সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত কিছু মানুষ আলাদাভাবে এমন কণ্ঠস্বর শোনেন, যা তার আশপাশের মানুষ শুনতে পান না। এর কারণ ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ নতুন প্রমাণ তুলে ধরেছেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) মনোবিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে করা এই গবেষণায় বলা হয়েছে, সমস্যাটির মূল হতে পারে মস্তিষ্কের নিজের ভেতরের কথা বা ‘ইনার স্পিচ’ চিনে নেয়ার প্রক্রিয়ায় ত্রুটি। এর ফলে মনের ভেতরে তৈরি হওয়া ভাবনা বা কণ্ঠস্বরকে মস্তিষ্ক বাইরের কারও কথা বলে ভুল করতে পারে। গবেষণাটি বৈজ্ঞানিক সাময়িকী “সিজোফ্রেনিয়া বুলেটিন”-এ প্রকাশিত হয়েছে।
এটি প্রায় ৫০ বছর পুরোনো একটি তত্ত্বকে আরও জোরালোভাবে সমর্থন করেছে। সেই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ যখন নিজের সঙ্গে বা মনে মনে কথা বলে, তখন সাধারণত মস্তিষ্ক আগে থেকেই সেই শব্দের পূর্বাভাস দেয় এবং শ্রবণকেন্দ্রের প্রতিক্রিয়া কিছুটা ‘কমিয়ে’ রাখে। কিন্তু সিজোফ্রেনিয়ার কারণে এই পূর্বাভাস ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ না করলে নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বরও বাইরের শব্দের মতো অনুভূত হতে পারে।
ইউএনএসডব্লিউ স্কুল অব সাইকোলজির অধ্যাপক থমাস হুইটফোর্ড বলেন, ‘ইনার স্পিচ হলো মাথার ভেতরের সেই কণ্ঠ, যা নীরবে আমাদের ভাবনাগুলোকে ভাষায় রূপান্তর করে। বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক এই নিজস্ব কণ্ঠে তুলনামূলক কম প্রতিক্রিয়া দেখায়।
এই তত্ত্ব পরীক্ষা করতে গবেষকেরা তিনটি দল নিয়ে কাজ করেন। প্রথম দলে ছিলেন ৫৫ জন সিজোফ্রেনিয়া স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি, যারা গবেষণার আগের এক সপ্তাহের মধ্যে শ্রবণজনিত হ্যালুসিনেশন বা কণ্ঠস্বর শোনার অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন। দ্বিতীয় দলে ছিলেন ৪৪ জন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি, যাদের সাম্প্রতিক সময়ে কণ্ঠস্বর শোনার অভিজ্ঞতা ছিল না। তৃতীয় দলে ছিলেন ৪৩ জন সুস্থ ব্যক্তি।
অংশগ্রহণকারীদের মাথায় ইইজি ক্যাপ পরানো হয় এবং হেডফোনের মাধ্যমে শব্দ শোনানো হয়। একই সঙ্গে তাদের মনে মনে ‘বাহ’ বা ‘বিহ’ উচ্চারণ কল্পনা করতে বলা হয়। ওই সময়ে বাইরে থেকে একই ধরনের শব্দ শোনানো হচ্ছিল।
ফলাফলে দেখা যায়, সুস্থ অংশগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে কল্পিত শব্দ ও শোনা শব্দ এক হলে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ কমে যায়। অর্থাৎ মস্তিষ্ক আগেই শব্দটি অনুমান করতে পেরে প্রতিক্রিয়া কমিয়ে দেয়। কিন্তু যারা সম্প্রতি কণ্ঠস্বর শোনার অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায়। কল্পিত শব্দ ও শোনা শব্দ এক হলে তাদের মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
অধ্যাপক হুইটফোর্ড বলেন, ‘তাদের মস্তিষ্ক ভেতরের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে বাইরের শব্দ মিললে আরও বেশি সাড়া দিয়েছে, যা সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে আমরা ঠিক বিপরীতভাবে দেখেছি।’
গবেষকেরা মনে করছেন, এই ফলাফল ভবিষ্যতে সাইকোসিস বা মানসিক বিকার ঝুঁকি শনাক্ত করার জন্য জৈবিক সূচক বা বায়োমার্কার খোঁজার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে সিজোফ্রেনিয়াকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার মতো কোনো পরীক্ষাগারভিত্তিক বায়োমার্কার নেই।
গবেষণা দলটি এখন খতিয়ে দেখতে চান, এই বিশেষ ধরনের মস্তিষ্কীয় প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে কার সাইকোসিস হওয়ার ঝুঁকি আছে তা আগেভাগে বোঝাতে পারে কি না। অধ্যাপক হুইটফোর্ডের ভাষায়, ‘এই ধরনের পরিমাপ সাইকোসিসের বিকাশ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনাময় বায়োমার্কার হয়ে উঠতে পারে, যা আগাম হস্তক্ষেপের পথও খুলে দিতে পারে।
Leave a Reply