আমরা কেন প্রযুক্তিতে, বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছি না? বিশ্ব যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ন্যানো-প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা কিংবা বায়োটেকনোলজির মতো জটিল ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষতা অর্জন করছে, সেখানে আমারা এখনো মৌলিক প্রযুক্তি ব্যবহারে যথাযথভাবে দক্ষ হয়ে উঠিনি। এটা নিছক অ্যাকাডেমিক সমস্যা? নাকি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতার সঙ্গে জড়িত? শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো সময় ও সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ মানুষ তৈরি করা। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষানির্ভর এবং মুখস্থ শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল। বইয়ের পাতায় আটকে থাকা শিক্ষা, বাস্তব জীবনের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ। বিশেষ করে প্রযুক্তি শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যথেষ্ট পিছিয়ে। বিদ্যালয় পর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হলেও তা কেবল সীমিত পরিসরে। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় কম্পিউটার ল্যাব নেই, থাকলেও সেগুলো সচল থাকে না। শিক্ষকরাই আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ নন। ফলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কোনো বাস্তব অনুশীলনের সুযোগ পায় না। ফলে যে প্রযুক্তি শিক্ষার ভিত তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা হয় না। আর শিক্ষার্থী যখন উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে যায়, তখন সামনে হঠাৎ এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হয় যা সে কোনোভাবেই পূরণ করতে পারে না। বিশ্ব ইতিমধ্যে শিক্ষা, গবেষণা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, এমনকি বিনোদনে এআই বিপ্লব ঘটাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে এআই-সংক্রান্ত পাঠদান শুরু হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের শেখানো হচ্ছে, কীভাবে এআই ব্যবহার করে কঠিন সমস্যা সহজে সমাধান করা যায়। অথচ বাংলাদেশে এখনো এআই দূর আকাশের তারা।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সীমিত কিছু উদ্যোগ থাকলেও, তা মূলত তাত্ত্বিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে এআই শিক্ষার উদ্যোগ নেই। ফলে বিশ্ব যখন নতুন প্রজন্মকে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করছে, আমরা তখন শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ করানোতে ব্যস্ত। এই পশ্চাৎপদতার কারণেই বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। যে বিষয়গুলো বিশ্বে অপরিহার্য, তা আমাদের পাঠ্যক্রমে অনুপস্থিত থাকায় শিক্ষার্থীরা অদক্ষ থেকে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইন্টারনেট শিক্ষার্থীর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে অন্য প্রান্তের জ্ঞান অর্জন করার জন্য ইউটিউব, কুর্সেরা, খান অ্যাকাডেমি, অ্যাডএক্স বা এমআইটির অনলাইন কোর্সে ভরপুর সুযোগ। একজন শিক্ষার্থী চাইলে ঘরে বসে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, প্রোগ্রামিং ভাষা কিংবা গবেষণা পদ্ধতি শিখতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও তা মূলত বিনোদননির্ভর। ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউবের বিনোদনমূলক কন্টেন্ট তাদের সময় নষ্ট করে, অথচ শিক্ষামূলক কন্টেন্ট ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে ওঠে না। এর পেছনে একদিকে রয়েছে, প্রযুক্তি-ভিত্তিক সচেতনতার অভাব, অন্যদিকে শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীদের শেখানো হতো কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইন্টারনেটকে শিক্ষার কাজে ব্যবহার করতে হয়, তবে এই অপব্যবহার ধীরে ধীরে কমে আসত এবং প্রযুক্তিকে দক্ষতার হাতিয়ার হিসেবে তারা ব্যবহার করতে পারত। প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ার আরেকটি বড় কারণ হলো, শিক্ষকদের প্রযুক্তি-দক্ষতার ঘাটতি। অধিকাংশ শিক্ষক আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত নন। তাদের প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল টুলস, এআই, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার খুব একটা গুরুত্ব পায় না। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ে অন্ধকারে ঘুরপাক খায়। করোনাকালে আমরা এই বাস্তবতাকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখেছি। হঠাৎ করে অনলাইনে ক্লাস চালুর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেও, অধিকাংশ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সঠিকভাবে তা মানিয়ে নিতে পারেনি। অথচ বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীরা তখন অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় সাবলীলভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল।
প্রযুক্তি শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার ফলে, আমাদের শিক্ষার্থীরা কর্মসংস্থান থেকেও পিছিয়ে পড়ছে। বিশ্বে প্রযুক্তিভিত্তিক চাকরি সবচেয়ে বেশি তৈরি হচ্ছে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডাটা সায়েন্স, এআই ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইবার সিকিউরিটি, ডিজিটাল মার্কেটিং ইত্যাদি খাতে। অথচ ভারতীয় শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক বাজারে বিশাল ভূমিকা রাখছে। সেখানে আমাদের শিক্ষার্থীরা মৌলিক কম্পিউটার দক্ষতায় পিছিয়ে রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের চাকরির সুযোগ হাতছাড়া হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তি সংযোজন না করায় আমরা যে কতটা পিছিয়ে যাচ্ছি, তা বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করলে স্পষ্ট হয়। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা ফিনল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত। তাদের শ্রেণিকক্ষগুলো স্মার্ট ক্লাসরুমে রূপান্তরিত। প্রতিটি শিক্ষার্থী ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে পড়াশোনা করছে এবং বাস্তব অনুশীলনের মাধ্যমে শিখছে। বাংলাদেশে এখনো হাজারো স্কুলে বিদ্যুৎ নেই, ইন্টারনেট সংযোগ নেই, ল্যাব নেই। এ অবস্থায় আমাদের শিক্ষার্থীরা কীভাবে বিশ্বমানের প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে উঠবে? তবুও আমরা আশাবাদী এই কারণে যে- তরুণদের মধ্যে অসাধারণ মেধা আছে। আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বহুবার কৃতিত্ব দেখিয়েছে। স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে তরুণ উদ্যোক্তা এগিয়ে আসছে। এসব জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগে রূপান্তর না করলে, প্রযুক্তি শিক্ষায় অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এআই, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, সাইবার সিকিউরিটি, ক্লাউড কম্পিউটিং ইত্যাদি বিষয়ে পাঠদান চালু জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ দেওয়া, শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য ইন্টারনেট ব্যবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে শিক্ষার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার শেখানো দরকার। আজ যদি আমরা শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা দিতে পারি, তবে তারা শুধু দেশের জন্য নয় বৈশ্বিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারবে। যদি আমরা এ সুযোগ হারাই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে না। এখনই প্রযুক্তিকে শিক্ষা ব্যবস্থার মূলধারায় আনা এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তোলা অন্যতম জরুরি কাজ। আগামীতে সরকারে যে-ই আসুক, বিষয়টি নিয়ে কাজ করা জরুরি। বিশ্বাস করি, প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ একদিন বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে লড়াই করবে।
Leave a Reply