সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

৫৪৭ দিনে ৪২৫ নিয়োগ দিয়ে ‘রেকর্ড গড়লেন’ চবির বিদায়ী ভিসি

অনলাইন ডেস্ক
  • আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৮ বার

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) স্বল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক নিয়োগ দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন সদ্য বিদায়ী উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার। মাত্র ৫৪৭ দিনের দায়িত্বকালেই ৪২৫ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে এক ধরনের রেকর্ড গড়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ বছরের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত বড় নিয়োগের নজির নেই।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে চলতি বছরের ১৬ মার্চ পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন ইয়াহইয়া আখতার। পাঁচটি সিন্ডিকেট বৈঠকের মাধ্যমে এসব নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়, যেখানে প্রতিটি বৈঠকেই গড়ে ৮৫ জনের নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে দ্রুত নিয়োগ শেষ করতে গিয়ে প্রচলিত রীতিও ভাঙেন তিনি। এমনকি শুক্রবার ও জাতীয় ছুটির দিনেও সিন্ডিকেট বৈঠক ডাকার ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
তবে এই নিয়োগ কার্যক্রম শুরু থেকেই বিতর্কে জড়ায়। অভিযোগ ওঠে, পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে নিয়োগ বোর্ড গঠন করে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অনেককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উপ-উপাচার্যের মেয়ে, অন্য এক উপ-উপাচার্যের সহগবেষক, রেজিস্ট্রারের ভাই, বিভিন্ন হল প্রভোস্টের পরিবারের সদস্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সমালোচনা তীব্র হয়। এমনকি কোনো কোনো বিভাগ শিক্ষক প্রয়োজন নেই বলে সুপারিশ করার পরও একাধিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
নীতিমালা পরিবর্তনের অভিযোগও উঠে আসে। আগে যেখানে শিক্ষক নিয়োগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.৫০ থাকতে হতো, তা কমিয়ে ৩.৪০ করা হয়। এতে তুলনামূলক কম ফলাফলধারী প্রার্থীরাও আবেদন ও নিয়োগের সুযোগ পান। আবার ক্রিমিনোলজি বিভাগে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন ওঠে, কারণ বিভাগটির পক্ষ থেকেই এমন বিষয়ে শিক্ষক প্রয়োজন নেই বলে জানানো হয়েছিল।
নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) একাধিকবার নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার নির্দেশনা দেয়। পাশাপাশি এন্টি করাপশন কমিশনও বিষয়টি তদন্তে নামে। সংস্থাটির চট্টগ্রাম-১ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম জানান, তারা তদন্ত শেষে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।
যদিও শুরুতে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে নতুন কিছু পদ্ধতি চালু করেছিলেন উপাচার্য। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি প্রেজেন্টেশনকে মূল্যায়নের অংশ করা হয় এবং তদবির কমাতে একই দিনে সব ধাপ সম্পন্ন করা হতো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্যোগের স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
এদিকে সরকার পরিবর্তনের পর গত ১৬ মার্চ নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ আল ফোরকান। তিনি জানিয়েছেন, পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময়ে হওয়া নিয়োগগুলোর প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা হবে এবং কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ মিললে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের জবাবে সাবেক উপাচার্য ইয়াহইয়া আখতার দাবি করেছেন, সব নিয়োগই যোগ্যতার ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে এবং এতে কোনো দলীয়করণ বা স্বজনপ্রীতি ছিল না। তাঁর ভাষ্য, নতুন দুটি হল চালু হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রয়োজন বেড়ে যাওয়ায় নিয়োগও বেশি দিতে হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ৪২৫ জনের মধ্যে ১২২ জন শিক্ষক, ২২ জন কর্মকর্তা এবং ২৮১ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধ্যে শিক্ষক নিয়োগ প্রায় ২৯ শতাংশ, কর্মকর্তা ৫ শতাংশ এবং কর্মচারী ৬৬ শতাংশ। উল্লেখযোগ্যভাবে, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশই নোয়াখালীর বাসিন্দা, যা নিয়োগে আঞ্চলিক প্রভাবের অভিযোগকে আরও উসকে দিয়েছে।
এদিকে সদ্য বিদায়ী উপাচার্যের সময়ে চবির ল্যাবরেটরি স্কুলে আব্দুল কাইয়ুম নামে একজনকে নতুন অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি দুর্নীতি মামলায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে
সৌদি আরবের জেদ্দায় বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অভিভাবক কমিটির তৎকালীন নির্বাহী সদস্য মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল জানান, ২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর সৌদি আরবের জেদ্দায় বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে কর্মরত অবস্থায় প্রায় ১৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কাইয়ুমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবুও রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলামের ভাই হওয়ার সুবাদে নিয়োগ পেয়েছেন।
অধ্যক্ষ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, সে সময় আমি সৌদি ওই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলাম। এ জন্য পুলিশ আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে। নির্দোষ থাকায় আমাকে তারা গ্রেপ্তার করেনি। আমার বিরুদ্ধে যা বলা হচ্ছে তা অপপ্রচার।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের (ভারপ্রাপ্ত) রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলাম বলেন, আমার ভাই যেদিন আবেদন করেছিল, আমি সেদিনই বোর্ডের সভাপতির কাছে পদত্যাগ চাই। নিয়োগের দিন আমি উপস্থিত ছিলাম না।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, এত স্বল্প সময়ে এত বিপুল নিয়োগ একদিকে যেমন প্রশাসনিক সক্রিয়তার নজির, অন্যদিকে অভিযোগ-সমালোচনার কারণে তা এখন গভীর তদন্তের মুখে। নতুন প্রশাসনের পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কতটা বৈধতা পায় এবং বিতর্কের অবসান ঘটে কি না।

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories