দেশের একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম সম্প্রতি জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে সমালোচনামূলক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর তাদের ফেসবুক পেজে হঠাৎ করেই নেমে আসে নেতিবাচক রিভিউয়ের বন্যা। প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রবাহবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের তথ্য যাচাই উদ্যোগ ‘ডিসমিসল্যাব’–এর সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, সামাজিকমাধ্যমে সমন্বিতভাবে এমন আক্রমণ চালিয়ে বিভিন্ন পেজের রেটিং কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এক হাজারের বেশি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যম, বিশ্লেষক, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় সংস্থা, জনপ্রিয় ব্যক্তি, এমনকি বিদেশি মিশনের পেজ পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। বিশ্লেষণে ডিসমিসল্যাব নিশ্চিত হয়েছে, এসব অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থকরা।
যেভাবে শনাক্ত হলো নেটওয়ার্কটি
ডিসমিসল্যাব ১ হাজার ১১৮টি পেজের ৬২ হাজার ৫২৯টি রিভিউ পর্যবেক্ষণ করে ১ হাজার ১৯টি অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে। জানুয়ারি থেকে অক্টোবর—এই ১০ মাসে চক্রটি অন্তত ৭২১টি পেজে আক্রমণ চালিয়েছে। এসব আক্রমণে ‘ভুয়া তথ্য ছড়ানো’, ‘সন্ত্রাসে জড়িত’, ‘সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ’ এ ধরনের অভিযোগ দেখিয়ে একই রকম রিভিউ বারবার ব্যবহার করা হয়েছে।
ডিসমিসল্যাব নিজেও এ হামলার শিকার। তাসনিম জারাকে অনলাইন হয়রানির ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাদের পেজে মাত্র দুই ঘণ্টায় ৪৮টি নেতিবাচক রিভিউ পড়ে। একই লেখা ২৩টি অ্যাকাউন্ট থেকে বারবার কপি করে পোস্ট করা হয়, যা পরে দেখা যায় অন্য ৩১৫টি পেজেও মোট ১ হাজার ৪৭৩ বার ব্যবহৃত হয়েছে। সর্বশেষ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শনাক্ত অ্যাকাউন্টগুলো মোট ১৩ হাজারের বেশি রিভিউ দিয়েছে, যার ৯৪ শতাংশেই আওয়ামী লীগপন্থী বার্তা রয়েছে।
আক্রমণের প্রধান শিকার হয়েছে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও নেতারা, সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অনলাইন বই বিক্রয় ও প্রকাশনা পেজ ও ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ও পাকিস্তান হাইকমিশনের পেজ। জুলাই–আগস্টের আন্দোলনের আলোকচিত্র প্রদর্শনীর ছবি পোস্ট করার পর দৃকের পেজও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়। বিএনপি মিডিয়া সেল, জামায়াতে ইসলামী, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, এনডিএম নেতা ববি হাজ্জাজ, রাশেদ খান, ফারুক হাসান, তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, লেখক সলিমুল্লাহ খান ও সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনসহ বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এ আক্রমণের শিকার হয়েছেন। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’–এর পেজও ছাড় পায়নি।
ইতিবাচক রিভিউতেও সক্রিয় নেটওয়ার্কটি
নেটওয়ার্কের অ্যাকাউন্টগুলো আবার আওয়ামী লীগ সমর্থক পেজ, ভারতের কিছু গণমাধ্যম এবং বিজেপির এক রাজনীতিকের প্রোফাইলে ইতিবাচক রিভিউ দিয়েছে। কলকাতার এবিপি আনন্দ, রিপাবলিক বাংলা ও জি ২৪ ঘণ্টা—এ ধরনের পেজেও একাধিক অ্যাকাউন্ট ইতিবাচক মূল্যায়ন দিয়েছে। ডিসমিসল্যাব জানায়, এরই বিপরীতে আরেকটি ছোট ও কম সমন্বিত প্রতিদ্বন্দ্বী নেটওয়ার্কও রয়েছে, যার পরিসর এখনো স্পষ্ট নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন মনে করেন, ভুয়া রিভিউ নিয়ন্ত্রণে মেটাকে আরও কঠোর হতে হবে। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ভারতসহ অনেক দেশ এমন ঘটনায় মেটাকে চাপের মধ্যে রাখে। বাংলাদেশকেও অনুরূপ অবস্থান নিতে হবে, যাতে ক্ষতি হওয়ার আগেই প্রতিকার পাওয়া যায়।
Leave a Reply