মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:২৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত উলিপুর পৌরসভার মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন বিষয়ক পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত কর্মসংস্থান বাড়াতে বাংলাদেশে ভিসার প্রযুক্তি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার স্থাপনের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের সহযোগিতা করতে সরকার প্রস্তুত: প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় যুক্তরাষ্ট্র আমাদের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র : তথ্যমন্ত্রী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন তারেক রহমান সৌদিতে কারখানায় আগুন॥ নওগাঁর ১৩ পরিবারে শোকের মাতম বাংলা কিউআর লেনদেনে চার্জ প্রত্যাহার, মিলবে প্রণোদনা পৌনে ২ লাখ ভিসা বাতিল করলো যুক্তরাষ্ট্র পর্তুগালে বিশ্বনাথী প্রবাসীদের বর্ণাঢ্য প্রীতিসন্ধ্যা

সৌদিতে কারখানায় আগুন॥ নওগাঁর ১৩ পরিবারে শোকের মাতম

নওগাঁ প্রতিনিধি
  • আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার

ইচ্ছে পূরণের স্বপ্নগুলো কেবলই সত্যি হতে শুরু করেছিল। কিন্তু হঠাৎই উলট-পালট হয়ে গেল সবকিছু। সৌদি আরবে সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেল নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ পরিবারের স্বপ্ন। একসময় যাদের অপেক্ষায় দিন গুনতেন স্বজনরা, এখন তাদের মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ পরিবারগুলো। স্বজন হারানোর কান্না আর আহাজারিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে এলাকাজুড়ে।
রোববার দুপুরে সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ঘটনাস্থলেই ১৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহত ১৬ জনের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়।
নিহতদের মধ্যে চারজন একই গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন—আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামের মোহন প্রামাণিক (২২), তাঁর ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬), একই গ্রামের রুবেল প্রামাণিক (৩০) ও কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫)।
এ ছাড়া নিহতদের মধ্যে রয়েছেন উপজেলার সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) এবং নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন (৩৮)।

কান্নায় ভারী নিহতদের বাড়ির পরিবেশ :

গন্ডগোহালি, উজানপৈ ও ডুবাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহতদের বাড়িতে এখন শুধু কান্নার শব্দ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। কেউ বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন, কেউ প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। আবার কেউ বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।
স্বজনদের চোখের পানি দেখে সান্ত্বনা দিতে আসা মানুষগুলোর চোখও ভিজে উঠছে। একে অন্যকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেরাই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই, শুধু প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক আর বুকফাটা আহাজারি।

বাড়ি এসে বিয়ে করমু মা :

গন্ডগোহালি গ্রামের দুই ভাই মোহন ও সুমনকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা ময়না খাতুন বলেন, ‘বড় ছাওয়াল গেছে সাত বছর হচ্ছে, আর মেজো ছাওয়াল গেছে দুই বছর। কোনোদিনও ছুটিতে আসেনি। ছাওয়ালটা বলছিল, মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি। বাড়ি এসে বিল্ডিংয়ের কাজটা শেষ করে বাড়ি আসব। বাড়ি এসে বিয়া করমু মা। মেয়ে-টেয়ে দেখো না, আমি ১০টা দেখে একটা বিয়ে করমু। কিন্তু আসা হলো না। কী সর্বনাশ হলো বাবা আমার।

১৪ দিনের সন্তান রেখে চলে গেল :

একই গ্রামের নিহত রুবেল প্রামাণিকের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর বলেন, ‘আমার রুবেলের সৌদি যাওয়ার নয় বছর হলো। সাড়ে ছয় বছর পর ছুটিতে আইছিল। আসার পরে ছাওয়ালোক আবার বিয়া দিলাম। বিয়া করে আবার সৌদি গেল। যাওয়ার দুই বছর পর আবার বাড়িতে আলো এলো। ছয় মাসের ছুটি কাটিয়ে আবার গেল। ছয় মাস ছুটি কাটিয়ে যাওয়ার মাত্র তিন মাস হলো। ওখানে সোফা সেটের কাজ করত আমার ছাওয়াল।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, আমার তো আর দুনিয়ার বুকে কেউ থাকল না বাবা। আমার নাতনি হইছে, মাত্র ১৪ দিন হয়েছে। ১৪ দিনের ছাওয়াল থুয়ে চলে গেল।’

একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে অসহায় পরিবার :

এদিকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে দিশেহারা উজানপৈ গ্রামের ময়েন শেখ ও তাঁর স্ত্রী সাফিয়া খাতুন। তাঁদের বড় ছেলে ফরিদ শেখ দেড় বছর আগে সৌদি আরবে যান।
ময়েন শেখ বলেন, ‘ছেলেটাক বিদেশ পাঠাতে হামি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে আছি। ফরিদের পাঠানো টাকা দিয়েই সংসার চলছিল। এখন ঋণ শোধ করমু ক্যামন করে আর সংসার চালামু ক্যামনে?’
ফরিদের স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে পুরো পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে।

ঘুমন্ত অবস্থায় আগুনে সবাই মারা যান :

ডুবাই গ্রামের নিহত হাসিবুল হাসান শুভর চাচা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানায় থাকা শ্রমিকেরা সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় আগুন লাগায় হাসিবুলসহ সেখানে থাকা সব শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ওই কারখানার শ্রমিকেরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকেন এবং রাতে কারখানায় কাজ করতেন।
আনোয়ারুল ইসলাম আরও বলেন, হাসিবুল পরিবারের বড় ছেলে ছিলেন। বিএ পাস করে স্থানীয় একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। সেই চাকরি চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার ছিলেন। পরে জীবিকার সন্ধানে এবং পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে তিন বছর আগে সৌদি আরবে যান।

মরদেহ দেশে আনার উদ্যোগ :

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত এবং তাঁদের মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দ্রুত দেশে আনার বিষয়ে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেশে মরদেহ আসতে কিছুদিন সময় লাগতে পারে। সৌদি দূতাবাস ও নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories