এবারও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়েনি। আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্বাস্থ্যের প্রকল্পে টাকা বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার স্বাস্থ্যের অগ্রাধিকারের কথা মুখে বললেও বাস্তবতা ভিন্ন। উন্নয়ন বাজেটে এ খাত প্রত্যাশিত মনোযোগ পায়নি।
রোববার (১৮ মে) ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা চূড়ান্ত করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। স্বাস্থ্য খাতের ৩৫টি প্রকল্পে আগামী অর্থবছরের বরাদ্দ থাকছে ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা যা এডিপির মোট বরাদ্দের ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। চলতি এডিপিতে এ খাতে বরাদ্দ ২০ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা। বরাদ্দ কমেছে সোয়া ১২ শতাংশ। উন্নয়ন বাজেটে এ খাত প্রত্যাশিত মনোযোগ পাচ্ছে না। স্বাস্থ্য খাত অনেকটা অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। আগামী বাজেটেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার ইঙ্গিত নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পেতে একজন বাংলাদেশির বছরে ৮৮ ডলার খরচ করা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে চিকিৎসা খাতে মাথাপিছু খরচ হয় ৫৮ ডলার, যার বড় অংশই নাগরিকেরা নিজেরা সংস্থান করেন।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ কম হওয়ায় মানুষের ব্যক্তিগত ব্যয় বেশি হয়। ২০২২ সালে দেশের ১৭ শতাংশ পরিবার স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। মূলত চিকিৎসা বাবদ মানুষের পকেট ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানের পর বাংলাদেশের মানুষের চিকিৎসা বাবদ খরচ সবচেয়ে বেশি। ১৯৯৭ সালে যা ছিল ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০২০ সালে ছিল ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ; ২০২১ সালে তা ৭৩ শতাংশে উঠে যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর চ্যানেল 24 অনলাইনকে বলেন, সরকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের চেয়ে রাস্তাঘাট, সেতু ও জ্বালানি খাতকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। কারণ, জনতুষ্টির এসব প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়ন সহজে দৃশ্যমান হয়। বিগত সরকার মনে করতো তাদের রাস্তা-ঘাট বানাতে হবে, বিদ্যুতের মেগওয়াট বৃদ্ধি করতে হবে। এগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং সেভাবে বরাদ্দও দিয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও একইরকম করছে। ফলে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। যেখানে অগ্রাধিকার দেয়া হবে, সেখানে টাকা বেশি ব্যয় করা হবে, এটি স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, একনেক বলে দিচ্ছে সরকারকে স্বাস্থ্যখাতে অগ্রাধিকারের দরকার নেই। অবকাঠামোর উন্নয়ন অগ্রাধিকার পাবে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প তো চলছে, সেখানে ব্যয় করতে হচ্ছে। এসব খাতে বেশি ব্যয় করলে, স্বাস্থ্যের জন্য থাকবে না। এক্ষেত্রে বিগত সরকারের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো পার্থক্য করা যাচ্ছে না। এডিপির দিকে তাকালে বুঝা যায়, এ সরকার বিগত সরকারের পথে হাঁটছে।
তিনি আরও বলেন, এ সরকার রাস্তাঘাট, সেতু ও জ্বালানি উন্নয়নের চেয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দিতে পারতো। সরকার বলতে পারতো গেল ১৫ বছর রাস্তা-ঘাট অনেক উন্নয়ন হয়েছে, এবার স্বাস্থ্যখাতে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। কিন্তু তা করা হয়নি। আগামীতে যে সরকার আসবে, সে সরকারও একই পথে হাঁটবে। স্বাস্থ্যের বরাদ্দের দূরাবস্থা রয়ে যাবে।
স্বাস্থ্যের বরাদ্দ ফেরত যাওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়
অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর বলেন, স্বাস্থ্যের বরাদ্দের টাকা ফেরত যায়— এ কথাটা সম্পূর্ণ ভুয়া। ধরেন, এটি হলো ২০২৫-২০২৬ সালের প্রাক্কলিত বাজেট। ২৬ সালে মার্চ-এপ্রিলে সংশোধিত বাজেট হবে। শুরুতে যে ১০০ টাকা দেয়া হলো, সেটি তখন ৮০ টাকাতে কমিয়ে আনা হবে। তারপর জুন মাস শেষ হলে বলবে কত টাকা খরচ হয়েছে। আমি যদি ৮০ টাকাও খরচ করি, তখন বলবে আপনি ২০ টাকা খরচ করতে পারেননি। কিন্তু ২০ টাকা তো আমাকে দেয়া হয়নি। এটি হলো আমলাতন্ত্রের কারসাজি।
তিনি বলেন, শুধু খরচ করার সক্ষমতা নেই বললে চলবে না। ২০ টাকা তো আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে অন্য খাতে ব্যয় করছে সরকার। স্বাস্থ্য খাতে স্টান্ডার্ড কমিশনের গল্প নেই, তাই যারা বরাদ্দ করেন তারাও এখানে বরাদ্দ দিতে রাজি নয়। একটি দুষ্ট চক্রের কবলে এ খাত।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, খরচ যাতে না বাড়ে তাই আপনি বরাদ্দ কমিয়েছেন। কিন্তু অন্য খাতে সবই তো ঠিক রাখলেন। তাহলে কীভাবে বলেন অযথা খরচ যেনো না হয়। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে সরকার মুখেই অগ্রাধিকার দেয়, বাস্তবে কাজের সময় আর পকেট থেকে টাকা বের হয় না।
Leave a Reply