দেশের বাজারে দফায় দফায় বাড়ছে স্বর্ণের দাম। ইতিহাস ছাপিয়ে ক্রমেই হচ্ছে নতুন রেকর্ড। সবশেষ গত মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) টানা সপ্তমবারের মতো ভরিতে এক লাফে ২ হাজার ৬১৩ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার ৩৩২ টাকা। যা দেশের ইতিহাসে এক ভরি স্বর্ণের সর্বোচ্চ দাম।
সবমিলিয়ে গত ২ বছরের ব্যবধানে দেশে স্বর্ণের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। যদিও স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতার ফলে শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও মূল্যবান এই হলুদ ধাতববস্তুটির দাম বাড়ছে। তবে প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের চেয়ে দেশে স্বর্ণের দাম বেশি।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে স্বর্ণের দাম নিবিড়ভাবে যুক্ত। অর্থাৎ, যুদ্ধ কিংবা অর্থনৈতিক মন্দার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে এর এক ধরনের প্রভাব পড়ে স্বর্ণের দামে। এ কারণেই করোনার পর বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলে অর্থনৈতিক অস্থিরতায় স্বর্ণের দাম আর কমেনি। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় দেশে স্বর্ণের দাম বেশি হওয়ার পেছনে সরকারের নীতির দুর্বলতা, ডলারের বিপরীতে টাকার মানের পতন এবং ব্যবসায়ীদের মুনাফার প্রবণতাকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আপদকালীন সম্পদ হওয়ায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাড়াও ব্যক্তিখাতের বড় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ ক্রয় ও সংরক্ষণ বাড়িয়ে দেন, যা বিশ্বে এই ধাতুর চাহিদা ও প্রাপ্যতার মধ্যে অসামঞ্জস্য পরিস্থিতি তৈরি করে। যদিও এতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের মধ্যে মূল্যবান এই ধাতু কেনার সুযোগ বা প্রবণতা অনেকটাই কমে আসছে বলেও মনে করেন তারা।
শুল্কহারের কারণে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই স্বর্ণের দাম ভিন্ন হয়। মূল্যবান এই ধাতুর দামের ক্ষেত্রে এটি বড় একটি ভূমিকা পালন করে। আবার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও আমদানি ব্যয়ে সামঞ্জস্য রাখতে অনেক দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বর্ণ আমদানিকে উৎসাহিত করে না। যদিও আপদকালীন সম্পদ হিসেবে দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঠিকই স্বর্ণ রিজার্ভ করে।
চোরাচালান রোধের পাশাপাশি বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানিতে উৎসাহিত করতে ২০১৮ সালে দেশে স্বর্ণ নীতিমালা করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়েছিল সরকার। তবে এতে তেমন সাড়া মেলেনি। যদিও ব্যাগেজ বিধিমালা অনুযায়ী, বিদেশ থেকে একজন যাত্রী বছরে মোট ১০০ গ্রাম ওজনের স্বর্ণের গয়না বিনা শুল্কে আনতে পারেন। অন্যদিকে একজন যাত্রী বছরে একবার ১১৭ গ্রাম ওজনের একটিমাত্র স্বর্ণের বার আনতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতি ভরিতে (১১.৬৬ গ্রাম) শুল্ক গুণতে হবে ৫ হাজার টাকা।
কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ রিজার্ভের পরিমাণ ও মার্কিন ডলারের বিপরীতে দেশটির মুদ্রা কতটা শক্তিশালী, এ বিষয়টিও স্বর্ণের দামকে প্রভাবিত করে। ব্যবসায়িক ওয়েবসাইট ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, দুবাই, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও পেরুতে অন্যান্য দেশের তুলনায় সস্তায় পাওয়া যায় স্বর্ণ। তবে বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি বলেই অভিযোগ রয়েছে। এমনকি প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর চেয়েও বাংলাদেশে হলুদ ধাতব বস্তুটির দাম বেশি। যদিও এই খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, এটি সঠিক নয়।
৩১টি স্বর্ণ খননকারী কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত স্বর্ণের বাজার মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল গোল্ড কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় বিশ্ববাজারে প্রতি গ্রাম (১ ভরি= ১১.৬৬ গ্রাম) স্বর্ণের দাম ছিল ১৩৪ দশমিক ৯৬ মার্কিন ডলার বা ১৬ হাজার ৪২৫ টাকা। একই সময়ে প্রতিবেশী ভারতে ২২ ক্যারেটের প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দাম ১৩৪ দশমিক ৭০ ডলার, পাকিস্তানে ১৩৬ দশমিক ৯৪ ডলার, নেপালে ১২৫ দশমিক ০৫ ডলার, মালয়েশিয়ায় ১৩১ দশমিক ১৪ ডলার, সৌদি আরবে ১২৬ দশমিক ৯১ ডলার এবং কাতারে ১২৭ দশমিক ৯৭ ডলার ছিল।
তবে এসব দেশের তুলনায় দেশে স্বর্ণের দাম অনেকটাই বেশি। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২২ ক্যারেটের প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দাম ১৫২ দশমিক ৩৯ ডলার বা ১৮ হাজার ৫৪৭ টাকা। যদিও স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের দাবি, আমদানির সুযোগ না থাকায় অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে স্বর্ণ ক্রয়, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়াসহ নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করেই দেশে স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়।
দেশে স্বর্ণের দাম এত বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বর্তমানে লাগেজের আওতায় এক ভরি স্বর্ণ আনলে সরকারকে যে শুল্ক দিতে হয়, বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি করলে তার চেয়ে অনেক বেশি শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। এছাড়াও দাম বৃদ্ধির পেছনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকেও দায়ী করছেন তারা।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সহ-সভাপতি মাসুদুর রহমান বলেন, ‘সরকার যদি স্বর্ণ আমদানি করত বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি আমাদের স্বর্ণ দিত, তাহলে স্বর্ণের বাজার আরও নিয়ন্ত্রিত থাকত। আমাদের দেশ চলে রিসাইকেল গোল্ডের ওপর, এ কারণেই হয়তো একটু ঊনিশ-বিশ হতে পারে।
Leave a Reply