অনেকেই সকালে ঘুম থেকে উঠেই মাথাব্যথায় ভোগেন। বিষয়টি সাময়িক মনে হলেও এর পেছনে থাকতে পারে ঘুমের সমস্যা, জীবনযাপন কিংবা শারীরিক নানা কারণ। গবেষণা বলছে, প্রতি ১৩ জনে একজন নিয়মিত সকালে মাথাব্যথার অভিজ্ঞতা পান। সকালে মাথাব্যথার কারণ নিয়ে চিকিৎসকরা বিস্তারিত কথা বলেছেন মার্কিন স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা স্লিপ ফাউনডেশনের প্রতিবেদনে।
কেন সকালে মাথাব্যথা হয়
ঘুম থেকে জাগার সময় আমাদের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে সক্রিয় হতে থাকে। শরীরের ভঙ্গি, শব্দ বা স্পর্শের প্রতি সংবেদনশীলতা বাড়ে। এই সময়টিতে ব্যথা অনুভবের প্রবণতাও বেড়ে যায়। মস্তিষ্কের একটি অংশ, হাইপোথ্যালামাস, ঘুম ও ব্যথা দুটোই নিয়ন্ত্রণ করে। এটি আমাদের শরীরের প্রাকৃতিক ঘুম-জাগরণ চক্র (সার্কাডিয়ান রিদম) নিয়ন্ত্রণ করে। ঘুমের সময় এই অংশে কোনো ব্যাঘাত ঘটলে ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে ঘুমের মধ্যে ব্যথা টের না পেলেও সকালে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মাথাব্যথার ধরন: সকালের সব মাথাব্যথার অনুভূতি বা কারণ এক নয়। আপনার কোন ধরনের মাথাব্যথা হচ্ছে তা বুঝতে পারলে, এর কারণ কী এবং কীভাবে উপশম পাওয়া যায় তা বের করতে সুবিধা হবে। সকালে সাধারণত যে ধরনের মাথাব্যথা হয়, তার কয়েকটি নিচে দেয়া হলো:
মাইগ্রেন: এমন অনেকেই আছেন যাদের দিনের শুরু হয় মাইগ্রেনের ব্যথ্য দিয়ে। বেশিরভাগ সময় দেখা যায় মাইগ্রেনের ব্যথা হয় কম ঘুম বা অনিয়মিত ঘুম এর বড় কারণ।
টেনশনের মাথাব্যথা: এটি এক ধরনের ভোঁতা, যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা যা প্রায়শই মাথার দুই পাশে অনুভূত হয়। মানসিক চাপ, ঘুমের ভুল ভঙ্গি, বা ঘাড় ও কাঁধের পেশিতে টান পড়ার কারণে এটি হতে পারে।
ক্লাস্টার হেডেক: এটি এক ধরনের তীব্র, ছুরির ফলার মতো ব্যথা যা সাধারণত একটি চোখের চারপাশে কেন্দ্রীভূত থাকে। ক্লাস্টার হেডেক প্রায়শই প্রতিদিন একই সময়ে হয় কখনও কখনও ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়।
নকটার্নাল হাইপারটেনশন হেডেক: রাতে উচ্চ রক্তচাপের কারণে সকালে ব্যথা, সঙ্গে ঝাপসা দেখা বা মাথা ঘোরা থাকতে পারে।
ইনট্রাক্রেনিয়াল স্ট্রাকচারাল হেডেক: মস্তিষ্ক বা খুলির ভেতরের জটিল সমস্যার কারণে হয়, সাধারণত অন্য স্নায়বিক উপসর্গও থাকে।
সকালের মাথাব্যথার কারণ: ঘুমের সমস্যায় সাধারণত সকালে মাথাব্যথার কারণ হয়ে থাকে। তবে অনেকের এর বাইরেও কিছু কারণ থাকতে পারে বলছেন চিকিৎসকরা। এগুলো হলো:
স্লিপ অ্যাপনিয়া: অনেকেই জানেন না অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া আছে আর এটার কারণে মাথা ব্যথা হয়। এই রোগে ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাসকে ব্যাহত করে বা বন্ধ করে দেয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ভোগা ব্যক্তিদের ২৯ শতাংশের মানুষ সকালে মাথাব্যথার কথা জানিয়েছেন।
