শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০৪:৪৪ অপরাহ্ন

যেভাবে করুণা থেকে সর্বজয়া

অনলাইন ডেস্ক
  • আপলোডের সময় : শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৪
  • ৫৭ বার

সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অপরাজিত’ ছবিতে এই সর্বজয়ার চরিত্রকে রূপ দিতে ডেকে নিয়েছিলেন বাল্যবন্ধু ও সহকর্মী সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী করুণাকে।
আর তার পরে করুণা ও সর্বজয়া মিশে গিয়েছিল এক অভিন্ন সত্তায়। করুণা হলেন এমন এক বিশেষ অভিনেত্রী, যিনি শুধু অভিনয় দিয়ে তাঁর অভিনীত চরিত্রদের অমর করে রেখে গিয়েছেন। সংখ্যায় অল্প হলেও গুরুত্বে তারা বিপুল।
বিশ্ব জুড়ে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব বেশি বার ঘটেনি। এ প্রসঙ্গে মনে পড়তে পারে ১৯২৮ সালে তৈরি কার্ল থিয়োডোর ড্রেয়ারের নির্বাক ফরাসি ছবি ‘প্যাশন অব জোয়ান অফ আর্ক’-এর কথা। জোয়ানের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন রেনি জিন ফলুকনেত্তি।
জোয়ানের চরিত্রকে তিনি এমন জীবন্ত করে তুলেছিলেন যে, সারা জীবন সেই ছায়া থেকে কোনও দিন আর বেরোতে পারেননি। করুণার ক্ষেত্রেও তাই। অথচ চরিত্রটি প্রথমে তিনি করতেই চাননি।
‘পারব না, করব না’, একটি পোস্টকার্ডে সত্যজিৎ রায়কে লেখা করুণার এই শব্দগুলি হয়তো বিরাট এক আক্ষেপের কারণ হয়ে থাকতে পারত বাংলা তথা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে।
আমাদের সৌভাগ্য, তেমনটা হতে দেননি করুণার স্বামী সুব্রত, শ্বশুর সুনীতকুমার ও শাশুড়ি নলিনী বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁরাই করুণাকে রাজি করিয়েছিলেন সত্যজিতের ছবিতে অভিনয় করতে।
তবে আপত্তিটা যে কেন করেছিলেন সে সম্পর্কে নিজেই লিখেছেন, “যখন ‘পথের পাঁচালী’র সর্বজয়া হবার ডাক এল, তখন আমি মোটেই উৎসাহে নেচে উঠিনি। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। সিনেমা জগৎ সম্পর্কে একটা ভীতি ও সংস্কার আমার মধ্যে পুরোপুরি ছিল।
যদিও ইতিপূর্বে আমি আড়াই বছরের উপরে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে অভিনয় করেছি। অভিনয়ে আমার হাতেখড়ি সেখানেই।” করুণা যে-মঞ্চের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, তা যে পেশাদার রঙ্গমঞ্চের থেকে আলাদা, তিনি জানতেন।
কিন্তু সেই একই ব্যাপার যে সিনেমাশিল্পেও হতে পারে, সে রকম কোনও ধারণা তাঁর ছিল না। তৎকালীন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ও গণনাট্য আন্দোলনের পরোক্ষ অভিঘাতে জন্ম হওয়া অপেশাদার নব্যধারার বাংলা চলচ্চিত্রে এ ভাবেই প্রবেশ ঘটেছিল করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় আসলেই একজন স্বনামধন্য খ্যাতিমান শক্তিশালী বাঙালি অভিনেত্রী। তিনি একজন তুখোড় নাট্য এবং চলচ্চিত্র শিল্পী।
অস্কারজয়ী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় পরিচালিত পথের পাঁচালী এবং অপরাজিত চলচ্চিত্রে সর্বজয়ার ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় দর্শক ও বোদ্ধা মহলে প্রচুর প্রশংসিত ও সমাদৃত হন।
করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম হয় ২৫শে ডিসেম্বর ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ ভারতে সাঁওতাল পরগণার মহেশপুরে। তার পৈতৃক বাড়ি ছিল বর্তমান বাংলাদেশের খুলনার পয়োগ্রামে । তার পিতার নাম শচীন্দ্রনাথ সেন এবং মাতা সুধা সেন।
তার স্বামী সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কমিউনিস্ট ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক কারণে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। স্বামীর আদর্শ পুড়ন ও জনগণের দাবীকে আরও অধিকতর ব্যপৃত করার জন্য সেই সময়ে করুণাদেবী গণনাট্য সঙ্ঘে যোগ দেন।
সত্যজিৎ রায় পরিচালিত পথের পাঁচালী এবং অপরাজিত চলচ্চিত্রে সর্বজয়ার ভূমিকায় অভিনয় করে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় বিখ্যাত হন। তিনি শহুরে উচ্চশিক্ষিতা মহিলা হয়েও যেভাবে এক গ্রাম্যবধূর বাস্তব চরিত্রে অভিনয় করেন তা উল্লেখযোগ্য ।
এই দুটি চলচ্চিত্র ছাড়াও তিনি সত্যজিৎ রায়ের দেবী এবং কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবিতে অভিনয় করে দর্শক ও বোদ্ধা মহলে প্রচুর সমাদৃত ও প্রশংসিত হন ।
এছাড়া করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও অভিনয় করেছেন মৃণাল সেনের ইন্টারভিউ অগ্রগামীর হেডমাস্টার, শম্ভু মিত্র এবং অমিত মৈত্রের শুভবিবাহ ইত্যাদি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে।
গণনাট্য সঙ্ঘে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘকাল ছিলেন । সেখানে সংকেত, জনান্তিকে তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটক। তিনি সলিল চৌধুরীর নাটকে অভিনয় করেছেন।
এ ছাড়াও করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিম বঙ্গের লিটিল থিয়েটার গ্রুপ এবং আরো কয়েকটি সংগঠনে অভিনয় করে নিজের উজ্জ্বল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন ।
করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত গ্রন্থ : সর্বজয়া, অ্যান অ্যাকট্রেস ইন হার টাইম । তার চিঠি এবং ডায়রির সংকলন আরেক সর্বজয়া তার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়েছিল। করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সব গুলো গ্রন্থ পাঠক মহলে প্রচুর সমাদৃত হয়।
করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় ১২ নভেম্বর ২০০১ সালে পশ্চিম বঙ্গের কোলকাতায় ইহকাল ত্যাগ করে পরপারে চলে যান।

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories