যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে ফিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে ১১টি শক্তিশালী বরফভাঙা জাহাজ (পোলার আইসব্রেকার) তৈরি করতে প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি করা হয়েছে।
এই পরিকল্পনার শুরু হয়েছিল আগস্টের এক রাতে। তখন ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার স্টাব হেলসিঙ্কির বাইরে নিজের গ্রীষ্মকালীন বাসভবনে ছিলেন। হঠাৎ তিনি ফোন পান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছ থেকে। ফোনে ট্রাম্পের আগ্রহের মূল বিষয় ছিল আর্কটিক অঞ্চলে চলাচলের জন্য বিশেষ ধরনের আইসব্রেকার জাহাজ।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বহু বছর ধরেই এসব জাহাজ ট্রাম্পের আগ্রহের বিষয় ছিল। আর্কটিক অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলতে থাকায় নতুন নৌপথ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে থাকা মূল্যবান খনিজ সম্পদ নিয়েও আগ্রহ বাড়ছে বিভিন্ন দেশের।
ট্রাম্প মনে করেন, শক্তিশালী আইসব্রেকার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতার প্রতীক হতে পারে।
বিশেষ করে রাশিয়ার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কম সংখ্যক আইসব্রেকার থাকায় তিনি বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন অসন্তুষ্ট ছিলেন। চুক্তি ঘোষণার সময় ট্রাম্প ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট স্টাবের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, বিশ্বের অনেক দেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি আইসব্রেকার রয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের সেরা আইসব্রেকার তৈরি ও সংগ্রহ করতে চায়।
যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডের আগের হিসাব অনুযায়ী, তাদের প্রয়োজন ছিল চার থেকে পাঁচটি ভারী পোলার আইসব্রেকার। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ১১টি জাহাজ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রচলিত নিয়মও শিথিল করতে হয়েছে। সাধারণত জাতীয় নিরাপত্তার কাজে ব্যবহৃত জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই নির্মাণ করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু প্রথম চারটি আইসব্রেকার ফিনল্যান্ডে তৈরি হবে। এ ছাড়া প্রকল্পের জন্য কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। সাধারণত জরুরি বা বিশেষ পরিস্থিতিতে এমন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কোস্ট গার্ডের কমান্ড্যান্ট অ্যাডমিরাল কেভিন ই. লানডে বলেন, ১১টি জাহাজের সংখ্যা সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত থেকেই এসেছে। তিনি বলেন, এটি ছিল প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত সংখ্যা এবং তারই সিদ্ধান্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ১১টি জাহাজ তৈরি করলেই খরচ শেষ হবে না। এসব জাহাজের জন্য নতুন অবকাঠামো তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালনা এবং পর্যাপ্ত কর্মী নিয়োগেও বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। কোস্ট গার্ডের নথি অনুযায়ী, পুরো প্রকল্প পরিচালনা করতে ভবিষ্যতে আরো হাজার হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই অতিরিক্ত খরচ বহনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোনো স্পষ্ট অর্থায়ন পরিকল্পনা এখনো দেখানো হয়নি। প্রকল্পের প্রাথমিক অর্থের একটি বড় অংশ আসবে সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য বরাদ্দ অর্থ থেকে। রিপাবলিকানদের প্রস্তাবিত ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’-এর মাধ্যমে প্রশাসন এই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ পায়।
হোয়াইট হাউস বলছে, আর্কটিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার জন্য নতুন আইসব্রেকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হোয়াইট হাউসের বাজেট দপ্তরের মুখপাত্র অ্যালি ম্যাকক্যান্ডলেস বলেন, আগের সরকারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ ও আর্কটিক সক্ষমতা দুর্বল হতে দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন আবার যুক্তরাষ্ট্রকে বড় আর্কটিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ট্রাম্পও বিভিন্ন সময় এই প্রকল্পের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে কোস্ট গার্ড আইসব্রেকার চেয়ে আসছিল, কিন্তু কোনো প্রেসিডেন্ট তাদের সেই প্রয়োজন পূরণ করেননি।
