অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর চাঁদকে ঘিরে মানব অভিযানে যাচ্ছেন চার নভোচারী, যারা ইতিহাসের নতুন অধ্যায় রচনা করতে যাচ্ছেন। কয়েকদিনের মধ্যে শুরু হতে যাওয়া এই অভিযানে থাকছেন প্রথম নারী, প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি এবং প্রথম কানাডীয় নভোচারী, যা মহাকাশ অনুসন্ধানের ইতিহাসে বৈচিত্র্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
সিএনএন বলছে, মার্কিন মহাকাশ সংস্থা (নাসা) পরিচালিত ‘আর্টেমিস-২’ মিশনের এই দলটি অ্যাপোলো যুগের সীমাবদ্ধতা ভেঙে গভীর মহাকাশ অনুসন্ধানে নতুন প্রতিনিধিত্ব আনছে। অ্যাপোলো যুগে সব নভোচারীই ছিলেন শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান পুরুষ, প্রায় সবাই সামরিক পটভূমির। তবে নতুন এই দলের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অনেকাংশেই সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বহন করে।
দলের সদস্যরা হলেন—রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডীয় মহাকাশ সংস্থার জেরেমি হ্যানসেন। চাঁদের কক্ষপথ ঘিরে এই উচ্চঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা তাদেরকে চাঁদের অদৃশ্য পাশ অতিক্রম করে মানব ইতিহাসে সবচেয়ে দূরে নিয়ে যাবে। প্রায় ১০ দিনের এই অভিযানে তারা প্রায় ৬ লাখ মাইল (৯ লাখ ৬৫ হাজার ৬০০ কিলোমিটার) পথ অতিক্রম করবেন।
এই যাত্রায় নভোচারীরা বিপজ্জনক মাত্রার বিকিরণের মুখোমুখি হবেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। নতুন ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযান ও ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ রকেট—যা তৈরি করতে দুই দশক ও ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে, এগুলোতেও এখনও কিছু ত্রুটি রয়েছে।
নভোচারীরা নিজেরাও এই ঝুঁকির বাস্তবতা স্বীকার করেছেন। জেরেমি হ্যানসেন বলেন, মহাকাশযানের সমস্যা দেখা দিলে বা পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে টিকে থাকার ন্যূনতম উপায় কী হতে পারে, এ নিয়েও তিনি পরিবারকে প্রস্তুত করেছেন। তবুও এই মিশন নিয়ে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা অনেক বড়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার যৌথ এই উদ্যোগ নতুন মহাকাশ প্রতিযোগিতায় চীনের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে।
‘আর্টেমিস-২’ মিশনটি চাঁদে অবতরণ করবে না; এটি একটি পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন, যা ভবিষ্যতের ‘আর্টেমিস-৩’ মিশনের পথ প্রশস্ত করবে। আগামীতে ‘আর্টেমিস-৩’ মিশনে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি মানব বসবাসের পথ তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে অভিযানের ভিত্তি গড়ে তুলবে।
রিড ওয়াইজম্যান
মার্কিন নৌবাহিনীর পরীক্ষামূলক পাইলট রিড ওয়াইজম্যান এই মিশনের কমান্ডার। ২০১৪ সালে তিনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ১৬৫ দিন কাটিয়েছেন। তিনি সঙ্গে নিচ্ছেন একটি খালি নোটকার্ড, যেখানে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা লিখে রাখবেন।
৫০ বছর বয়সী পদকপ্রাপ্ত নৌ-বিমানচালক এই নভোচারী ২০০৯ সালে মহাকাশচারী দলে যোগ দেন। তার স্ত্রী ক্যারল টেইলর ওয়াইজম্যান ২০২০ সালে ক্যানসারে মারা যান। মিশনে যাওয়ার আগে তিনি তার দুই কন্যাকে জীবনের অনিশ্চয়তা সম্পর্কে প্রস্তুত করেছেন।
ভিক্টর গ্লোভার
৪৯ বছর বয়সী ভিক্টর গ্লোভার এই মিশনের পাইলট। তিনি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি হিসেবে গভীর মহাকাশে যাচ্ছেন। ২০২০ সালে তিনি স্পেসএক্সের ক্রু-১ মিশনে অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ছয় মাস কাটিয়েছেন।
তিনি সঙ্গে নিচ্ছেন একটি ধর্মগ্রন্থ এবং পারিবারিক স্মারক। গ্লোভার মনে করেন, প্রযুক্তি যত উন্নত হোক, মহাকাশযানে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তিনি বলেন, উৎক্ষেপণ একই সাথে এক অসাধারণ এবং ভয়ংকর মুহূর্ত হতে পারে, এবং তাই আমি সেই দলের কাছে সত্যিই কৃতজ্ঞ যারা আমাদের প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।
ক্রিস্টিনা কচ
ক্রিস্টিনা কচ এই মিশনের মিশন স্পেশালিস্ট। তিনি প্রথম নারী হিসেবে চাঁদের পথে যাচ্ছেন। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে গিয়ে তিনি ৩২৮ দিন মহাকাশে অবস্থানের রেকর্ড গড়েন।
তিনি সঙ্গে নিচ্ছেন প্রিয়জনদের হাতে লেখা চিঠি। কচ বলেন, এই মিশন তাকে মহাবিশ্বে নিজের অবস্থান নতুনভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অ্যাপোলো নভোচারীদের প্রশংসা করে আসছেন, যারা দল থেকে অবসর নেওয়ার কয়েক দশক পরেও নাসার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পুনরায় মিলিত হতে ভালোবাসতেন। তিনি ২০১৩ সালে নভোচারী দলে যোগ দেন।
জেরেমি হ্যানসেন
কানাডার জেরেমি হ্যানসেন প্রথমবারের মতো মহাকাশে যাচ্ছেন এবং তিনিই প্রথম অ-নাসা নভোচারী হিসেবে চাঁদ মিশনে যুক্ত হচ্ছেন। তিনি সঙ্গে নিচ্ছেন চারটি চাঁদের আকৃতির লকেট, যা তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানদেরও দিয়েছেন।
ফাইটার পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষিত হ্যানসেন ‘কেভনট’ ও ‘অ্যাকোয়ানট’ হিসেবে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন—গুহা ও পানির নিচে বিচ্ছিন্ন পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
Leave a Reply