আয়তনের দিক দিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় সিটি কর্পোরেশন গাজীপুর। ৩২৯.৯০ বর্গকিলোমিটার। ৫৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত গাজীপুর সিটির অধিকাংশ এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র,মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পকারখানা। সিটির এলাকার নারী পুরুষ মিলিয়ে জনসংখ্যা প্রায় ৬৫লাখ। নাগরিক সুবিদা বৃদ্ধির লক্ষে ২০১৩ সালের ১৬ই জানুয়ারি আওয়ামীলীগ সরকার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন গঠন করেন। সে বছরের ৭ জুলাই প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে আওয়ামীলীগের প্রার্থী সাবেক টঙ্গী পৌর সভার মেয়র এ্যাড. আজমত উল্লাহ খানকে পরাজিত করে জয়লাভ করেন জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নান। বিভিন্ন মামলায় জেল এবং অভিযোগ এবং সর্বপরি বরখাস্তের কারণে ৫বছরের মধ্যে মাত্র ১৮ মাস দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। বাকি সময় আওয়ামীলীগের সমর্থিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর আসাদুর রহমান কিরণ প্যাণেল মেয়র থেকে ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। সিটি কর্পোরেশন গঠন হওয়ার পর প্রথম মেয়াদে ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় দ্বিতীয় বার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়ামীলীগের দলীয় প্রার্থী এ্যাড. জাহাঙ্গীর আলম নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন। সিটিবাসী আওয়ামীলীগের প্রার্থী এ্যাড. জাহাঙ্গীর আলমের প্রতি ভরসা রাখেন এবং ২০১৮ সালে ২৬শে জুন বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর নানা উন্নয়ন কাজ নিয়ে মাঠে সরব হওয়ার পরে গত ২০২১ সালের ২৫ শে নভেম্বর প্রায় তিন বছরের মাথায় নানা অনিয়মের অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিস্কার করার মধ্যদিয়ে মেয়র পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। পরে যদিও দলে সদস্য পদ ফিওে পান তিনি, কিন্তু মেয়র পদ ফিরে পেতে নানা আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে তৃতীয় দফায় সিটি নির্বাচনের তফসিল।
এদিকে গত দুই মেয়াদে ১০ বছরে মেয়র বা ভারপ্রাপ্ত মেয়র জড়িয়ে পড়েন নানা অনিয়ম দুর্নীতিতে এমন গুঞ্জনও রয়েছে একাধিক। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিভিন্ন অভিযোগ যেমন খতিয়ে দেখছেন, তেমনি দুর্নীতি দমন কমিশনও তদন্ত করছে ওইসব অনিয়ম দুর্নীতি। তবে হতাশার বিষয় যারা স্বতস্ফুর্ত ভোট দিয়ে নগর পিতা নির্বাচন করেছিলেন সেসব প্রান্তিক ভোটারদের ভাগ্যের ৩০ ভাগ পরিবর্তন অর্জিত হয়নি আজও। গত নির্বাচনে আওয়ামীলীগ জনগণকে ওয়াদা দিয়ে ভোট নিলেও এর প্রত্যাশা পূরণ হয়নি ৩০ ভাগও। গত নির্বাচনের জয়ী হওয়ার আগে আওয়াামীলীগ ইশতেহারে প্রাধান্য দিয়েছিলো গ্রীন ও ক্লিন গাজীপুর গড়ার। রিসাইক্লিনিংয়ের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে ওয়ার্ড ভিত্তিক বর্জ্য সংগ্রহ করে বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতিতে রিসাইকিøনিংয়ের কথা বলা হয়েছিল। যদিও এখনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেনি তবে প্রস্তুতি চলছে এমনটা দাবী ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণের। নগরবাসীর অন্যতম প্রধান সমস্যা এখনো বর্জ্য ঘিরেই। দূষণের নগরীতে পরিচিত হয়েছে এখন গাজীপুর। সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন ৪ হাজার মেট্রিকটন বর্জ্য তৈরি হয় বিভিন্ন এলাকায়। প্রতিটি ওয়ার্ডে