বর্তমান বিশ্বে অসংক্রামক রোগসমূহ জনস্বাস্থ্যের জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ডায়াবেটিস, যা ধীরে ধীরে এক নীরব মহামারিতে রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে মধ্য বয়সী মানুষদের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে।
মধ্য বয়স―সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সকে নির্দেশ করে, এমন একটি সময় যখন মানুষের জীবনযাত্রায় বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে। এই সময় কর্মজীবনের চাপ, শারীরিক কার্যক্রমের হ্রাস, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং মানসিক চাপ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। নগরায়ন ও আধুনিক জীবনযাত্রার ফলে মানুষ ক্রমেই স্থবির হয়ে পড়ছে, যা ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের দিকে ধাবিত করে।
মধ্য বয়সে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের ঝুঁকি এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় সম্পর্কে চ্যানেল 24 অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন রাজধানীর গুলশান ডায়াবেটিস কেয়ারের জনস্বাস্থ্য ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. রিফাত আল মাজিদ ভূইয়া। এ চিকিৎসক বলেন―
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সমস্যা আরও প্রকট। শহরাঞ্চলে ফাস্টফুডের সহজলভ্যতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা মধ্য বয়সীদের মধ্যে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একইসঙ্গে, অনেকেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন না, ফলে রোগটি দীর্ঘদিন অজান্তেই থেকে যায় এবং জটিলতা বাড়ে। ডায়াবেটিসের ফলে হৃদরোগ, কিডনি বিকলতা, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস এবং স্নায়ুজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা জীবনের মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
পারিবারিক ইতিহাসও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ কারণ। যাদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে, তাদের মধ্য বয়সে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় ধূমপান, অ্যালকোহল গ্রহণ, অনিয়মিত ঘুম এবং মানসিক চাপ, তবে ঝুঁকি অনেকাংশে বৃদ্ধি পায় বলে জানান তিনি।
ডা. রিফাত আল মাজিদ বলেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ। প্রথমত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। গণমাধ্যম, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি, লক্ষণ এবং প্রতিরোধ সম্পর্কে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্ক্রিনিং ব্যবস্থাকে সহজলভ্য করতে হবে, বিশেষ করে ৪০ বছরের ঊর্ধ্বে সবার জন্য। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা গড়ে তোলা—যেমন নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য গ্রহণ, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা, যা এই রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া সরকারি পর্যায়ে নীতিনির্ধারণেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। নগর পরিকল্পনায় হাঁটার পথ, পার্ক এবং খেলার মাঠের সংখ্যা বাড়ানো, খাদ্যশিল্পে স্বাস্থ্যকর বিকল্প উৎসাহিত করা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেয়া সময়ের দাবি বলে জানান এ চিকিৎসক।
সবশেষে বলা যায়, মধ্য বয়সে ডায়াবেটিস কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রার ফল। এ জন্য এখনই সচেতন না হলে ভবিষ্যতে এই নীরব মহামারি আরও ভয়াবহ রূপ ধারন করতে পারে। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে বলে মনে করেন ডা. রিফাত আল মাজিদ।
Leave a Reply