গত একশো বছরের কিছু বেশি সময় ধরে বিশ্বব্যাপী মানুষের বিনোদনের অন্যতম প্রধান উৎস চলচ্চিত্র। প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার চলচ্চিত্র নির্মিত ও প্রদর্শিত হয়, যেগুলো থেকে আয় হয় বিলিয়ন ডলার। যেমন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে মাইকেল জ্যাকসনের বায়োপিক। ইতিমধ্যে এটি বিলিয়নের ঘর অতিক্রম করেছে। সত্যি বলতে একটি ‘সফল সিনেমা’ তৈরির পেছনে থাকে প্রচুর অর্থ, শ্রম, মেধা ও সময়। পৃথিবীর এমন কিছু দেশ রয়েছে যাদের অর্থনীতির অন্যতম উৎসই চলচ্চিত্র। বক্স অফিস আয়ের ভিত্তিতে বিশ্বের বৃহত্তম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির তালিকা নিয়ে সাজানো প্রতিবেদন সাজিয়েছেন আহমেদ তেপান্তর-
হলিউড: যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যৌথভাবে হলিউড নামে পরিচিত। শিল্প হিসেবে হলিউডের বয়স প্রায় একশো বছরের বেশি। আয়ের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিও এটিই। ২০২২ সালে হলিউড থেকে মুনাফার পরিমাণ ছিল ১১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। হলিউডে আয়ের ৪৮% মুনাফা আসে টিকিট বিক্রি থেকে।
চাইনিজ ফিল্ম ইন্ডাস্টি: হলিউডের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চলচ্চিত্র নির্মাণ শিল্প হচ্ছে চাইনিজ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। গত এক দশকে, চীনের চলচ্চিত্র ব্যবসা বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৫%। গত ২ বছরে চীনে তৈরি হয়েছে ১,৬১২টিরও বেশি সিনেমা হল। আর শুধু ২০২২ সালেই এ ইন্ডাস্ট্রি থেকে মুনাফা হয়েছে ৬.৬ বিলিয়ন ডলার। এক্ষেত্রে অবশ্য বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে সৌদি আরবের।

যুক্তরাজ্য: তালিকায় তৃতীয় স্থানে যুক্তরাজ্য। বিশ্ব চলচ্চিত্র আয়ের ১৭ ভাগ দখল করে আছে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় প্রডিউসার কোম্পানি ‘পিনউড স্টুডিওস’। ২০২২ সালে এ ইন্ডাস্ট্রির আয় ৬.৫ বিলিয়ন ডলার। সর্বকালের সেরা আটটি সর্বোচ্চ আয়ের চলচ্চিত্রও তাদেরই।
জাপান:- এশিয়ার বৃহত্তম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি জাপানের, যার আয় বছরে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে তারা। বিশ্ব চলচ্চিত্রের ৫ ভাগ আয় আসে জাপান থেকে। দেশটিতে বছরে ৬০০’র বেশি সিনেমা নির্মিত হয়।
ভারত:- ভারত হলিউডের পর বিশ্বের সর্বাধিক সিনেমা নির্মাণকারী দেশ। ১০৪ বছর ধরে সিনেমা তৈরি করছে তারা। বছরে মুক্তি পায় প্রায় ২ হাজার সিনেমা। সিনেমা থেকে তাদের বাৎসরিক আয়ের পরিমাণ ১.৯ বিলিয়ন ডলার।
দক্ষিণ কোরিয়া:- দক্ষিণ কোরিয়া এমন একটি বিরল দেশ, যেখানে আমদানি করা সিনেমার চেয়ে দেশীয় চলচ্চিত্র দেখতেই বেশি পছন্দ করে দর্শক। বিশ্বের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন সিনেমা হলগুলোও সেখানে। কোরিয়ান সরকার এটিকে ভবিষ্যতের অর্থনীতি বলে মনে করে। বিশ্বের সপ্তম ধনী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তাদের। বছরে আয় ১.৫ বিলিয়ন ডলার।

রাশিয়া:- এক সময় সোভিয়েত রাশিয়া ছিল চলচ্চিত্রের অন্যতম পীঠস্থান। মস্কো ফিল্ম ফ্যাস্টিভ্যাল ছিলো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অ্যাওয়ার্ড ফাংশন। পৃথিবীর তাবড় তাবড় পরিচালক আর অভিনয় শিল্পীদের আনাগোনায় মুখর ছিল মস্কো। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কালচারাল অ্যাটাচি ছিলো। নব্বই দশকে সোস্যালিজমের অবসান হলে বাকিরা আলাদা হয়ে যায় রাশিয়া থেকে। শতবছরের পুরানো এই ইন্ডাস্ট্রি নব্বই দশেকে তার জৌলুস হারাতে থাকে। বিভিন্ন দেশে কালচারাল অ্যাটাচিগুলো একের পর এক বন্ধ হতে থাকে। তারপরও তাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আয়ের দিক থেকে খুব বেশি পিছিয়ে নেই। ২০২২ সালের পরিসংখ্যান বলছে দেশটি ১.১ বিলিয়ন ডলারের। দেশটি নতুন করে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে।
সৌদি আরব:- আর বিশ্বের মধ্যে এক সময়ের সবচেয়ে কট্টরপন্থী দেশ হিসেবে পরিচিত সৌদি আরব সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যাপক বিনিয়োগ নিয়ে এখন নতুন শক্তির জানান দিচ্ছে। ২০৩০ সালকে সামনে রেখে দেশটি চায়নাকে হাতে রেখে এই বিনিয়োগ করছে। বিনিয়োগের পরিমান ৩.৫ বিলিয়ন ডলার। লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ সালকে সামনে রেখে এক হাজার সিনেপ্লেক্স গড়তে ইতিমধ্যে সাড়ে ছয়শ’ সিনেপ্লেক্স কমপ্লিট করেছে। সব ঠিক থাকলে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে দেশটি এশিয়ার প্রধান হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।
এছাড়া ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকোর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে বিশ্ব চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম শক্তি হিসেবে ধরা হয়। ধারণা করা হয়, বিশ্বব্যাপী এ শিল্প থেকে আয় বছরে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশের সিনেমাও যাচ্ছে দেশের বাইরে এবং অবদান রাখছে বিশ্ববাজারে। একদিন হয়তো আমরাও সেরা ইন্ডাস্ট্রির তালিকায় থাকবো, সেই আশা তো করতেই পারি।
Leave a Reply