্রে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও বেশি।
এক গবেষণায় দেখা গেছ, ইউরোপে তরুণদের সংবাদ প্রাপ্তির প্রধান উৎস হয়ে উঠছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সেখানে টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো, টিভি এবং প্রিন্টের মতো ঐতিহ্যবাহী মিডিয়া আউটলেটগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে ভুল তথ্যের ক্রমবর্ধমান হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন তারা।
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ইয়ুথ সার্ভে অনুসারে, ১৬-৩০ বছর বয়সী ইউরোপীয়দের অন্তত ৪২ শতাংশ মানুষ রাজনীতি এবং সামাজিক সমস্যা বিষয়ক খবর জানতে প্রধানত টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে। এই পরিবর্তন মূলত দ্রুতগতি ও সহজে পাওয়া মডেলের দিকে ইঙ্গিত করে। তবে বিষয়টি গতিশীল হওয়ায় তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদানের ঝুঁকি রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তরদাতা যত কম বয়সী, তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরতা তত বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৬-১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা অন্য যেকোনো প্ল্যাটফর্মের থেকে টিকটক এবং ইন্সটাগ্রামকে বেশি বিশ্বাস করেন। তবে ২৫-৩০ বছর বয়সীরা টিকটক এবং ইন্সটাগ্রাম থেকে থেকে ফেসবুককে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করেন। গবেষণার তথ্য মতে, ১৬-১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে ৫১ শতাংশ টিকটক এবং ৫২ শতাংশ ইন্সটাগ্রামের ওপর নির্ভরশীল। তবে ২৫-৩০ বছর বয়সীদের সেক্ষেত্রে এই হার যথাক্রমে ২৯ ও ৪১ শতাংশ।
এদিকে ২৫-৩০ বছর বয়সীরা ফেসবুক পছন্দ করলেও, কম বয়সীরা ফেসবুক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বড়দের ৩৬ শতাংশ ফেসবুক পছন্দ করলেও কম বয়সীরা মাত্র ১৭ শতাংশ ফেসবুকনির্ভর। বিভিন্ন খবর পেতে ২৫-৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে ৩০ শতাংশ মানুষ অনলাইন নিউজ প্ল্যাটফর্ম এবং ১৯ শতাংশ মানুষ রেডিও পছন্দ করেন। যদিও ১৬-১৮
বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার যথাক্রমে ২১ ও ১৩ শতাংশ।
অপর এক গবেষণায় উঠে এসেছে আরও ভয়ানক তথ্য। ২০২৪ সালে রয়টার্স ইনস্টিটিউট ডিজিটাল নিউজের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে ভুল তথ্যের অন্যতম স্পষ্ট উৎস টিকটক। এই মাধ্যমের ২৭ শতাংশ ব্যবহারকারীর জন্যই প্রতারণামূলক বিষয়বস্তু সনাক্ত করা কঠিন হয়ে ওঠে। এদিকে ইনস্টাগ্রামের মূল সংস্থা মেটা সম্প্রতি তাদের ফ্যাক্ট-চেকিং সিস্টেমটি শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ব্যবহারকারীর জন্য সঠিক, ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য সনাক্ত করা বেশ কষ্টকর। মেটার এই সিদ্ধান্ত ইলন মাস্কের এক্সে নেয়া সিদ্ধান্তের প্রতিচ্ছবি। তবে তথ্য-যাচাই বন্ধ হয়ে গেলে আস্তে আস্তে ব্যবহারকারীদের আস্থা হারাবে এসব যোগাযোগমাধ্যম।
