অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নেতৃত্বে ১৩টি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ সংগঠনের একটি জোট যৌথভাবে একটি আবেদন জানিয়েছে। এতে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার নিয়ে কাজের ওপর বাড়তে থাকা সব ধরনের বিধিনিষেধ অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এবং আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারারের কাছে পাঠানো এক খোলা চিঠিতে জোটটি সতর্ক করে বলেছে, “জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা এবং ‘ভুল তথ্য’ যেন ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে দেখানো, সংবাদকক্ষ নিয়ন্ত্রণ করা বা পুরো জনগোষ্ঠীকে যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করার অজুহাত না হয়।”
সংগঠনগুলো বলেছে, ইলেকট্রনিক অপরাধ প্রতিরোধ আইন (পেকা)-এর অধীনে ‘অস্পষ্ট সাইবার অপরাধের ধারা ব্যবহার করে আইনে সুরক্ষিত মত প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে দেখানো এবং সমালোচনামূলক কণ্ঠকে ভয় দেখানোর একটি বড় ধারা’ দেখা যাচ্ছে। চিঠিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সম্প্রতি পরিচিত সাংবাদিকদের, যার মধ্যে আসাদ আলী তুরও আছেন, তলব করা হয়েছে। পাশাপাশি বড় বড় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদক এবং স্থানীয় প্রেস ক্লাবগুলোকেও নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শুধু আইনি পদক্ষেপ নয়, সংবাদকক্ষ ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ওপর সরকারের চাপও বেড়ে চলেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছে, সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করার কারণে সাংবাদিক ও উপস্থাপকদের সম্প্রচার থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মুনিজায়ে জাহাঙ্গীর, মতিউল্লাহ জান এবং কাশিফ আব্বাসির নাম রয়েছে। তারা পাকিস্তান ইলেকট্রনিক মিডিয়া নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের শাস্তিমূলক পদক্ষেপেরও নিন্দা জানিয়েছে।
এর মধ্যে জরিমানা, সম্প্রচার স্থগিত এবং চাকরি নিয়ে নির্দেশনা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ রয়েছে, যা ব্যাপক আত্মনিয়ন্ত্রণ বা নিজেরাই খবর চেপে রাখার পরিবেশ তৈরি করছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আগেও পেকার আওতায় ডন-এর সাংবাদিক মুহাম্মদ আকবর নোটেজাই, লাহোর প্রেস ক্লাবের সভাপতি আরশাদ আনসারি, সাংবাদিক মুজাহিদ শেখ, শেরাজ নিসার, আহমদ ফারাজ, ইয়াসির শামুন ও ওয়াসিম সাবির এবং আইনজীবী তারিক আফগানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকতা, আইনি সহায়তা, রাজনৈতিক সমালোচনা বা মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদনকে অপরাধ হিসেবে দেখাতে এই আইন ব্যবহার করা যাবে না। টেলিভিশনের সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমের ব্যবস্থাপনার ওপর পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের চাপ নিয়েও আমরা সমানভাবে উদ্বিগ্ন। সাংবাদিক সংগঠন ও অধিকার সংগঠনগুলো বলেছে, আজ টিভিতে ১১ বছর ধরে প্রচারিত সাংবাদিক মুনিজায়ে জাহাঙ্গীরের সংবাদ ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে প্রতিশোধ হিসেবে।
কারণ তিনি এমন বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করেছিলেন, যেগুলোকে খুব সংবেদনশীল মনে করা হয়। এর মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতার একটি সাক্ষাৎকারও ছিল।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘এর আগে চলতি বছরের শুরুতে সাংবাদিক মতিউল্লাহ জানকে নিও নিউজ থেকে হঠাৎ চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। খবর অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের একই ধরনের চাপের কারণেই এটি করা হয়। একইভাবে উপস্থাপক কাশিফ আব্বাসির অনুষ্ঠানও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এটি মানুষকে জোর করে চুপ করিয়ে দেওয়ার বড় একটি ধারার অংশ। ২০২১ সালে হামলার শিকার এক সাংবাদিকের সমর্থনে আয়োজিত বিক্ষোভে বক্তব্য দেওয়ার পর সাংবাদিক হামিদ মিরকে জিও নিউজ সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছিল।’ চিঠিতে স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলো আরো দাবি করেছে, মানবাধিকারবিষয়ক আইনজীবী ইমান জয়নাব মাজারি-হাজির এবং হাদি আলী চাট্টাকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। তারা জানুয়ারি থেকে পেকার মামলায় কারাগারে আছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, তাদের আটক রাখা জাতিসংঘের আইনজীবীদের ভূমিকা সম্পর্কিত মৌলিক নীতিসহ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সরাসরি লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘তাদের আপিল এবং সাজা স্থগিতের আবেদন এখনো আদালতে মূলভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। অথচ মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট ইসলামাবাদ হাইকোর্টকে দুই সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দিয়েছিল। ২৮ জুলাই তাদের আইনজীবীরা আবারও জরুরি শুনানির আবেদন করেছেন।’ ডিজিটাল অধিকার প্রসঙ্গে জোটটি যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার নীতির সমালোচনা করেছে। জুন মাসে শুরু হওয়া বিঘ্নের পর পাকিস্তান অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে পুরোপুরি ইন্টারনেট সেবা চালু করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আল জাজিরার সংবাদ ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ দ্রুত প্রত্যাহার এবং বিদেশি গণমাধ্যম সহায়তা নির্দেশিকার কড়াকড়ি তুলে নেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের উচিত সাংবাদিক, আইনজীবী এবং মানবাধিকারকর্মীসহ সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তারা শুধু নিজেদের কাজ করার কারণে যেন শাস্তির মুখে না পড়েন।’ এতে সরকারকে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে থাকা আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার কথাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই যৌথ আবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আর্টিকেল ১৯, পাকিস্তান মানবাধিকার কমিশন, ডিজিটাল রাইটস ফাউন্ডেশন, বোলো ভি, লইয়ার্স ফর লইয়ার্স এবং আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন সহ-স্বাক্ষর করেছে।
Leave a Reply