দেশে এবং বিদেশে নাজিম সরকার, অপু সরকার ও অমির রয়েছে অঢেল সম্পদ, বিদেশে সেকেন্ড হোম # অমির রয়েছে উত্তরায় অর্ধশত ফ্ল্যাট ও প্লট
জনপ্রীয় অভিনেত্রী পরীমণিকে হত্যা ও ধর্ষণ চেষ্টা মামলা পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে বেরিয়ে আসছে একের পর এক রাঘব বোয়লদের নাম এবং রোমহর্ষক তথ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্লাব পাড়ায় মদ, জুয়া ও সুন্দরী নারীদের ব্যবহার করে একটি প্রভাবশালী চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। ক্লাব রিসোর্টের আড়ালে অবৈধ ব্যবসা করে দেশে অঢেল সম্পত্তি ও বিদেশে টাকা পাচার করে সেকেন্ড হোমের সন্ধান পেয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্লাব পাড়ায় মদ-জুয়া ও সুন্দরী নারীদের ব্যবহার করে বড় বড় কাজ ভাগিয়ে নেয়া এবং দেশে-বিদেশে তরুণী পাচার করে টাকা আয়ের সংঘবদ্ধ গ্রুপের অন্যতম হোতা রাজধানীর তুরাগ থানার ধৌড় এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী নাজিম সরকার ও তার ভাই অপু সরকারের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে আইনশঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ওই সূত্রটি জানায়, অভিজাত এলাকা উত্তরা, বনানী, বারিধারা, গুলশান ও গাজীপুরে রিসোর্ট, ক্লাব কেন্দ্রিক রয়েছে নাজিম সরকারে বিশাল সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের প্রধান সমন্বয়কারী তার চাচাতো ভাই টঙ্গীর অপু সরকার। রাকিব উদ্দিন ওরফে অপু সরকার গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী আউচপাড়া বেক্সিমকো রোডে গত মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ১৪ তলা ভবন করেছেন। অভিনেত্রী পরীমণির মামলায় গ্রেফতার ব্যবসায়ী ও জাতীয় পার্টির নেতা নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও তুহিন সিদ্দিকী অমি তাদের ব্যবসায়িক পার্টনার বলে জানায় সূত্রটি। তারা গ্রেফতারের পর নাজিম ও অপু সরকার দেশ ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে ইতিমধ্যেই কোভিড-১৯ পরীক্ষার রিপোর্ট সংগ্রহ করেছেন। তবে ইতিমধ্যে নাজিম, অপু ও অমির ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। যে কোনো সময় তারা আইনের আওতায় আসতে পারেন-এমন আভাস পেয়ে নাজিম ও অপু সরকার আত্মগোপনে রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, নাজিম সরকার ও অপুর বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের নজরদারিতে রেখেছে গোয়েন্দা পুলিশ।
ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য এলাকায় ক্লাব পাড়ায় নাজিম সরকার, ও অমিকে সবাই চেনে বন্ধু হিসেবে। তবে নেপথ্যে কাজ করা অপু সরকার অন্তরালে থেকে নারী পাচার, মদ, জুয়ার কারবার করে যাচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সুন্দরী তরুণীদের টার্গেট করে এই সিন্ডিকেটে আনতে তাদের বিশ্বস্ত এজেন্ট ব্যবহার করছে বলে তদন্ত শ্লিষ্টরা জানিয়েছে।
এ ব্যাপারে ডিবির যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশিদ গণমাধ্যমকে বলেন, এদের কর্মকান্ড নিয়ে এরই মধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। এই জগতে তাদের বিচরণ অনেক দিনের। অমির সঙ্গে নাজিম ও অপু সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার তথ্যও আমরা পেয়েছি।
তদন্ত সূত্র জানায়, অমি, নাজিম ও অপুর কানাডায় সেকেন্ড হোম রয়েছে। অমির উত্তরায় প্রায় অর্ধশত ফ্ল্যাট ও প্লটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে দুদকও তদন্ত শুরু করেছে।

কে এই নাজিম সরকার ঃ জামাত নেতা মীর কাশেম আলীর আশির্বদপুষ্ট ছিলেন নাজিম সরকার। মীর কাশেম আলীর উত্তরণ প্রপার্টিজের তত্ত্বাবধানে ছিলেন নাজিম সরকার। মীর কাশেম আলীর ফাঁসির পর উত্তরণ প্রপার্টিজ দখল করে নিজেই কোম্পানীর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন নাজিম সরকার।
গাজীপুরের কালীগঞ্জে তার রিসোর্ট ও উত্তরা হাউস বিল্ডিংয়ে রেস্টুরেন্ট রয়েছে। উত্তরার রয়েল ক্লাবেরও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নাজিম সরকার। নাজিম ও তার চাচাতো ভাই অপু সরকার সাভারের বিরুলিয়ায় বোর্ট ক্লাব, গুলশানে এসিসি বা অল কমিউনিটি ক্লাব, উত্তরা ক্লাব, পূর্বাচল ক্লাব, রয়েল ক্লাবসহ উত্তরায় ছোট বড় প্রায় সকল ক্লাবের আজীবন সদস্য। নাজিম সরকার বিগত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে উত্তরায় অনেকের বাড়ি দখর করারও অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ উত্তরা হাউজ বিল্ডিং সাইদ গ্রান্ডের পশ্চিম পাশে ডা. নূর জাহানের বায়না করা বাড়ি ভাংচুর করে দখল করে নেয় এই নাজিম সরকার। টঙ্গী তথা গাজীপুর বিএনপির প্রভাবশালী একাধিক নেতার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় নাজিম ও অপু সরকার। অভিযোগ রয়েছে, উত্তরায় বিএনপির প্রভাবশালী কোন নেতা না থাকায় টঙ্গী বিএনপির ওই প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার নাম ভাঙ্গিয়ে নাজিম সরকার চাঁদাবাজি ও জমি দখল বাণিজ্য করার। এক সময় নাজিম সরকারের আস্তানা ছিল উত্তরার আকাশ প্লাজার একটি হোটেলে। সেখানে তারা মদকে মধু কোর্ড নামে অভিহিত করে। নাজিম সরকার ধৌড়, ডিয়াবাড়ি-আশুলিয়া এলাকায় হিন্দুদের সম্পত্তি নামমাত্র টাকায় কেনার নামে জোরপূর্বক দখল করে নেয়। ওই এলাকায় তার এক চাচার প্রায় ছয় বিঘা জমিও জাল দলিল করে দখল করে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তার বাড়ির আশপাশে তার চাচাদের জায়গায় যেতে বাধা দিয়ে থাকেন। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের ৬/এ নম্বর রোডে একটি আলিশান বাড়ি করেছেন নাজিম সরকার। তিনি নিজে বিএইড গাড়ী হাঁকিয়ে বেড়ান এবং তার ভাইদেরকেও কয়েকটি প্রাডো গাড়ি কিনে দিয়েছেন। নাজিম সরকারের স্ত্রী রাকা এবং অপু সরকারের স্ত্রী পন্নিও উত্তরায় একাধিক ক্লাবের সদস্য। ক্লাবে গভীর রাতে তাদের আড্ডা বসে। গাজীপুরের বাড়িয়া ইউনিয়নে নাজিম সরকারের ৩০০ বিঘা জমি, উলুখোলায় একটি আধুনিক রিসোর্ট ও ৭০ বিঘা জমিসহ নামে বেনামে রয়েছে তার অঢেল সম্পত্তি ও একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বিদেশে রয়েছে সেকেন্ড হোম। নাজিম সরকার সম্প্রতি চাচাতো বোনদের জিম্মি করে নামেমাত্র টাকায় তাদের ওয়ারেশি সম্পত্তিও লিখে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অপু সরকার : অপরদিকে অপু সরকার গাজীপুর মহানগরের ইছালি এলাকায় ৭০ বিঘা জায়গায় বহুতল বিশিষ্ট একটি আধুনিক রিসোর্ট, টাঙ্গাইলের মধুপুরে জুস ফ্যাক্টরি, ধানমন্ডি ও উত্তরায় কয়েকটি প্লট ও প্ল্যাটের মালিক। কুমিল্লায় শ্বশুর বাড়ি এলাকায়ও রয়েছে তার অঢেল সম্পদ। কানাডার টরেন্ডোতে রয়েছে তার বিশালবহুল ফ্ল্যাট বাড়ি ও ব্যবসা। উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর রোডে তার একটি ছয় তলা বাড়ি রয়েছে। অপুর টঙ্গীর আউচপাড়া বেক্সিমকো রোডের ১৪ তলা সুইমিংপুল বিশিষ্ট চোখ ধাঁধানো বাড়ির ১৩ ও ১৪ তলায় নাজিম ও অপু সিন্ডিকেটের প্রায়ই মদের আসর বসিয়ে থাকে বলে সূত্রটি জানায়। সেখানে এসব পরিবেশনের দায়িত্বে থাকেন অপু ও নাজিম সরকারের স্ত্রী। গভীর রাতে এই সিন্ডিকেটের বড় সদস্যরা দামী-দামী গাড়ি নিয়ে ওই আসরে যোগ দেন বলে স্থানীয়রা জানান। অপু সরকারেরও রয়েছে একাধিক দামী গাড়ি। তাদের আয়ের সাথে ব্যায়ের কোন সঙ্গতি নেই।
একাধিক সূত্র জানায়, দক্ষিণখানে হলি ডে প্ল্যানার রিসোর্টে নিয়মিত ডিজে পার্টির আয়োজন করেন তুহিন কাজী ও অমি। আশকোনায় অমির সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টার নামের একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই ট্রেনিং সেন্টারের অন্তরালে দীর্ঘদিন ধরে দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও ইউরোপে মানব পাচার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন অমি চক্র। দুবাইয়েও রয়েছে তার বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ঢাকা ও টাঙ্গাইলে একাধিক বহুতল বাড়ি, মার্কেট, প্লট, ফ্ল্যাটসহ নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ। ইতিমধ্যেই তার মালিকানাধীন সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টারে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। রাজধানীতে হাই সোসাইটির ধনাঢ্য প্রতাপশালী একটি শ্রেনীর কাছে অমি ‘প্রোডাক্ট’ সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত। আর সেই ‘প্রোডাক্ট’ অমির কাছে ললনাদের নিয়ে আসেন তুহিন কাজী। এভাবে হাত বদল হয়ে ওই জগতে বিচরণকারী ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে এদের পৌছে দেন অমি। এই চক্রে শতাধিক সুন্দরী নারী রয়েছেন।
এব্যাপারে নাজিম সরকারের সাথে তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে অপু সরকার বলেন, বোর্ট ক্লাবের সদস্য দুই হাজার। কোন সদস্য অপরাধ করলে এর জন্য আমরা সকলে দায়ী হতে পারি না। দেশ-বিদেশে নিজের সম্পত্তির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি পৈত্রিক সূত্রেই ধন-সম্পদের মালিক। তাছাড়া বিদেশে লেখা পড়া করে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করে ব্যবসার মধ্যদিয়ে অর্থ-সম্পদ অর্জন করেছি।
#
Leave a Reply