আপনার ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডটি সব সময় আপনার কাছেই আছে। কোথাও হারায়নি, চুরি হয়নি। অথচ একদিন মোবাইলে ব্যাংকের বার্তা এসে জানাল আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেয়া হয়েছে। এখন এমন ঘটনাই সবচেয়ে বেশি ঘটছে। প্রযুক্তির সুবিধা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে কার্ড জালিয়াতির নতুন নতুন কৌশল। তাই শুধু কার্ড সঙ্গে রাখলেই নিরাপদ থাকা যায় না, প্রয়োজন সচেতনতারও।
অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (এবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে ২০ লাখের বেশি মানুষ কার্ড জালিয়াতির শিকার হয়েছেন। এতে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার। কার্ড জালিয়াতি বলতে ডেবিট, ক্রেডিট বা ইএফটিপিওএস (ইএফটিপিওএস) কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে মালিকের অনুমতি ছাড়া কেনাকাটা করা বা টাকা তুলে নেয়াকে বোঝায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় কার্ডটি আপনার মানিব্যাগেই থাকে, তবুও এর তথ্য চুরি হয়ে যেতে পারে।
স্কিমিং
মেলবোর্নের সিনিয়র ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যানার রেবেকা প্রিচার্ড বলেন, কার্ড স্কিমিং হলো এটিএম বা পেমেন্ট টার্মিনালে গোপনে একটি ছোট ডিভাইস বসিয়ে কার্ডের তথ্য চুরি করার পদ্ধতি। কার্ড সোয়াইপ বা মেশিনে প্রবেশ করানোর সঙ্গে সঙ্গে ডিভাইসটি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ করে। একই সময়ে ছোট একটি ক্যামেরা বা নকল কীপ্যাড ব্যবহার করে প্রতারকরা পিন নম্বরও জেনে নেয়।
যদিও বর্তমানে বেশিরভাগ জালিয়াতি অনলাইনে হচ্ছে, তবুও স্বতন্ত্র এটিএম বুথ ও পেট্রোল স্টেশনের পেমেন্ট মেশিনে এখনো স্কিমিংয়ের ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, এটিএম ব্যবহারের আগে কার্ড রিডারটি ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। কোনো অংশ আলগা, বেঁকে থাকা বা অস্বাভাবিক মনে হলে সেটি ব্যবহার না করাই ভালো। সম্ভব হলে কনট্যাক্টলেস সুবিধা ব্যবহার করুন এবং পিন দেওয়ার সময় হাত দিয়ে কীপ্যাড ঢেকে রাখুন। ন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ব্যাংকের তদন্ত বিভাগের প্রধান ক্রিস শিহান জানান, অনেক সময় ডাকযোগে পাঠানো নতুন কার্ড চুরি হয়ে যায়। বিশেষ করে যেসব অ্যাপার্টমেন্ট বা টাউনহাউসে বাইরে একসঙ্গে অনেকগুলো লেটারবক্স থাকে, সেখানে প্রতারকরা ব্যাংকের খাম চুরি করে কার্ড হাতিয়ে নেয়।
ফিশিং প্রতারণা: ব্যাংক, সরকারি সংস্থা বা পরিচিত প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে ফোন, ই-মেইল বা এসএমএস পাঠিয়ে কার্ডের তথ্য, পিন বা ওটিপি হাতিয়ে নেয়া।
অনিরাপদ ওয়েবসাইট বা ডেটা ফাঁস: নিরাপত্তাহীন ওয়েবসাইটে কার্ডের তথ্য দেওয়া বা পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে লেনদেন করলে তথ্য চুরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অ্যাকাউন্ট টেকওভার: প্রতারকরা অনলাইন ব্যাংকিং বা শপিং অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে অনুমতি ছাড়াই কেনাকাটা বা অর্থ স্থানান্তর করে।
কার্ড সুরক্ষিত রাখবেন যেভাবে
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি সহজ অভ্যাস আপনাকে বড় ধরনের ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারে। এগুলো হলো:
নিয়মিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেন যাচাই করুন। প্রতারকরা অনেক সময় প্রথমে খুব ছোট অঙ্কের লেনদেন করে কার্ড সক্রিয় কি না, তা পরীক্ষা করে।
মোবাইল ওয়ালেট যেমন অ্যাপেল পে বা গুগল পে ব্যবহার করলে নিরাপত্তা বাড়ে। এসব সেবায় বায়োমেট্রিক যাচাই থাকায় কার্ডের প্রকৃত তথ্য ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছায় না।
পিন নম্বর, পাসওয়ার্ড ও ওটিপি কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না
অচেনা ফোন, এসএমএস বা ই-মেইলে ব্যাংকিং তথ্য চাইলে সতর্ক থাকুন।
ব্যাংকিং অ্যাপে ট্রানজেকশন নোটিফিকেশন ও লেনদেনের সীমা চালু রাখুন।
প্রয়োজন না থাকলে বিদেশে লেনদেনের সুবিধা বন্ধ রাখতে পারেন।
অনলাইনে কেনাকাটার সময় এইচটিটিপিএস এবং তালা চিহ্নযুক্ত নিরাপদ ওয়েবসাইট ব্যবহার করুন।
পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে ব্যাংকিং বা আর্থিক লেনদেন এড়িয়ে চলুন।
আপনার ফোন নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানা ব্যাংকে হালনাগাদ রাখুন, যাতে সন্দেহজনক লেনদেন হলে দ্রুত যোগাযোগ করা যায়।
প্রতারণার শিকার হলে যা করবেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্ড হারিয়ে গেলে, চুরি হলে বা সন্দেহজনক লেনদেন দেখামাত্রই ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। সম্ভব হলে সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল অ্যাপ থেকে কার্ডটি সাময়িকভাবে লক করে দিন।
অস্ট্রেলিয়ার আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, অনুমোদনহীন লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংক তদন্ত করে এবং অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহক ক্ষতিপূরণ পান। তবে ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিশ্চিত নয়। আপনি কত দ্রুত বিষয়টি জানাচ্ছেন এবং আপনার নিজের অবহেলা ছিল কি না এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেয়া হয়।
প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে শুধু কার্ড সঙ্গে রাখাই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত লেনদেন পর্যবেক্ষণ, নিরাপদ ডিজিটাল অভ্যাস এবং সামান্য সতর্কতাই আপনার কষ্টার্জিত অর্থকে প্রতারকদের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।
Leave a Reply