জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী’—মা ও মাতৃভূমি স্বর্গের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। পৃথিবীর যেখানেই যত সুন্দর জায়গা থাকুক, তার তুলনা মাতৃভূমি বা স্বদেশের সঙ্গে হয় না। মায়ের মতো মাতৃভূমির গৌরব ও মর্যাদা অতুলনীয়।
অথচ এই মাতৃভূমির অধিকার আদায়ে যুগের পর যুগ লড়াই করছেন অসহায় ফিলিস্তিনিরা। দখলদার ইসরায়েলের দখলদারির বিরুদ্ধে সংগ্রামে শহিদ হয়েছেন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নারী, শিশু ও পুরুষ। কারাভোগ করছেন আরও হাজার হাজার মানুষ। মাঝে মাঝে চুক্তির মাধ্যমে কিছু ফিলিস্তিনি মুক্তি পেলেও ইসরায়েলের নানান শর্তের বেড়াজালে নিজ দেশে ফিরতে পারেন না অনেক ফিলিস্তিনি। বহু অমানবিক নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে বহু বছর পর মুক্তি পেলেও পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারেন না তারা। স্বদেশ ছেড়ে দখলদার সরকারের চাওয়ায় নির্বাসিত হতে হয় ভিনদেশে।
দীর্ঘ ১৫ মাসের বেশি সময় ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে গত রোববার থেকে যুক্তরাষ্ট্র, মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি তিন ধাপের যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির ৪২ দিনের প্রথম পর্যায়ে ৩৩ জন ইসরায়েলি নারী, শিশু, পঞ্চাশোর্ধ পুরুষ এবং বিশেষভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের বিনিময়ে এক হাজার ৯০৪ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে ইসরায়েল। তাদের মধ্যে ৭৩৭ জন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন। ইতিমধ্যে সাতজন ইসরায়েলি জিম্মির মুক্তির বিনিময়ে ২৯০ জন ফিলিস্তিনি বন্দি মুক্তি পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ১২১ জন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ব্যক্তি ছিলেন।
হামাসের হাতে মুক্তিপ্রাপ্ত ইসরায়েলি জিম্মিরা মুক্তির দিনই ইসরায়েলে ফিরেছেন। পরিরারের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। তাদের ঘিরে ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বে বাধঁভাঙা উল্লাস দেখা গেছে।
তবে ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনিদের গল্পটা পুরো ভিন্ন, বিষাদ মিশ্রিত। মুক্তি পেলেও অনেকে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়া তো দূরে থাক অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় ফিরতে পারেননি। ইসরায়েলের আরোপিত শর্তের কারণেই এত বছর জেল খেটেও মাতৃভূমিতে ফিরতে পারেননি। তাদের তৃতীয় দেশে নির্বাসিত করা হয়েছে।
টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি ও বন্দিবিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনেদের মধ্যে যারা হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত তাদের কাতার ও তুরস্কে নির্বাসিত করা হবে। তাদের গ্রহণে দেশ দুটি প্রস্তুত রয়েছে। ইসরায়েলের দুজন কর্মকর্তা টাইমস অব ইসরায়েলকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
ইসরায়েলের দাবি, মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের দায়ে দণ্ডিত ফিলিস্তিনিরা গাজা বা পশ্চিম তীরে যেতে পারবেন না। তাদের তৃতীয় কোনো নির্বাসিত করতে হবে। ইসরায়েলের চাওয়া অনুযায়ী হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনিদের অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দিতে রাজি হয়েছে মিসর। তাদের মধ্যে ৭০ জন গত সপ্তাহে মুক্তি পেয়েছে এবং বর্তমানে কায়রোতে অবস্থান করছেন।
এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা এবং এই বিষয়ে অবগত একজন আরব কূটনীতিকের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, তুরস্ক প্রায় ১৫ জন ফিলিস্তিনিকে আশ্রয় দিতে রাজি হয়েছে এবং বাকিদের আশ্রয় দেবে কাতার। এ ছাড়া আলোচনা এখনো চলমান। পরবর্তীতে চুক্তির অংশ হিসেবে নির্বাসিত হওয়া কিছু ফিলিস্তিনি বন্দিকে আশ্রয় দিতে আরেকটি দেশের কাছে অনুরোধ করা হতে পারে।
কোন ফিলিস্তিনি বন্দিকে কোন দেশে নির্বাসিত করা হবে সেটা ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুইজন কর্মকর্তা।
কাতারে বর্তমানে হামাসের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা অবস্থান করছেন। সেখানে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রায়ই যুদ্ধবিরতি ও বন্দিবিনিময় আলোচনার জন্য যাতায়াত করেন। এ ছাড়া তুরস্কও আগে হামাসের শীর্ষ নেতাদের আশ্রয় দিয়েছে।
Leave a Reply