উড়োজাহাজে উঠে জানালার পাশের সিটে বসে অনেকেই হতাশ হয়েছেন। জানালাটি ঠিক সামনেও নয়, কখনো একটু সামনে, কখনো আবার পেছনে। মাঝআকাশে খুব কাছ থেকে মেঘ, সূর্যাস্ত কিংবা নিচের দৃশ্য দেখার স্বপ্নটা যেন অধরাই থেকে যায়। আদতে দেখতে একে নকশাগত ত্রুটি মনে হলেও বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত প্রকৌশল, নিরাপত্তা ও খরচ-সংক্রান্ত যুক্তি। উড়োজাহাজের জানালা ও আসনের সারির এই ‘অমিল’ কেন হয়-তা নিয়ে অন্যতম ছয় কারণ নিচে তুলে ধরা হলো।
বিমানের কাঠামোগত নকশা: উড়োজাহাজের জানালার অবস্থান নির্ধারিত হয় এর কাঠামোগত প্রয়োজন অনুযায়ী, যাত্রীদের বসার সারির সঙ্গে মিল রেখে নয়। ফিউজলাজে (বিমানের মূল কাঠামো) নির্দিষ্ট দূরত্বে জানালা বসানো হয়, যাতে উচ্চতায় চাপের তারতম্য সামলে কাঠামোর শক্তি বজায় থাকে। এই প্রকৌশলগত বাধ্যবাধকতাই আসনের সঙ্গে জানালার মিল নষ্ট করে।
নির্দিষ্ট ‘সিট পিচ’: উড়োজাহাজের আসন বসানো হয় একটি নির্দিষ্ট সিট পিচ অনুযায়ী-অর্থাৎ এক সারি আসন থেকে পরের সারির দূরত্ব। এটি যাত্রীদের নিরাপত্তা ও ন্যূনতম আরামের কথা মাথায় রেখে নির্ধারিত। কিন্তু জানালার দূরত্ব এই সিট পিচ মেনে করা হয় না, ফলে দুটির অবস্থান খুব কম ক্ষেত্রেই মিলে যায়।
যাত্রীসংখ্যা সর্বোচ্চ রাখার চেষ্টা: এয়ারলাইনস কোম্পানিগুলোর লক্ষ্য থাকে নিরাপত্তা বজায় রেখে যত বেশি সম্ভব যাত্রী পরিবহন করা। যদি প্রতিটি আসন জানালার সঙ্গে মিলিয়ে বসানো হয়, তাহলে আসনের সংখ্যা কমে যাবে-যার অর্থ আয়ও কমে যাবে। তাই সৌন্দর্য বা দৃশ্য উপভোগের চেয়ে দক্ষতা ও লাভকেই অগ্রাধিকার দেয়া হয়।
মডুলার আসন বিন্যাস: আধুনিক বিমানে আসনগুলো মডুলার ব্লকে বসানো হয়, যা বিভিন্ন মডেলের বিমানে সহজে ব্যবহার করা যায়। এতে উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ ও সময়-সবই সাশ্রয় হয়। কিন্তু যেহেতু বিমানের মডেলভেদে জানালার অবস্থান (অ্যালাইনমেন্ট) আলাদা, তাই নিখুঁত সমন্বয় বাস্তবসম্মত নয়।
বিমানের মডেলভেদে ভিন্নতা: প্রতিটি বিমানের ফিউজলাজ নকশা আলাদা, জানালার অবস্থানও আলাদা। তবে এয়ারলাইনগুলো অপারেশনাল সুবিধার জন্য প্রায় একই ধরনের আসন বিন্যাস ব্যবহার করতে চায়। ফলে জানালার অবস্থান উপেক্ষিত হয়।
খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণ: প্রতিটি জানালার সঙ্গে মিলিয়ে আলাদা আসন বিন্যাস করলে খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ জটিল হবে। স্ট্যান্ডার্ড বিন্যাস রাখলে খরচ কমে, কাজ সহজ এবং ফ্লাইটের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম দ্রুত হয়।
উড়োজাহাজের নকশা নিয়ে আরও কিছু তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেল বিমানের জানালা কেন গোলাকার হয়? গোল জানালা বিমানের ভেতর ও বাইরের চাপ সমানভাবে বণ্টন করে, ফলে ফাটল ধরার ঝুঁকি কমে যায়। চৌকোণা জানালার কোণায় চাপ বেশি পড়ে কাঠামো দুর্বল করে দিতে পারে।
এদিকে বিমানের সাদা রঙ পর্যাপ্ত আলো প্রতিফলিত করে, তাপ শোষণ কমায় এবং এতে ক্ষতচিহ্ন/ফাঁটল সহজে চোখে পড়ে। এতে রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হয়।
উড়োজাহাজের পেছনে আকাশে যে সাদা দাগ পড়ে এদেরকে ‘কনট্রেইল’ বলা হয়। কয়েক কিলোমিটার উচ্চতায় বিমানের গরম ধোঁয়া ঠান্ডা বাতাসে মিশে বরফকণায় পরিণত হলে এই সাদা রেখা তৈরি হয়।
সুতরাং পরের বার জানালার সঙ্গে সিট না মেললে বিরক্ত হওয়ার আগে মনে রাখুন-এটি অবহেলা নয়, বরং নিরাপত্তা, প্রকৌশল আর অর্থনীতির সমন্বয়ে নেয়া এক বাস্তব সিদ্ধান্ত।
Leave a Reply