শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলন ও অনশনের মুখে সরিয়ে দেয়ার এক বছর পার হওয়ার আগেই খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ভাইস-চ্যান্সেলর (ভিসি) হিসেবে পুনরায় নিয়োগ পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাছুদ। রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাকে এই পদে নিয়োগ দেয়া হয়
এর আগে সোমবার (১৬ মার্চ) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিয়োগের ঘোষণা দেন। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী চার বছর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাছুদ বলেন, বর্তমান সরকারের উচ্চশিক্ষা উন্নয়ন ও গবেষণা বান্ধব নীতিমালার আলোকে কুয়েটকে একটি আধুনিক, গবেষণা নির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে আমি আন্তরিকভাবে কাজ করে যাব। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, গবেষণার বিস্তার এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক একটি ইতিবাচক একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা কামনা করছি। দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে কুয়েট যেন আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, সে লক্ষ্যেই আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করবো।
এর আগে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাছুদ কুয়েটের ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, হল প্রভোস্ট, সিআরটিএস-এর চেয়ারম্যান, বিভিন্ন মেয়াদে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলন (ICMIEE)-এর কনফারেন্স সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তার দেড় শতাধিক গবেষণা প্রবন্ধ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য জার্নাল ও কনফারেন্স প্রসিডিংসে প্রকাশিত হয়েছে এবং তার একাধিক বই ও বুক চ্যাপ্টার রয়েছে। শিক্ষা ও গবেষণাসংক্রান্ত কাজে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন।
তিনি ১৯৯৮ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি), খুলনা থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং (মেকানিক্যাল) ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছরে তিনি প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক হয়ে ২০১১ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। বর্তমানে তিনি অধ্যাপক (গ্রেড–১) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
তিনি জাপানের নাগোয়া ইউনিভার্সিটি থেকে এমএসসি (২০০৩) ও পিএইচডি (২০০৬) ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের University of Texas at El Paso থেকে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করেন। তিনি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় শতাধিক আহত হন। পরদিন প্রশাসনিক ভবনসহ সব একাডেমিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। ওইদিন দুপুরে সিন্ডিকেট সভায় কুয়েটে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
এর এক সপ্তাহ পর ২৫ ফেব্রুয়ারি সব আবাসিক হল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর আবাসিক হল খুলে দেয়ার দাবিতে ১৩ এপ্রিল বিকেল থেকে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন।
১৪ এপ্রিল রাতে সিন্ডিকেট সভায় সংঘর্ষে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৭ শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ ঘটনার জেরে গত ১৯ এপ্রিল উপাচার্যের পদত্যাগের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়া হয়। বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে উপাচার্য ড. মুহাম্মদ মাছুদের পদত্যাগ না করায় ২০ এপ্রিল থেকে অনশন চালানোর ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।
উপাচার্য মুহাম্মদ মাছুদের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আমরণ অনশনরত শিক্ষার্থীরা প্রায় ৫৮ ঘণ্টা পর তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন। ২৩ এপ্রিল দিনগত রাত ১টার দিকে তাদের জুস পান করিয়ে অনশন ভাঙান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য (ইউজিসি) অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান।
পরদিন ২৪ এপ্রিল উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাছুদ ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে পদত্যাগের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
একই দিন (২৪ এপ্রিল) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বৃত্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদ হেলালীকে কুয়েট ভিসি পদে নিয়োগ দেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।
এর আগে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাত্র এক সপ্তাহ পর ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট কুয়েটের তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক ড. মিহির রঞ্জন হালদার ও প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. সোবহান মিয়াকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। তখন অধ্যাপক মুহাম্মদ মাছুদকে ভিসির অস্থায়ী দায়িত্ব দেয়া হয়। পরে ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে চার বছরের জন্য ভিসি হিসেবে পূর্ণ মেয়াদে নিয়োগ দেয়া হয়।
Leave a Reply