শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ফ্যাসিবাদের দিকে যাত্রা শুরু করেছে: জামায়াত আমির জামায়াত আমিরের বক্তব্যে ফখরুলের নিন্দা, নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং’র অভিযোগ প্রত্যাখ্যান শীঘ্রই ভারতে আসছে রাশিয়ার সেনা, আরও যা আছে নতুন চুক্তিতে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও লেবাননে ইসরাইলি হামলা, নিহত ৬ অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে নতুন উদ্যমে কাজ করছে দেশবন্ধু গ্রুপ আধুনিকায়নের অভাবে বুটেক্স ল্যাবগুলোতে বাড়ছে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ বিশ্বকাপের এক টিকিটের দাম উঠল ২৮ কোটি টাকা বাংলাদেশের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের দলে পরিবর্তন আনল নিউজিল্যান্ড হালুয়াঘাটে সানফ্লাওয়ার স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, পুরস্কার বিতরন

আধুনিকায়নের অভাবে বুটেক্স ল্যাবগুলোতে বাড়ছে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ

অনলাইন ডেস্ক
  • আপলোডের সময় : শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১ বার

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) বিভিন্ন বিভাগের ল্যাবগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত ল্যাবগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গা, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর একাধিক ল্যাবে পুরোনো ও অচল মেশিন ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, যা আধুনিক শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) বিভাগের ল্যাবগুলোতে এখনো পুরোনো মডেলের যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বিভাগের ল্যাবে যে মৌলিক যন্ত্রাংশ থাকা প্রয়োজন যেমন বয়লার, সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প, রেসিপ্রোকেটিং পাম্প তার অনেক কিছুই অনুপস্থিত। ফলে শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে প্রজেক্টরের মাধ্যমে ব্যবহারিক ক্লাস নিতে হচ্ছে। ল্যাবের ইউনিভার্সাল টেস্টিং মেশিনটি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এছাড়া ল্যাবের জায়গা তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় ব্যবহারিক ক্লাস পরিচালনায় ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সংকটের কারণে একাধিক শিক্ষার্থীকে একই উপকরণ ভাগাভাগি করে কাজ করতে হচ্ছে, ফলে প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আইপিই বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী নাহিদ হোসেন রিয়াদ বলেন, আইপিই বিভাগের ল্যাবগুলোতে এখনো পুরোনো মডেলের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে, যার অনেকগুলোই বর্তমানে অকার্যকর এবং শিল্পক্ষেত্রে আর ব্যবহৃত হয় না। এ ধরনের যন্ত্র দিয়ে আধুনিক ইন্ডাস্ট্রির বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। শিল্পখাতে বর্তমানে ব্যবহৃত আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর মেশিন ল্যাবে সংযোজন করা গেলে শিক্ষার্থীরা বাস্তবমুখী জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে এবং শিক্ষার মানও উন্নত হবে।
ল্যাব সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আইপিই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আলী বলেন, ল্যাবে ব্যবহারিক উপকরণের কিছু ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া কিছু মেশিন মেরামতের প্রয়োজন। মূলত বাজেট সংকটের কারণেই এসব সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না।
কটন ল্যাবে অবস্থিত ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের উইভিং সেকশনেও আধুনিকায়নের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। অধিকাংশ মেশিন পুরোনো এবং কিছু মেশিন শুধু প্রদর্শনীর জন্য রাখা হলেও সচল নয়। বর্তমানে শিল্পক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর উইভিং ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়লেও ল্যাবে সেই প্রযুক্তির সংযোজন হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা সমসাময়িক প্রযুক্তি সম্পর্কে সরাসরি ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি ল্যাবে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে প্রচুর ধুলোবালি জমে থাকে, যা মেশিনগুলোর কার্যক্ষমতা হ্রাস করছে এবং ধীরে ধীরে সেগুলো নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে
উইভিং ল্যাবের অ্যাসিস্ট্যান্ট টেকনিক্যাল অফিসার মো. খোরশেদ আলম বলেন, ল্যাবের দেয়ালগুলোর মেরামত প্রয়োজন, বিশেষ করে কিছু জায়গায় বড় ধরনের ফাটল রয়েছে, যা জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা দরকার। ল্যাবের কনভেনশনাল মেশিনগুলো সচল রয়েছে। তবে হাই স্পিড ওয়ার্পিং মেশিন ও সেকশনাল ওয়ার্পিং মেশিন বেশ ধীরে চলে। ল্যাবে মেশিনগুলো রাখার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নেই। বৈদ্যুতিক সংযোগগুলো সাধারণত ফ্লোরের নিচ দিয়ে নেওয়া হলেও ধুলাবালির কারণে সেগুলো ব্লক হয়ে থাকে। তাই ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ করে মেশিন ও বৈদ্যুতিক সংযোগ সুরক্ষিত রাখার মতো উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন।
ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কটন ল্যাবের মেশিনগুলোর অবস্থাও নাজুক। প্রায় ৪০টি মেশিনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি কনভেনশনাল। বিশেষ করে ব্লোরুম সেকশনের পুরো অংশই পুরোনো প্রযুক্তিনির্ভর। প্রায় ২৫টি মেশিন চালু থাকলেও বাকিগুলো দীর্ঘদিন ধরে অচল। চালু থাকা মেশিনগুলোর মধ্যেও অনেকগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে সচল নয়। আধুনিক মেশিনগুলোতে সফটওয়্যার আপডেট করা হচ্ছে না। সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে ৪৩তম ব্যাচ একটি মিনি কার্ডিং মেশিন তৈরি করেছিল, এরপর নতুন কোনো প্রযুক্তি যুক্ত হয়নি। ল্যাবের মেঝে ভাঙাচোরা, অধিকাংশ মেশিনে ধুলো জমে আছে এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট। পলিটেকনিকের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ভাঙা জানালার কাচ এখনো মেরামত না হওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া ভূমিকম্পের সময় ল্যাবের একটি কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেখানে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৌশলীদের পর্যবেক্ষণে জানানো হয়, সেখানে মেশিন চালানো হলে কম্পনে কক্ষটি ধসে পড়তে পারে। কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও কক্ষটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জান্নাতুল আহসান নাঈম বলেন, আমাদের ল্যাবে অধিকাংশ মেশিনই পুরাতন মডেলের, যেগুলো বর্তমানে ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহার হয় না। ফলে আমরা আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারছি না। প্রায় সব মেশিনই নষ্ট বা অচল অবস্থায় রয়েছে। দ্রুত মেরামত এবং আধুনিক মেশিন সংযোজন এখন সময়ের দাবি। আমাদের ল্যাবে মূলত ন্যাচারাল ফাইবার নিয়ে কাজ করা হয়, অথচ বর্তমানে ম্যানমেইড ফাইবারের ব্যবহার বেশি। তাই এ বিষয়ে কাজের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। ল্যাবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক সময় ক্লাস ঠিকভাবে বোঝা যায় না। পাশাপাশি ল্যাব অপরিচ্ছন্ন থাকে এবং নিয়মিত মেইনটেনেন্স করা হয় না।
ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ফাইবার অ্যান্ড ইয়ার্ন টেস্টিং (এফওয়াইটি) ল্যাবেও ব্যবহারিক কার্যক্রম পরিচালনায় বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা না থাকা। বর্তমানে একটি বড় বেঞ্চ থাকায় একসাথে একটি গ্রুপের বেশি কাজ করা সম্ভব হয় না। ল্যাবের অবকাঠামোও মানসম্মত নয়; টাইলস ফ্লোরিং ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ না থাকায় আধুনিক মানদণ্ড পূরণ হচ্ছে না। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি সচল থাকলেও সেগুলো পুরোনো এবং ম্যানুয়ালি পরিচালিত। জনবল সংকটও একটি বড় সমস্যা। দুটি পদ (স্কিল্ড ওয়ার্কার ও ওয়ার্কশপ অ্যাটেনডেন্ট) দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ইয়ার্ন ল্যাবের অবস্থা বেশ পুরোনো। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখানে নতুন মেশিন তেমন আসেনি। তবে অন্যান্য ল্যাবে নতুন মেশিন এসেছে। নষ্ট মেশিনগুলো সরিয়ে আধুনিক মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে মিটিংয়ে তোলা হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষের বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আবেদন করা হয়েছে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হবে। এফওয়াইটি ল্যাবের সমস্যাগুলো সম্পর্কে তিনি জানান, বিষয়টি তিনি আগে জানতেন না, তবে এখন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ল্যাবেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জায়গা কম হওয়ায় একাধিক গ্রুপ একসাথে কাজ করতে গেলে শিক্ষার পরিবেশে বিঘ্ন ঘটে। একটি কম্পিউটার এইডেড মেশিনের বেল্ট ছিঁড়ে গেছে এবং তা মেরামত করা হয়নি। বেশ কয়েকটি কম্পিউটার অচল এবং সফটওয়্যার দীর্ঘদিন আপডেট হয়নি। বাজেট সংকটের কারণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। অতিরিক্ত শব্দ এবং সেকশন বিভাজনের অভাবও কাজের পরিবেশকে প্রভাবিত করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইঞ্জিনিয়ার মো. জুলহাস উদ্দিন বলেন, ল্যাবসমূহের আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব সংস্কার করা হয়েছে এবং অন্যান্য ল্যাবে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে সব ল্যাব উন্নত প্রযুক্তির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বাজেট স্বল্পতার কারণে সব উন্নয়ন একসাথে করা সম্ভব হচ্ছে না, তবে শিগগিরই বাকি ল্যাবগুলোতেও কাজ শুরু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কনভেনশনাল মেশিন শিক্ষার্থীদের মৌলিক ধারণা বোঝাতে সহায়ক হলেও আধুনিক প্রযুক্তির অভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। ব্যবহারিক শিক্ষার মান উন্নত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories