বাংলাদেশে একসময় প্রায় নির্মূলের পথে থাকা হাম (Measles) আবারও উদ্বেগজনকভাবে ফিরে এসেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টিকাদানের ঘাটতি, অপুষ্টি এবং অতিরিক্ত জনঘনত্ব―এই তিনটি প্রধান কারণে হাম রোগ দ্রুত বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ‘ভাইরাল জিনোমিক্স অ্যান্ড ইনফেকশন ডাইনামিক্স ল্যাবরেটরির’ পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. গোলজার হোসেন।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ভেটেরিনারি অনুষদের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের ওই অধ্যাপক হাম রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
অধ্যাপক গোলজার হাম রোগ সম্পর্কে বলেন, হাম একটি মারাত্মক বায়ুবাহিত রোগ, যা মিজলস ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট এবং খুব সহজেই একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। ফলে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে গড়ে ১৮ জন পর্যন্ত নতুন মানুষ সংক্রমিত হতে পারে।
তিনি জানান, যেসব শিশু টিকা নেয়নি বা যাদের শরীরে পর্যাপ্ত রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই, বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশু ও ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতিতে আক্রান্তদের মধ্যে এই রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এছাড়া গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও হাম মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
হামের লক্ষণ:
হামের লক্ষণ সম্পর্কে তিনি বলেন, সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে প্রথমে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হওয়া দেখা দেয়। পরে মুখের ভেতর সাদা দাগ এবং শরীরে ফুসকুড়ি (র্যাশ) দেখা দেয়, যা ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। গুরুতর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এনসেফালাইটিস এমনকি অন্ধত্বের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বাড়ছে ঝুঁকি:
ড. গোলজার হোসেন বলেন, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী হামের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে টিকাদানে ঘাটতি। বিশেষ করে কোভিড-১৯ পরবর্তী সময় অনেক শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংঘাত এবং শরণার্থী শিবিরে অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রতিরোধের উপায়:
অধ্যাপক গোলজার জানান, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মত টিকা গ্রহণ। বাংলাদেশে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (MR) টিকার দুই ডোজ দেয়া হয়, যা প্রায় ৯৫ শতাংশ কার্যকর।
চিকিৎসার বিষয়ে তিনি বলেন, হামের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তবে যথাযথ পরিচর্যা ও সহায়ক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর জটিলতা কমানো সম্ভব।
করণীয়:
একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মিসেস মিনারা খাতুন দায়িত্বশীলদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরেন-
১. নির্ধারিত সময় শিশুদের এমআর (MR) টিকা নিশ্চিত করা,
২. টিকা নিয়ে ভুল ধারণা দূর করা,
৩. আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা,
৪. কাশি-হাঁচির সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও
৫. দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হাম আবারও মহামারির রূপ নিতে পারে। সচেতনতা, টিকাদান এবং সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে শিশুদের সুরক্ষা দিতে।
ভাইরাল গবেষণায় বাকৃবির ভূমিকা:
এদিকে, ভাইরাসজনিত রোগ নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বাকৃবির ‘ভাইরাল জিনোমিক্স অ্যান্ড ইনফেকশন ডাইনামিক্স ল্যাবরেটরি’। অধ্যাপক ড. গোলজার হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণাগারে মানুষ ও প্রাণীর বিভিন্ন ভাইরাস কীভাবে সংক্রমণ ঘটায়, কীভাবে ছড়ায় এবং সময়ের সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তিত হয়―এসব নিয়ে আধুনিক জিনোমিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে।
Leave a Reply