মালিকানা দ্বন্ধের কারণে গত প্রায় ৪ বছর যাবৎ ময়মনসিংহের ভালুকায় গড়ে উঠা দেশের প্রথম রেপটাইলস কুমির ফার্মের কুমিরের চামরা ২০১৯ সাল থেকে রপ্তানি হচ্ছে না আর। চলতি বছরের মার্চ মাসে হাইকোর্ট কর্তৃক নিয়োজিত গঠনকৃত পরিচালনা পর্ষদ ফার্মটির দায়িত্ব নিলেও এখনও চামড়া রপ্তানি নিয়ে শঙ্কা কাটছে না । এদিকে কুমিরের প্রজন মৌসুমে কুমিরের ডিম পাওয়া গেলেও রক্ষাণাবেক্ষণের অভাবে হচ্ছে না সফল প্রজনন। তাছাড়া বিভিন্ন জটিলতায় বেতন ভাতাও পাচ্ছে না ফার্মে নিয়োজিত কর্মচারীরা।
পি কে হালদারের ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে প্রায় বন্ধ হওয়া রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড রক্ষা করতে বাংলাদেশ হাইকোর্ট থেকে একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেওয়া হয়েছে। ওই পর্ষদে ব্যাবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অস্ট্রোলিয়া প্রবাসী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিশিষ্ট কুমির বিশেষজ্ঞ এনাম হক। তার নির্দেশনায় বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে খামারটি।
২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পাঁচবারে ১হাজার ৫০৭টি কুমিরের চামরা রপ্তানি করা হয়েছে। রপ্তানি করা প্রতিটি চামড়া প্রকারভেদে ২০০ থেকে ৬০০ ডলারে বিক্রি হতো। পাঁচ শতাধিক চামড়া রপ্তানিযোগ্য থাকলেও কেন রপ্তানি হয়নি ? এমন প্রশ্ন করলে ফার্ম ম্যানেজার আবু সাইম মোহাম্মদ আরিফ জানান, কোভিড পরিস্থিতির কারণে সম্ভব হয়নি রপ্তানি।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার শুরুতে রেপটাইলস কুমির ফার্মের ৩৬ শতাংশ শেয়ার ছিল মেজবাহুল হকের। যিনি সম্পর্কে মুশতাক আহমেদের মামা। আর ১৫ শতাংশ শেয়ার ছিল মুশতাক আহমেদের। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইইএফ প্রকল্পের ঋণ নেওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শেয়ার ছিল ৪৯ শতাংশ। সেই হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি ব্যাংক কর্মকর্তা প্রিতিশ কুমার সরকার ছিলেন পরিচালক। এরপরও কুমিরের খাবার, প্রজনন ও পরিচর্যার কাজে মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন পড়ে। তখনই মেজবাহুল হক ও মুশতাক আহমেদের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়তে থাকে। যা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রিতিশ কুমার সরকারের পক্ষ থেকে মুশতাক আহমেদকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়, ‘৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের শেয়ার কিনে নেওয়ার জন্য টাকা জমা দিতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪৯ শতাংশ শেয়ারের পুরোটাই মেজবাহুল হকের নামে হস্থান্তর করা হবে।’
তখনই প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদারের সঙ্গে প্রিতিশ কুমার সরকারই মেজবাহুল হক ও মুশতাক আহমেদের যোগাযোগ ঘটিয়ে দেন। একপর্যায়ে ২০১২ সালে খামারের শেয়ার ছাড়তে বাধ্য হন কুমির খামারের স্বপ্নদ্রষ্টা মুশতাক আহমেদ।
জানা গেছে, ২০১৩ সালের দিকে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর রেপটাইলস ফার্মের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ বের করে নেন প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদার, যা আর শোধ হচ্ছে না। ফলে গত দুই বছর যাবৎ ওই ফার্মের অপ্রচলিত এই পণ্য আর রপ্তানি সম্ভব হয়নি। এমনকি চলতি বছরের কোনো উদ্যোগ নেই কুমির অথবা চামড়া রপ্তানির। উল্টো বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ২৫ একর আয়তনের এ খামারটিতে।
সরেজমিন ভালুকার উথুরা ইউনিয়নের হাতিবের গ্রামে প্রতিষ্ঠিত ওই খামারটিতে গিয়ে জানা যায়, বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে কুমির রয়েছে ২ হাজার ৮০০র বেশি। এর মধ্যে প্রজননক্ষম কুমির আছে ১২০টি। জানা যায়, বিশ্ববাজারে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৪ সালে ময়মনসিংহের ভালুকায় শুরু হয় কুমির চাষ। যা ছিল সমগ্র এশিয়ার মধ্যেই প্রথম বাণিজ্যিক কুমির খামার প্রকল্প। যা আজ প্রায় িবলুপ্তির পথে।
ফার্ম ম্যানেজার আবু সাইম মোহাম্মদ আরিফ জানান, ‘বর্তমানে কুমিরের প্রজনন মৌসুম চলছে। তাই সাধারণ দর্শনার্থীর প্রবেশ বন্ধ রয়েছে। তবে, আগামী মৌসুমে স্বল্প পরিসরে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য টিকিটের মাধ্যমে পর্যটন ব্যাবস্থাপনা করার চিন্তা রয়েছে।
Leave a Reply