ঐতিহ্যবাহী সোনাবানের শহর টঙ্গীর কহর দরিয়া তুরাগ নদের তীরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর মহা-সম্মেলন বিশ^ ইজতেমার ৩ দিনব্যাপী প্রথম পর্বের প্রথম ধাপ রোববার সকাল সাড়ে ৯ টায় আখেরী মোনাজাতের মধ্যদিয়ে সমাপ্তি হলো। সকাল ৯ টা ১১ মিনিট থেকে শুরু করে ০৯টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত ২৪ মিনিট মোনাজাত অনুষ্টিত হয়।
মোনাজাতে গভীর আকুতি মিনতি, নিজেকে আত্মসমর্পণ ও অশ্রুসিক্ত নয়নে কাকরাইল জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা জুবায়ের হোসাইন এর তত্ত্বাবধানে রোববার শেষ হলো মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় মিলনমেলা, বিশ্ব তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার ৫৮তম আসর।
প্রায় ৪০ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লীর কাংখিত আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন বিশ্ব তাবলিগ জামায়াতের শীর্ষ মুরব্বী রাজধানীর কাকরাইল জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা জুবায়ের হোসাইন।
২৪ মিনিট স্থায়ী জনসমুদ্রে হঠাৎ নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। যে যেখানে ছিলেন, সেখানে দাঁড়িয়ে বা বসে হাত তোলেন আল্লাহর দরবারে। টঙ্গী, গাজীপুর, উত্তরাসহ চারপাশের এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, মার্কেট, বিপণিবিতান, অফিস প্রায় সব কিছু ছিল বন্ধ।
সবার প্রাণপণ চেষ্টা ছিল দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মুসল্লিদের সঙ্গে মোনাজাতে অংশ নিয়ে নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা।
মোনাজাতে সমস্ত বিশ্বের পথভ্রষ্ট মুসলমানদের নাজাত, ঐক্য, মুক্তি, সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা, আত্মশুদ্ধি, ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ কামনা করে রাব্বুল আলামিনের দরবারে ফরিয়াদ জানানো হয়। ভাবাবেগপূর্ণ পরিবেশে ‘আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে শীতের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে দয়াময় আল্লাহর দরবারে করুণা ও অশেষ রহমত কামনা করেন দেশ-বিদেশের প্রায় ৪০ লক্ষাধিক ধর্মপ্রাণ মুসলমান।
বয়ান করেছেন: রোবববার ফজরের পর বয়ান করেন মাওলানা আব্দুর রহমান [ভারত], তরজমা করেন মাওলানা আব্দুল মতিন। নসিহত মূলক বয়ান করেন, ভারতের মাওলানা ইব্রাহিম দেওলা, তরজমা করেন মাওলানা জুবায়ের। এরপরই দোয়া করেন মাওলানা জুবায়ের [বাংলাদেশ]।
প্রথম পর্বেও প্রথম ধাপে ৫ মুসল্লির মৃত্যু: প্রথম পর্বের বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে আসা মুসল্লীদের মধ্যে মোট ৫ মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন শেরপুর শ্রীবর্দির ছাবেদ আলী (৭০), খুলনা ডুমুরিয়ার আব্দুল কুদ্দুস গাজী (৬০), হবিগঞ্জ বাহুবলের ইয়াকুব আলী (৬০), হবিগঞ্জ সদর হবিগঞ্জের রমিজ আলী (৬০), চরফ্যাশন ভোলার হাজী আব্দুল গফুর (৭৫), এই ৫ জন মারা যান। এছাড়া ইজতেমা ময়দানে এবছর ৬৩ টি বিয়ে পড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
ইজতেমা চারপাশ হকারদের দখলে: টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমায় শত শত নতুন নতুন হকারের মিলনমেলা বসেছে। বিকিকিনিতে যেন ইদ লেগেছে হকারদের। লাখ লাখ মুসল্লি দেখে দামও হাঁকাচ্ছেন দ্বিগুণ।