ইউরোপীয়রা ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে বেশ সচেতন। তারা নিজেদের নিউজ ফিড ভুয়া এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য জর্জরিত হওয়ার বিপদগুলোও স্বীকার করেছেন। জরিপে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ ব্যবহারকারীই আগের সপ্তাহে ভুয়া বা প্রতারণামূলক খবরের সম্মুখীন হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৫ শতাংশ মানুষ প্রায়শই এমন খবর নিজেদের ফিডে দেখতে পান। এছাড়া ৩২ শতাংশ ‘মাঝেমধ্যে’ ভুল তথ্যের সম্মুখীন হন।
ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে জেনেও ‘ক্লিক বাইট’ আকারের সামনে আসা সংবাদে তারা ক্লিক করতে বাধ্য হন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় ইনস্টাগ্রাম। সার্ভেতে অংশ নেয়া ৪৭ শতাংশ ব্যক্তি মনে করেন ইন্সটাগ্রামে এমন চমকপ্রদ সংবাদ বেশি দেখা যায়। এরপরে রয়েছে যথাক্রমে টিকটক এবং ইউটিউব। এখনও ফেসবুক এবং এক্স-এর জনপ্রিয়তা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেশ কম। তবে হোয়াটসঅ্যাপ থেকেও অনেকে খবর সংগ্রহ করেন। ১৬ ভাগ তরুণ ব্যবহারকারীদের প্রধান খবরের উৎস এই হোয়াটসঅ্যাপ।
সামাজিক মিডিয়া সংবাদ চক্র ঐতিহ্যবাহী সংবাদ আউটলেটের পরিবর্তে প্রভাবশালী এবং বিকল্প মিডিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে ব্যবহারকারীদের পক্ষে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন। পাশাপাশি মূলধারার সাংবাদিকতায় তাদের বিশ্বাস কমে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের আস্থা হ্রাস পেয়েছে। জরিপে অংশ নেয়া তরুণদের মধ্যে ২১ শতাংশ ইইউর প্রতি সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং ১৫ শতাংশ স্বীকার করেছেন, তারা তথ্যের অভাবে ২০২৪ সালে ইইউ ভোট এড়িয়ে গেছে।
একইসঙ্গে, শুধু ভোট দেয়া বা প্রতিবাদ কিংবা পিটিশনে অংশ নেয়ার জন্য নয়, সক্রিয়তার বাহন হিসেবে ইউরোপীয়রা তাদের সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের উপর ক্রমবর্ধমানভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। যখন রাজনীতির কথা আসে, ভুয়ো খবর এবং পরিবর্তিত বিষয়বস্তু (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি ছবি এবং ভিডিওসহ) ব্যবহার করা হয়। এসব কাজের মূল উদ্দেশ্য জনমতকে প্রভাবিত করা এবং নির্বাচনে কারসাজি এবং সমাজের মেরুকরণের জন্য।
২০১৬ সালের একটি বানোয়াট বিবৃতিতে দাবি করা হয়, পোপ ফ্রান্সিস তার প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিলেন। একইভাবে ২০১৮ সালে বলা হয়েছিল, শাকিরা বিশ্ব সফরের সময় ইসরায়েলকে বয়কট করছেন। উভয় খবরেরই কোনো ভিত্তি ছিল না।
ক্রমাগত মিথ্যা তথ্যের প্রকাশ উদ্বেগজনক এবং চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি তৈরি করে। এর ফলে উদ্বেগ, বিভ্রান্তি এবং ঐতিহ্যগত মিডিয়ার প্রতি মানুষের অবিশ্বাস বাড়তে পারে। ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিড়ে অনেক তরুণ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী এখন সম্পূর্ণভাবে সংবাদ এড়াতে যেতে চাচ্ছেন। ক্লিক বাইট সংবাদের মাধ্যমে অধিকাংশ সময়ই তারা প্রতারিত হচ্ছেন। যেমন দেশের নাম উল্লেখ না করে চমকপ্রদ বা ভয়াবহ কোনো সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে। ব্যবহারকারীরা নিজের দেশ বা শহরের ঘটনা ভেবে নিউজে ক্লিক করছেন। কিন্তু খবরের ভেতরে গিয়ে দেখছেন হাজার হাজার মাইল দূরের খবর সেখানে পরিবেশন করা হয়েছে।
Leave a Reply