ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে আসন্ন নির্বাচনের আগে নির্বাচনি সীমানা পুনর্নির্ধারণকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংখ্যালঘু ভোটের প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়েছে রাজ্যটিতে। এমন অবস্থাকে ‘সাম্প্রদায়িক জেরিম্যান্ডারিং’ বলে উল্লেখ করছেন বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক কর্মীরা।
আসামের সীমান্তবর্তী কাটিগরা আসনের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ইসলাম উদ্দিন প্রতি নির্বাচনের সময় ঘরে ঘরে গিয়ে মুসলিম ভোটারদের ভোটদানে উৎসাহিত করেন। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘মূল বিষয় হলো আমাদের হয়ে কথা বলার জন্য আমাদের প্রতিনিধিকে পাঠানো।’ কিন্তু এবার ৯ এপ্রিলের নির্বাচনের আগে তিনি শঙ্কিত যে তার এই প্রচেষ্টা আদৌ কোনো প্রভাব ফেলবে কি না।
২০২৩ সালে ভারতের নির্বাচন কমিশন আসামের সংসদীয় ও বিধানসভা আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের নির্দেশ দেয়। এর ফলে কাটিগরার ভোটের সমীকরণ আমূল বদলে গেছে। আগে যেখানে হিন্দু ও মুসলিম ভোটার প্রায় সমান ছিল, সেখানে নতুন করে প্রায় ৪০ হাজার হিন্দু ভোটার যুক্ত হওয়ায় এটি এখন হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে পরিণত হয়েছে।
সাবেক কংগ্রেস নেতা খলিল উদ্দিন মজুমদার বলেন, ‘এর ফলে এখানে মুসলিম প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।’ ইতোমধ্যে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এই আসনে হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। শুধু কাটিগরা নয়, আসামের ১২৬টি বিধানসভা আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে রাজ্যের প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মুসলিম ভোটারের রাজনৈতিক প্রভাব কমে যায়।
জানা গেছে, আসামের মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশের বেশি মুসলিম। কেবল জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাক্ষাদ্বীপে মুসলিমদের অনুপাত এর চেয়ে বেশি। তবে, আসামের মতো এগুলোর কোনোটিই পূর্ণাঙ্গ রাজ্য নয়।
রাজ্যে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই মুসলিমদের লক্ষ্য করে উচ্ছেদ অভিযান, বহিষ্কার নীতি ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, আসাম এখন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পরীক্ষাগার, যা ভবিষ্যতে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও প্রয়োগ করা হতে পারে।
‘সাম্প্রদায়িক জেরিম্যান্ডারিং
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব এই প্রক্রিয়াকে ‘কমিউনাল জেরিম্যান্ডারিং’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণভিত্তিক জেরিম্যান্ডারিংয়ের সঙ্গে এর তুলনা টানেন, যেখানে নির্বাচনি সীমানা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয় যাতে প্রভাবশালী গোষ্ঠী সুবিধা পায় এবং সংখ্যালঘুরা বঞ্চিত হয়। তার মতে, আসামে তিনটি কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছেক্র্যাকিং, প্যাকিং ও স্ট্যাকিং’।
ক্র্যাকিং হলো মুসলিম ভোটারদের বিভিন্ন হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে ছড়িয়ে দেয়া, যাতে তারা কোথাও সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে না পারে। প্যাকিং হলো একাধিক মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল এক আসনে যুক্ত করে তাদের জয়ের সুযোগ কমানো এবং স্ট্যাকিং বলতে বোঝায় বিভিন্ন হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল একত্র করে একটি আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে আগে যেখানে প্রায় ৩৫টি আসনে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, তা এখন কমে প্রায় ২০টিতে নেমে এসেছে।
আল জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী) রাজ্য সম্পাদক সুপ্রকাশ তালুকদার বলেন, ‘দূরবর্তী মুসলিম-অধ্যুষিত আসনগুলোর হিন্দু এলাকাগুলোকে মিশ্র জনসংখ্যার নির্বাচনি এলাকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনগুলোর মুসলিমদের হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি অঞ্চলে এই পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রভাব দেখা গেছে। আগে আলগাপুর, হাইলাকান্দি ও কাটলিছড়া আসনে মুসলিম প্রার্থীরা নির্বাচিত হতেন। কিন্তু এখন হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল যুক্ত করে সেগুলোকে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে রূপান্তর করা হয়েছে।
একইভাবে নওবইচা আসনের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলো চারটি ভিন্ন আসনে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে এই আসনটি সংরক্ষিত আসনে পরিণত হয়েছে, যেখানে কেবল নির্দিষ্ট হিন্দু নিম্নবর্ণের প্রার্থী নির্বাচন করতে পারবেন।
Leave a Reply