রোববার ইজতেমা ময়দান ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, টঙ্গী এলাকার আশপাশের রাস্তাঘাট সব জায়গাতে হকার আর হকার। এযেন হকারদের মিলন মেলা। ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের কাছে জায়নামাজ, টুপি, তসবিহ বিভিন্ন খাবার সামগ্রি, কাপড়, বিছানার চাদর বিক্রি করেছে হকাররা। এছাড়া বিক্রি করছে শীতের কাপড় যেমন-ব্লেজার, মাপলার, কান-টুপি ইত্যাদি।
ইজতেমা থেকে ফিরতে পথে পথে ভোগান্তি, পরিবহনগুলো ভাড়া নিচ্ছে দ্বিগুণ: যানজট কম থাকায় বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই প্রথম পর্বের ইজতেমায় এসেছিলেন মুসল্লিরা। তবে আখেরি মোনাজাত শেষে বাড়ি ফেরার পথে ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা। যাত্রীবাহী বাসে প্রচন্ড ভিড় থাকায় দলে দলে পায়ে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছেন অনেকে। পথিমধ্যে অনেকে আবার মোটরসাইকেল, ভ্যান, অটোরিকশা ও পিকআপে চড়ে রওনা করছেন। এক্ষেত্রে দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে তাদের। তাছাড়া যাত্রীবাহী বাসগুলো ভাড়া হাকছে দ্বিগুন।
টঙ্গী এবং আব্দুল্লাহপুরের বিভিন্ন বাস কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, আখেরি মোনাজাত শেষ হতে না হতেই বাড়ি ফিরতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন মুসল্লিরা। কিন্তু সেই অনুযায়ী রাস্তায় পর্যাপ্ত বাস নেই। যে কয়টি বাস রয়েছে, সেগুলোও দূরের যাত্রীদের নিচ্ছে। এছাড়া বাসগুলো ভাড়াও নিচ্ছে দ্বিগুণ।
বিমানবন্দর, মহাখালী ও মগবাজার হয়ে সায়েদাবাদ রুটে চলাচল করে বিভিন্ন লোকাল পরিবহন। এই লোকাল বাসগুলোতে ১২০ টাকার নিচে কোনো যাত্রী নিচ্ছে না। কেউ যদি মহাখালী নামেন তাকেও ১২০ টাকা দিতে হবে বলে জানানো হয়। ফলে বাধ্য হয়ে দ্রুত গন্তব্যে ফিরতে ১২০ টাকা দিয়েই বাসে উঠছেন যাত্রীরা। এদিকে রাজধানীতে চলাচলকারী পরিবহনগুলোর ক্ষেত্রে একই দৃশ্য দেখা গেছে। নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ ভাড়া নিচ্ছে বাসগুলো।
এদিকে, মোটরসাইকেলে চড়ে আশপাশের গন্তব্যে যেতে গুনতে হচ্ছে সর্বনিম্ন ৩০০ টাকা। আর যারা যাত্রাবাড়ী, গুলিস্থান কিংবা সদরঘাট যাচ্ছেন, তাদের কাছ নিচ্ছে ৬০০-৭০০ টাকা। তবে বেশিরভাগ যাত্রীদের পায়ে হেঁটে হেঁটে দলে দলে ইজতেমা মাঠ ছাড়তে দেখা গেছে। এই অবস্থায় বিপাকে পড়েছেন ইজতেমা ময়দান থেকে কম দূরত্বের এয়ারপোর্ট, খিলক্ষেত, বাড্ডা ও রামপুরাসহ বোর্ডবাজার, জয়দেবপুর, পুবাইল কালীগঞ্জ, আশুলিয়া, সাভার নবীনগর এলাকার মুসল্লিরা। উপায় না পেয়ে অটোরিকশা, ভ্যান ও পিকআপে চড়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছুটছেন তারা। আবার এগুলোর কোনোটিতেই চড়ার সুযোগ না পেয়ে দলে দলে পায়ে হেঁটে ফিরতে দেখা গেছে অনেকেই।
বিদেশি মেহমান: বিশ্ব ইজতেমার মিডিয়া সমন্বয়কারী হাবিবুল্লাহ রায়হান জানান, রোববার সকাল পর্যন্ত ৭৬টি দেশ থেকে ৩ হাজার ৫০ জন বিদেশী মেহমান ইজতেমা ময়দানে উপস্থিত হয়েছেন।
এদিকে সোমবার সকাল থেকে শুরু হচ্ছে শুয়ারী নিজামের অধীনে ৫৮তম টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় ধাপ। তবে নানা অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে সাদ অনুসারীদের ইজতেমা এখনো অনিশ্চিত বলে জানান জুবায়ের অনুসারী বিশ্ব ইজতেমার মিডিয়া সমন্বয়কারী হাবিবুল।লাহ রায়হান।
Leave a Reply