নগরবাসী নিজস্ব উদ্যোগে সড়কের ধারে কিংবা খালে বিলে বর্জ্য ফেলে। তবে সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগেও বর্জ্য ডাম্পিং করা হয়, তবে সেটা সড়কের ধারে অথবা আবাসিক এলাকার কোন গলিতে অথবা শ্রমিক অধ্যুষিত কারখানার পাশে। ফলে বর্জ্যরে উৎকট দুর্গন্ধে পথচারীদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হয়। নগরবাসীর শিক্ষা নিশ্চিতে আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উপর জোড় দেয়া হয়েছিল ইশতেহারে। সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে মানসম্মত স্কুল,কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার প্রতিশ্রুতি ছিল। ছিলো ওয়ার্ড ভিত্তিক গনগ্রন্থাগার স্থাপন করা ও দরিদ্র মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা বৃত্তির প্রতিশ্রুতি, কিন্তু বাস্তবে প্রতিশ্রুতির কোন গুরুত্ব পায়নি ১০ ভাগও। নগরবাসীর নিরাপত্তার জন্য শহরের গুরুত্বপূর্ণ ক্লোজ (সার্কিক) সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কথা ছিলো ইশতেহারে। সাথে ওয়ার্ড ভিত্তিক কমিউনিটি পুলিশের মাধ্যমে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সন্ত্রাস, মাদকমুক্ত নগরী গড়ে তুলতে কাযকর্র পদক্ষেপ গ্রহন, ইভটিজিং প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহন করার কথা ছিল ইশতেহারে। এছাড়া, নগরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ওয়ার্ড ভিত্তিক মেডিকেল সেন্টার স্থাপন, স্বাস্থ্য বীমা চালু, মহানগরের বাজারগুলোতে ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করা, বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা, নগরের পয়:নিষ্কাশনের জন্য দীর্ঘ মেয়াদী ড্রেন নির্মাণের কথা ছিলো।
শিল্প কারখানা শ্রমিকদের জন্য স্বল্প ভাড়ার আবাসিক ভবন নির্মাণ, অর্থনৈতিক জোন নির্মাণ ও শিল্প পার্ক স্থাপনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল এ্যাড. জাহাঙ্গীর আলমের ইশতেহারে। এছাড়া জলবদ্ধতা নিরসনে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, করপোরেশনের সব সেবা ডিজিটালাইজেশন, ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা, সিটির মাধ্যমে ব্যাংক বীমা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা, শতভাগ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যবস্থা করা, অঞ্চল ভিত্তিক আধুনিক ফায়ার স্টেশন স্থাপন, মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, ফ্রি ওয়াইফাই জোন তৈরি করা, এলাকার বিভিন্ন গন্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে ওয়ার্ড ভিত্তিক উন্নয়ন কমিউনিটি গড়ে তোলার অঙ্গীকার ছিল ইশতেহারে। ইশতেহারে দীর্ঘমেয়াদী সিটির উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা, সিটির যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে নানা ভূমিকার কথা ছিল। যানজট মুক্ত শহর, সিটি বাসের ব্যবস্থা করাও কথা ছিল। বাস্তবে অধিকাংশ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির খবর আর কেউ রাখেনি।

এ বিষয়ে গাজীপুর সিটির সাময়িক বরখাস্ত মেয়র এ্যাড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গাজীপুর সিটির নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে, তিনি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাত নিয়ে মাস্টার প্ল্যান তৈরির কাজ করছিলেন। নগরের সড়কগুলো প্রশস্ত করার কাজ করাকালীন অবস্থায় তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েেছ। তিনি পূর্ণ সময় পেলে নাগরিকদের দেয়া বাসযোগ্য গাজীপুর গড়ার প্রতিশ্রুতি পালন করতেন। কিন্তু সে সুযোগটি আর এখন নেই। তার আশা আগামীতে গাজীপুরবাসির উন্নয়নে সরকার আরো গুরুত্ব সহকারে নজর দিবে।