নাক ডাকা: সবার ক্ষেত্রে অ্যাপনিয়া না থাকলেও নাক ডাকার কারণে মাথাব্যথা হতে পারে। ঘন ঘন নাক ডাকা ২৬৮ জন ব্যক্তির উপর করা একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২৩.৫ শতাংশ নিয়মিত সকালে মাথাব্যথা নিয়ে ঘুম থেকে উঠতেন।
কম ঘুম: ঠিকমতো না ঘুমালে সকালে মাথাব্যথার ঝুঁকি বাড়ে। এই ঘুমের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিরা সহজে ঘুমিয়ে পড়তে বা ঘুমিয়ে থাকতে পারেন না। ফলস্বরূপ, তারা প্রায়শই পর্যাপ্ত ঘুম পান না এবং দিনের বেলায় ক্লান্ত বা নিস্তেজ বোধ করতে পারেন।
সার্কাডিয়ান রিদমের সমস্যা: ঘুম-জাগরণের সময়সূচি এলোমেলো হলে মাথাব্যথা হতে পারে। অনেকেই এই সমস্যায় ভোগেন।
অতিরিক্ত ঘুম: অনেকেই বলেন বেশি ঘুমের কারণে মাথাব্যথা হচ্ছে। বিষয়টা কিন্তু একদম সত্যি অতিরিক্ত ঘুম অনেক সময় মাথাব্যথার কারণ।
ঘুমের ভঙ্গি বা ঘাড়ের টান: ভুল ভঙ্গিতে ঘুমালে পেশিতে চাপ পড়ে ব্যথা হয়। তাই অনেকেই সকালে মাথাব্যথা নিয়ে উঠেন।
ডিহাইড্রেশন: রাতে দীর্ঘ সময় পানি না খাওয়ার ফলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়ে মাথাব্যথা হতে পারে। এটা অনেকেই বুঝতে পারেন না তবে বিষয়টা হালকাভাবে না নেয়াই ভালো।
উচ্চ রক্তচাপ: রক্তচাপ বেশি হলে মাথায় চাপ সৃষ্টি হয়ে ব্যথা হয়। যখন রক্তচাপ খুব বেশি বেড়ে যায়, তখন এটি মাথার ভেতরের চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে যেটা ব্যথা-সংবেদনশীল স্থানগুলোতে জ্বালা সৃষ্টি করে। এই মাথাব্যথাকে প্রায়শই ভোঁতা, স্পন্দনশীল ব্যথা হিসাবে বর্ণনা করা হয়। উচ্চ রক্তচাপের কারনে মাথাব্যথা হলে মাথা ঘোরা, ঝাপসা দৃষ্টি বা চাপের অনুভূতির মতো অন্যান্য উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
ক্যাফেইন বন্ধ করা: নিয়মিত চা বা কফি খেয়ে হঠাৎ বন্ধ করলে মাথাব্যথা হতে পারে। শরীরের মানিয়ে নিতে সময় লাগে আর সেটা থেকেই এই সমস্যা।
সমাধান: সকালের মাথাব্যথা কমাতে কিছু সহজ অভ্যাস সাহায্য করতে পারে
নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখা
পর্যাপ্ত পানি পান করা
আরামদায়ক বালিশ ও ঘুমের ভঙ্গি ঠিক করা
ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণে রাখা
মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
যদি নিয়মিত সকালে মাথাব্যথা হয়, খুব তীব্র হয়, বা এর সঙ্গে ঝাপসা দেখা, মাথা ঘোরা, বমি বা অন্য উপসর্গ থাকেতাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। সবার শরীর এক নয় তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়াই ভালো।
Leave a Reply