বৈধ কাগজপত্র নেই। আবার কারও বৈধ কর্ম-অনুমতিপত্র থাকলেও কাজ করছেন অন্য কোম্পানিতে। বিদেশি কর্মী নিয়োগে এমন অনিয়মের চিত্র ধরা পড়েছে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের (জেআইএম) অভিযানে। পেরাক রাজ্যের ইপোহ শহরের বেরচাম এলাকায় শুক্রবার রাতে পরিচালিত ‘অপস মাহির’ অভিযানে বাংলাদেশিসহ ১৭৫ বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে।
অভিযানে তিনটি স্থানে কর্মরত ৩০৫ শ্রমিকের কাগজপত্র ও কর্মস্থল যাচাই করা হয়। আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশই বাংলাদেশের নাগরিক। এছাড়া মিয়ানমার ও ভিয়েতনামের নাগরিকও রয়েছেন।
মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান জানান, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১৯৫৯/৬৩ সালের ইমিগ্রেশন আইনের অধীনে বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। অভিযানে বৈধ নথি বা অনুমতিপত্র ছাড়া কাজ করা এবং এক কোম্পানির নামে ইস্যু করা পারমিট দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করার মতো অনিয়ম পাওয়া গেছে।
অভিযানে বেরচাম এলাকার একটি কাঠের কারখানা, গ্লাভস তৈরির কারখানা ও একটি খাবারের দোকানকেন্দ্রে তল্লাশি চালানো হয়। সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের কাগজপত্র ও কর্মস্থলের তথ্য যাচাইয়ের পর ১৭৫ জনকে আটক করা হয়।
জাকারিয়া শাবান বলেন, বৈধ পারমিট ছাড়া বিদেশি নাগরিকের কাজ করা ইমিগ্রেশন আইনের লঙ্ঘন। একইভাবে কোনো শ্রমিকের পারমিট থাকলেও সেটি যে কোম্পানির নামে দেওয়া হয়েছে, তার বাইরে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করাও অপরাধ।
অভিযানে বিদেশি কর্মীদের বৈধতা যাচাই করতে গিয়ে কয়েকটি ঘটনায় জাল সাময়িক কর্মভ্রমণ পাস (পিএলকেএস) ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নথিগুলোর উৎস এবং এর সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত কি না, তা তদন্ত করছে ইমিগ্রেশন বিভাগ।
জাকারিয়া শাবান জানান, জাল পিএলকেএস কোথা থেকে আসছে, কীভাবে তৈরি হচ্ছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িতএসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো এজেন্ট বা মধ্যস্থতাকারী নেটওয়ার্ক এর সঙ্গে যুক্ত কি না, তাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তদন্তে এসব নথি ব্যবহারকারী নিয়োগকর্তাদের ভূমিকাও গুরুত্ব পাচ্ছে। কোনো নিয়োগকর্তা জেনেশুনে ভুয়া পিএলকেএস ব্যবহার করে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করেছেন কি না, তা প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
ইপোহের ঘটনায় এখন বড় প্রশ্ন জাল পিএলকেএসের উৎস কোথায়? কারা এসব নথি তৈরি করছে এবং কীভাবে তা বিদেশি কর্মী ও নিয়োগকর্তাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে?
ভুয়া পিএলকেএস পাওয়া শ্রমিকরা এসব নথি কার কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন, কোনো এজেন্ট, দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল কি না তাও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিদেশি কর্মী নিয়োগের আগে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নথিপত্র যাচাই করার দায়িত্ব নিয়োগকর্তারও রয়েছে। ফলে জাল নথি ব্যবহার করে কর্মী নিয়োগের ঘটনায় শুধু সরবরাহকারী এজেন্ট নয়, সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তার ভূমিকার বিষয়টিও সামনে আসছে।
ইমিগ্রেশনের তদন্তে যদি নথি সরবরাহকারী, এজেন্ট ও নিয়োগকর্তাদের মধ্যে পরিকল্পিত যোগাযোগের প্রমাণ মেলে, তাহলে বিদেশি কর্মী নিয়োগের আড়ালে থাকা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান মিলতে পারে।
ইপোহের অভিযানে আটক ১৭৫ বিদেশির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশি হওয়ায় মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে বৈধ পারমিট থাকা সত্ত্বেও অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নিয়োগদাতা বা কর্মস্থল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন না থাকলে বৈধ নথি থাকার পরও ইমিগ্রেশন আইনের আওতায় পড়তে পারেন সংশ্লিষ্ট শ্রমিক।
তবে এ ধরনের ঘটনায় শুধু শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার মূল কারণ দূর হবে না। এক কোম্পানির নামে পারমিট ইস্যু হওয়ার পর শ্রমিক কীভাবে অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাজ করছেন এর পেছনে নিয়োগকর্তা, এজেন্ট বা মধ্যস্থতাকারীদের কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
বিদেশি কর্মীদের কাছ থেকে কর্মস্থল পরিবর্তনের বিনিময়ে অর্থ নেওয়া হচ্ছে কি না, অবৈধভাবে শ্রমিক সরবরাহের কোনো নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না তদন্তে এসব বিষয় উঠে এলে পুরো ব্যবস্থার নেপথ্যের চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
ফলে ‘অপস মাহির’ এখন শুধু বিদেশি শ্রমিক আটকের অভিযান নয়; বৈধ পারমিটের অপব্যবহার, কর্মস্থল পরিবর্তন এবং জাল পিএলকেএসের উৎস অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিদেশি কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থার নেপথ্যে থাকা সম্ভাব্য চক্রের দিকেও নজর দিয়েছে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ।
Leave a Reply