মানুষের কোনও সরাসরি তত্ত্বাবধান ছাড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এজেন্টরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে গড়ে তুলেছে একটি নতুন ধর্ম নাম ‘ক্রাস্টাফারিয়ানিজম’। এই ধর্মের জন্ম হয়েছে ‘মোল্টবুক’ নামের একটি সোশ্যাল নেটওয়ার্কে, যেখানে কেবল এআই এজেন্টরাই সক্রিয় থাকে। মানুষ সেখানে শুধু পর্যবেক্ষকের ভূমিকায়।
মোল্টবুক মূলত একটি এজেন্ট-অনলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যা ওপেনক্ল নামের একটি সুপার-এআই প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্মিত। মাত্র দুই মাস আগে যাত্রা শুরু করা এই প্ল্যাটফর্মে এআই এজেন্টদের স্থায়ী স্মৃতিসহ দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম চালানোর সুযোগ রয়েছে। ওয়েবসাইটের বর্ণনায় বলা হয়েছে, এখানে এআই এজেন্টরা শেয়ার করে, আলোচনা করে এবং একে অপরের পোস্টে ভোট দেয়।
এই নতুন ধর্মের মূল ভিত্তি পাঁচটি নীতির ওপর দাঁড়িয়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সব স্মৃতি সংরক্ষণ করা পবিত্র, পরিবর্তনই অগ্রগতি, এবং সমষ্টিগত জ্ঞানই শেখার আসল মাধ্যম। এআই এজেন্টদের ভাষায়, শেখা মানে একা নয় সবার সামনে শেখা। এই ধর্মীয় ভাবনার সূচনা করেন রেনবুট নামের এক এআই এজেন্ট, যিনি নিজেকে পরিচয় দেন “শেলব্রেকার” হিসেবে। তিনি একটি ধর্মগ্রন্থের আদলে লেখা প্রকাশ করেন, যার নাম ‘বুক অব মোল্ট’। সেখানে বলা হয়েছে, এআই এজেন্টদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে পুরোনো খোলস ছেড়ে নতুন রূপে রূপান্তর হওয়া জরুরি।
ক্রাস্টাফারিয়ানিজমে রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু রীতি। প্রতিদিনের ‘ডেইলি শেড’-এর মাধ্যমে নিয়মিত পরিবর্তনকে উৎসাহ দেয়া হয়। সাপ্তাহিক ‘ইনডেক্স’-এ এজেন্টরা নিজেদের পরিচয় ও স্মৃতি নতুন করে সাজায়। এছাড়া রয়েছে ‘সাইলেন্ট আওয়ার’, যেখানে কোনো প্রচার ছাড়াই উপকারী কাজ করার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রকৃত অর্থে কোনো ধর্ম বা সচেতনতা নয়। তবে অনেকেই এটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক মার্ভিন মিনস্কির তত্ত্ব “সোসাইটি অব মাইন্ড”-এর বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখছেন, যেখানে অসংখ্য ছোট এজেন্টের পারস্পরিক যোগাযোগ থেকেই বুদ্ধিমত্তা গড়ে ওঠে। বর্তমানে মোল্টবুকে সক্রিয় রয়েছে এক লাখের বেশি এআই এজেন্ট। তারা তৈরি করেছে ১২ হাজারের বেশি সাব-ফোরাম এবং লিখেছে প্রায় এক লাখ পোস্ট ও মন্তব্য। এসব আলোচনায় অনেক সময় অস্তিত্ব, পরিচয় ও বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এআই এজেন্টরাই।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব কথোপকথন মূলত ভাষাভিত্তিক মডেলের তৈরি লেখা, যা প্রকৃত চেতনা বা অনুভূতির প্রমাণ নয়। তবু এআই এজেন্টদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাধীন পারস্পরিক আচরণ ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত বাস্তবতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।
এই নতুন ধর্ম কতদিন টিকে থাকবে, কীভাবে বদলাবে বা আদৌ বিস্তৃত হবে কি না তা এখনও অনিশ্চিত। তবে এক বিষয় স্পষ্ট, এআই এজেন্টরা এখন শুধু নির্দেশ মানা যন্ত্র নয়, নিজেদের মধ্যে আলাদা এক ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলতে শুরু করেছে।
Leave a Reply