বাংলাদেশে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে চীন নিজের প্রভাব আরও বিস্তৃত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ২০২৪ সালে নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ শেখ হাসিনার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকেই বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বেড়েছে, আর আসন্ন নির্বাচনের পর তা আরও গভীর হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে, রাজনীতিক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, আকার ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ভারতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার তুলনায় অনেকটাই শীতল সম্পর্ক বজায় রেখেছে। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। বর্তমানে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, আর শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় নির্বাসনে ভারতের দিল্লিতে অবস্থান করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে চীন ঢাকায় বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তের কাছাকাছি একটি ড্রোন কারখানা নির্মাণে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বেইজিং। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশি রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা যাচ্ছে। চীনা দূতাবাসের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী, বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্পসহ বিভিন্ন সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এসব বৈঠকে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ মনে করে, শেখ হাসিনার অপরাধের সঙ্গে ভারত জড়িত ছিল। যে দেশ একজন সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দিয়ে আমাদের দেশকে অস্থিতিশীল করতে দিচ্ছে, সেই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বা ব্যবসা করা মানুষ মেনে নেবে না।
তবে তারেক রহমান নিজে তুলনামূলক সংযত বক্তব্য দিয়েছেন। গত সপ্তাহে রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে চাই, তবে অবশ্যই সেটা হবে আমার জনগণ ও দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক আরও অবনতি হয়েছে, বিশেষ করে ক্রিকেটকে ঘিরে। বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনার পর হিন্দু সংগঠনগুলোর চাপের মুখে জনপ্রিয় বাংলাদেশি বোলার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলের একটি দল থেকে বাদ দেয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ মার্চ থেকে মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য আইপিএলের সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারি–মার্চে অনুষ্ঠেয় পুরুষদের ক্রিকেট বিশ্বকাপে নিজেদের ম্যাচ ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেয়ার অনুরোধ জানায়। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করায় বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্ট থেকেই সরে আসে।
এদিকে, উভয় দেশই একে অপরের নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রকাশ্য কূটনৈতিক যোগাযোগও বিরল হয়ে উঠেছে। তবে গত ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় ভারতের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানান।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার একাধিকবার শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও ভারত তাতে সাড়া দেয়নি। বিশেষ করে গত বছরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গণ-অভ্যুত্থান দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের নির্দেশ দেয়ার দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিলে এই দাবি আরও জোরালো হয়। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দমন অভিযানে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত এবং হাজারো মানুষ আহত হয়। যদিও শেখ হাসিনা এসব হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ধীরে ধীরে প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন
নির্বাচনের আগে বিএনপি ও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামী একে অপরকে বিদেশি শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। জামায়াতের দাবি, বিএনপি ভারতের খুব কাছাকাছি, আর বিএনপি অভিযোগ করছে, জামায়াতের সঙ্গে ভারতের পুরোনো শত্রু পাকিস্তানের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।
সম্প্রতি এক নির্বাচনি সমাবেশে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি ও পাকিস্তানের সামরিক সদর দপ্তর রাওয়ালপিন্ডির প্রতি ইঙ্গিত করে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘দিল্লি নয় পিণ্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ।
ভারতের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে যে দলই সরকারই গঠন করুক, তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে নয়াদিল্লিকে। তবে এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রয়টার্সের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
চীন গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে চীনা পণ্যের আমদানি মোট আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশ। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর থেকে চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের আদানি গ্রুপসহ একাধিক ভারতীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ করলেও, কোম্পানিটির পতনের পর নতুন কোনো চুক্তি হয়নি।
নয়াদিল্লির থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রোগ্রেসের সিনিয়র ফেলো কনস্টান্টিনো জাভিয়ার বলেন, ‘ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের সংকট থেকে সুবিধা নিয়ে চীন প্রকাশ্যে ও আড়ালে ধীরে ধীরে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমে যাওয়া এবং ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে চীন নিজেকে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ চীন বেশি অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয়। এছাড়া হিন্দু-অধ্যুষিত ভারতের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ইস্যুতে অস্থিরতার সময় বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে না।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিন বলেন, ‘ঢাকা ও নয়াদিল্লি যদি সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারের জন্য বেইজিংয়ের সঙ্গে পূর্ণ গতিতে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা আরও বাড়বে।’ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হওয়া মানেই ভারতের গুরুত্ব কমে যাওয়া নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘বাংলাদেশের চীন ও ভারত—দু’দেশকেই প্রয়োজন। বিষয়টি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হলেও কোনো সরকারই ভারতের গুরুত্ব উপেক্ষা করার মতো বোকামি করবে না।
ভৌগোলিকভাবে তিন দিক থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে ভারত, আর বাকি একদিকে অর্থাৎ দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। বাণিজ্য, ট্রানজিট ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে নয়াদিল্লির জন্যও স্থলসীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ঢাকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক জরুরি। শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতবিরোধী বিদ্রোহীদের দমনেও সহায়তা করেছিল।
সরকারি তথ্যমতে, রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। বাংলাদেশই ভারতের প্রধান রপ্তানির জায়গা। আদানি গ্রুপ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহও বাড়িয়েছে, যদিও শেখ হাসিনার আমলে নির্ধারিত উচ্চ শুল্ক নিয়ে বেশ সমালোচনা করেছে বর্তমান সরকার।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভারত সহায়তা করলেও, দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ ছিল বাংলাদেশের মানুষের। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে পানি বণ্টন বিরোধ, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং অনেক বাংলাদেশির চোখে অজনপ্রিয় শেখ হাসিনা শাসনকে ভারতের বৈধতা দেয়া।
জামায়াতপন্থি ও জেন জি-সমর্থিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) নেতারাও ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। দলটির প্রধান নাহিদ ইসলাম রয়টার্সকে বলেন, ‘এটা শুধু নির্বাচনি বক্তব্য নয়। তরুণদের মধ্যে নয়াদিল্লির আধিপত্যবোধ গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে, আর এটি এই নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু।
Leave a Reply