সেবা নিতে গিয়ে একের পর এক টেবিলে ঘুরতে হয়। নিয়ম মেনে আবেদন, ফি জমা, ব্যাংকে টাকা পরিশোধ, সবকিছু শেষ করার পরও মেলে না কাঙ্ক্ষিত কাজ। উল্টো শুরু হয় অপেক্ষা, হয়রানি আর ঘুষ দাবির অভিযোগ। গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর বিরুদ্ধে এমনই এক ভয়াবহ দুর্নীতি ও ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ উঠেছে, গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন, পুরাতন খুঁটি স্থানান্তর, ট্রান্সফরমার পরিবর্তনসহ নানা কাজের দায়িত্বে থাকা কিছু ঠিকাদার, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালচক্র মিলে গড়ে তুলেছে এক অঘোষিত ঘুষ বাণিজ্য। সরকারি নিয়মে কাজের অনুমোদন ও অর্থ জমা দেয়ার পরও গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা যায়, গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর জোনাল অফিসের আওতাধীন সারদাগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা তারিকুল ইসলাম একটি বৈদ্যুতিক লাইন স্থানান্তরের জন্য আবেদন করেন। আবেদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর সমীক্ষা ফি ও আবেদন ফি’র ভ্যাট বাবদ ১ হাজার ৭২৫ টাকা কাশিমপুর জোনাল অফিসের ক্যাশিয়ার এ.কে.এম হাবিবুর রহমানের কাছে রশিদের মাধ্যমে জমা দেন তিনি।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে ডিজিএমের কাছে দারস্থের পর পাঠানো হয় পরিদর্শক। তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয় ৮ হাজার ৬২৪ টাকার বাজেট। পরে ২০২৫ সালের ৩ মার্চ পূবালী ব্যাংকের কাশিমপুর শাখায় গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর অনুকূলে সেই টাকা জমাও দেন ভুক্তভোগী।
কিন্তু টাকা জমা দিয়েও মেলেনি সেবা।
অভিযোগ রয়েছে, ২৫/৪৫২ নম্বর লটের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার শহীদুল ইসলাম শহীদ কাজ শুরু করার আগে ভুক্তভোগীর কাছে অতিরিক্ত ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। ওই টাকা অগ্রিম না দিলে কাজ করা হবে না বলেও জানানো হয়।
ভুক্তভোগীর দাবি, কাজটি ছিল একটি খুঁটি থেকে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পাশের আরেকটি ব্যবহৃত খুঁটিতে স্থানান্তর এবং একটি ট্রান্সফরমার পরিবর্তনের। অথচ সরকারি ফি জমা দেয়ার পরও একই কাজের জন্য আরও বড় অঙ্কের ঘুষ দাবি করা হয়।
ঘুষ দাবী করা একটি কল রেকর্ডে ঠিকাদার শহীদকে বলতে শোনা যায়, ২০/২২ হাজার টাকা লাগবে। ব্যাংকে কি জমা দিয়েছেন। সেটা অফিসের ব্যপার। আমার কাজের জন্য আমাকে ২০ হাজার টাকা দিতে হবে। এখন ৩ হাজার টাকা দেন বাকীগুলো দুই একদিনের মধ্যে দিবেন। তারপর কাজ শুরু করবো। যা এক সপ্তাহের মধ্যেই কাজ শেষ করে দিবো।
এসময় তিনি আরো বলেন, এই ২০ হাজার টাকা আমি একা খাবো না। ট্রান্সফরমারের ওখানে জমা দিলে সিরিয়াল দিবে। এই টাকা আগে না দিলে কাজ হবে না।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী তারিকুল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জিএম বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আমজাদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে দেশে মৃত্যু সনদ তুলতেও ঘুষ লাগে, সেখানে পল্লী বিদ্যুতের ঘুষ বাণিজ্য অস্বাভাবিক কিছু নয়।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, নিয়ম মেনে টাকা জমা দেয়ার পরও কেন একজন গ্রাহককে ঘুষ দিতে বাধ্য হতে হবে? সরকারি সেবা পেতে কেন বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে? পল্লী বিদ্যুতের এই অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানির শেষ কোথায়?
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ঠিকাদার শহীদুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, একদিন আসেন চা খেতে খেতে সামনে সামনে কথা বলি, বলেই লাইন কেটে দেন।
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. ইউসুফ আলী বলেন, গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা দাবি বা ঘুষ গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগটি তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
Leave a Reply