ফিনল্যান্ডের আইসব্রেকারের প্রতি ট্রাম্পের আগ্রহ নতুন নয়। ১৯৯২ সালে রাজনীতিতে আসার আগেই তিনি প্রথম এসব জাহাজ সম্পর্কে আগ্রহ দেখান। তখন নিউইয়র্কের ব্যবসায়ী হিসেবে ট্রাম্প হেলসিঙ্কি গিয়েছিলেন একটি জাহাজকে ভাসমান ক্যাসিনোতে রূপান্তরের সম্ভাবনা দেখতে। পরে খরচ বেশি হওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাতিল করেন। তবে ওই সফরে তিনি ফিনল্যান্ডের আইসব্রেকার দেখেন এবং জাহাজ নির্মাণ খাতে দেশটির দক্ষতা সম্পর্কে জানতে পারেন। তখন তাকে জানানো হয়েছিল, বিশ্বের বিপুল সংখ্যক আইসব্রেকার ফিনল্যান্ড তৈরি করেছে। পরে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও ট্রাম্প এসব জাহাজের সক্ষমতার প্রশংসা করেন।
ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর প্রকল্পটি নতুন গতি পায়। ২০২৫ সালের মার্চে ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের একটি গলফ কোর্সে ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার স্টাবের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। স্টাব তাকে একটি আইসব্রেকারের ছবি উপহার দেন। ফিনল্যান্ডের জন্যও এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং ন্যাটোর সহযোগিতা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এটি ভূমিকা রাখবে। এরপর ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল সংখ্যক আইসব্রেকার তৈরি ও কেনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শুরুতে কংগ্রেস এই প্রকল্পের জন্য ৩৫০ কোটি ডলার অনুমোদন করেছিল। কর্মকর্তারা দুটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছিলেন। একটি ছিল পাঁচটি জাহাজ তৈরির, অন্যটি ছিল ছয়টি জাহাজ তৈরির। শেষ পর্যন্ত প্রশাসন দুটি পরিকল্পনাই বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে পাঁচটির পরিবর্তে জাহাজের সংখ্যা বেড়ে ১১টিতে দাঁড়ায়। হোয়াইট হাউসের বাজেট পরিচালক রাসেল টি. ভট বলেন, নতুন অর্থ বরাদ্দের কারণে দুটি পরিকল্পনাই একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে।
আর্কটিক বিশেষজ্ঞদের বেশির ভাগই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরো আইসব্রেকার দরকার। তবে ঠিক কতটি দরকার, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ট্রাম্প প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রের আইসব্রেকারের সংখ্যা রাশিয়ার সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, রাশিয়ার কাছে অনেক বেশি আইসব্রেকার রয়েছে। কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাশিয়ার কাছে ৫৬টি পোলার আইসব্রেকার রয়েছে। চীনের রয়েছে পাঁচটি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধু সংখ্যার তুলনা করলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলে ২০ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করেন এবং দেশটি ওই অঞ্চলের নৌপথের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঞ্চলের আর্কটিক এলাকায় জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কোস্ট গার্ডের ২০২৩ সালের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, চার থেকে পাঁচটি ভারী আইসব্রেকারই তাদের কার্যক্রমের জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন চায়, তার বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রথম কয়েকটি জাহাজ সরবরাহ করা হোক। দ্রুত কাজ শুরু করতে কোস্ট গার্ড প্রচলিত দরপত্র প্রক্রিয়া এড়িয়ে ‘জনস্বার্থ’ ছাড়ের বিধান ব্যবহার করেছে। সমালোচকদের মতে, এত বড় প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া না থাকায় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে প্রশাসনের দাবি, আর্কটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রভাব বাড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সব মিলিয়ে ১১টি আইসব্রেকার তৈরির এই প্রকল্প কয়েক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডের অন্যতম বড় ও ব্যয়বহুল উদ্যোগ হতে যাচ্ছে।
Leave a Reply