গাজীপুর সিটির টঙ্গী এলাকার রুহুল মিয়া বলেন, আমরা দূষিত এক শহরে বাস করছি, এখানে কারো কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, দিনে ধুলোবালি ও রাতে মশা। এ যেনো এক অসহনীয় যন্ত্রণা। নাগরিক সুবিধা বলতে যা বোঝায়, তার ২০ ভাগও নেই মহানগরীর ৫৫ নং ওয়ার্ডে। ৫৫ নং ওয়ার্ডের নামাপাড়া এলাকার বাসিন্দা লাইলী আক্তার বলেন, সিটি কর্পোরেশনের গঠন হয়েছে ১০ বছর হয়েছে, দু’জন নির্বাচিত এবং দু-বাওে দু’জন ভারপ্রাপ্ত মেয়র ক্ষমতায় ছিলো,অথচ আমাদের এলাকার উন্নয়ন তো কিছুই হলো না। এলাকায় মাদক তো আছেই তার উপর বেড়েছে নানা ধরনের করের বোঝা এমন কি নিত্য-প্রযোজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বি।
মাছিমপুর এলাকার এক ব্যবসায়ী (নাম গোপন রাখার শর্তে) বলেন, চোখের সামনে দুটি মেয়াদ প্রত্যক্ষ করেছি, দুই মেয়াদে বিএনপি সমর্থিত দুজন কাউন্সিলর এ ওয়ার্ডে নির্বাচিত হয়েছেন, কিন্তু কেউই এলাকায় কােন কাজ করেনি। দু-মেয়াদে দু’জন মেয়রের একজনও তাদের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। বেশীর ভাগ সময় ভারপ্রাপ্ত মেয়র ক্ষমতায় ছিলেন। ফলে উন্নয়নের মুখ দেখেনি ৫৫ নং ওয়ার্ডসহ গাজীপুর সিটির অধিকাংশ ওয়ার্ড বাসী।
এদিকে, গত ৩ই এপ্রিল নির্বাচন কমিশন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেছেন। তফসিল ঘোষনার পর থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে এখন পর্যন্ত ১২ জন মেয়র প্রার্থী ১৭ বছরের সাবেক সফল টঙ্গী পৌর সভার মেয়র এ্যাড. আজমত উল্লাহ খান, গাজীপুর সিটি মেয়র (সাময়িক বরখাস্ত) এ্যাড. মো. জাহাঙ্গীর আলম, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মেয়র মো. আসাদুর রহমান কিরণ, মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কর্মী বান্ধব মতিউর রহমান মতি, মহানগর যুবলীগের সভাপতি মো. কামরুল আহসান সরকার রাসেল, মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক সাইফুল ইসলাম, আওয়ামীলীগের সমর্থন চেয়ে প্রার্থী ঘোষনা করেছেন মো. মেজবাহ উদ্দিন সরকার রুবেল, মহানগরীর গাছা অঞ্চলের ৩৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন মন্ডল। এছাড়া জাতীয় পাটি থেকে এম এম নিয়াজ উদ্দিন (সাবেক সচিব), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মেয়র প্রার্থী মাওলানা গাজী আতাউর রহমান এবং বিএনপি ঘরানার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সরকার শাহ নুর ইসলাম রনি, এবং একজন বিমান বাহিনীর একজন সদস্য মেয়র পদে প্রাথী হিসেবে ভোটারদের কাছে ভোট চাইছেন এবং ব্যাণার, পোষ্টার ও ফ্যাষ্টুনে গাজীপুর সিটি এলাকাকে রাঙ্গিয়েছেন। এছাড়া মহানগরীর ৫৭টি ওয়ার্ডের প্রতিটি ওয়ার্ডে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৫/৭ জন কাউন্সিল প্রার্থী ২/৩ জন সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী তাদের এবং স্থানীয় শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দের ছবি সম্বলিত বাহারী রংয়ের ব্যনার, পোষ্টার, ফেষ্টুন ও লিফলেটসহ ইশতেহার প্রকাশ করে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২৫ মে গাজীপুর সিটির ভোট গ্রহন। এখন পর্যন্ত প্রধান বিরোধী দল জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নির্বাচন বর্জনের ঘোষনা বলবৎ রাখলেও আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন ছাড়া আরো কয়েকটি দল নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
Leave a Reply