মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:১৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
গাজীপুরে উন্নয়ন ও সংস্কার নিয়ে আইইবির মতবিনিময় সভা পানি, বর্জ্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে আগ্রহী সরকার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে : আফরোজা খানম বিজিবির মৎস্য পক্ষ-২০২৬ উদ্বোধন, সর্বস্তরে মাছ চাষের আহ্বান মহাপরিচালকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হুমায়ুন ও শামার দায়িত্ব বণ্টন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, রোহিঙ্গা ও অভিবাসন সহযোগিতা নিয়ে খলিলুর-সারাহ কুক বৈঠক দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে সরকারের তিন ধাপের কৌশল তুলে ধরলেন ড. তিতুমীর সকল ধর্ম ও মতের মানুষকে কথা বলার সুযোগ দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টায় থাকবো : ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার মালয়েশিয়ায় ন্যূনতম মজুরি ৩,১০০ রিঙ্গিত করার দাবি এমটিইউসির পেনাংয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মোবাইল কনস্যুলার ক্যাম্প, দুই দিনে পাঁচ শতাধিক প্রবাসীকে সেবা প্রদান

বাংলাদেশে রবীন্দ্রসাহিত্য ও বাঙালী মুসলিমের আত্মবিনাশ

রিপোর্টারের নাম
  • আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৩
  • ১৭৭ বার

বাঙালী মুসলিমের রবীন্দ্রাসক্তি ও আত্মপচন: দৈহিক পচনের ন্যায় আত্মপচনের আলামতগুলিও গোপন থাকে না। দেহের পচনে হাত-পা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শক্তিহীন হয়। আত্মপচনে মৃত্যু ঘটে বিবেকের; তাতে বিলুপ্ত হয় নীতি ও নৈতিকতা। চুরি-ডাকাতি, ভোট-ডাকাতি, সন্ত্রাস, গুম, হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, ধর্ষণে উৎসব, লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথে হত্যা, পুলিশী রিম্যান্ডে হত্যা, ক্রসফায়ারে হত্যা–এ রূপ নানা নিষ্ঠুরতা তখন নিত্তনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অতি নির্মম ও নিষ্ঠুর কাজেও তখন বিবেকের পক্ষ থেকে বাঁধা থাকে না। এর ফলে রাস্তাঘাটে শুধু অর্থকড়ি, গহনা ও গাড়ি ছিনতাই হয় না, নারী ছিনতাইও শুরু হয়। পত্রিকায় প্রকাশ, মাত্র গত তিন মাসে দেশে ১২৩ জন মহিলা ছিনতাই ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। (দৈনিক আমার দেশ, ২৬/০৫/২০১৫)। তবে সব ধর্ষিতাই যে থানায় এসে নিজের ধর্ষিতা হওয়ার খবরটি জানায় -তা নয়। কারণ তাতে অপরাধীর শাস্তি মেলে না বরং সমাজে ধর্ষিতা রূপে প্রচার পাওয়ায় অপমান বাড়ে। অধীকাংশ ধর্ষণের ঘটনা তাই গোপনই থেকে যায়। ফলে ধর্ষিতা নারীদের আসল সংখ্যা যে বহুগুণ বেশী –তা নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। চুরিডাকাতি, খুন, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের নানা পাপগুলি বস্তুত একটি অসুস্থ্য চেতনার সিম্পটম। রোগ-জীবাণু দৈহিক রোগ ঘটায়, চেতনাকে অসুস্থ্য করে বিষাক্ত দর্শন। তাই দৈহিক রোগের প্রকোপ বাড়লে যেমন দেহের মাঝে লুকানো রোগ-জীবাণুর তালাশ করতে হয়, তেমনি রাষ্ট্রে দুর্বৃত্তির প্লাবন বাড়লে বিষাক্ত দর্শনটির খুঁজে বের করতে হয়। বাংলাদেশে যে দর্শনটির স্কুল-কলেজে ছাত্র-ছাত্রীদের চেতনায় প্রবেশ করানো হয় সেটি আদৌ ইসলামের নয়, বরং রবীন্দ্রনাথের এবং রাবিন্দ্রীক গোত্রের লেখক-লেখিকাদের। সে রবিন্দ্র দর্শনের চাষাবাদে মূল বীজটি হলো বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ও নানা জাতের রবিন্দ্র সাহিত্য। বাংলাদেশ শতকরা ৯১ ভাগ মুসলিমের হলে কি হবে, স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচীতে ইসলামের কোন স্থান নাই। পাকিস্তান আমলে দ্বীনিয়াত নামে যে বইটি স্কুলে পড়ানো হতো সেটিও ভারতমুখী মুজিব সরকার বিলুপ্ত করে দেয়। কারণ সেটিই তো হিন্দুত্ববাদী ভারতের নীতি। ফলে বাঙালীর চেতনার অঙ্গণে প্রকটতর করা হয় ইসলামের শূণ্যতাটি। জাহিলিয়াত যুগের আরবগণ যে কারণে কন্যাদের জীবন্ত দাফন দিত এবং সন্ত্রাস, রাহাজানি, ব্যাভিচারি, কলহ-বিবাদ ও গোত্রীয় যুদ্ধে ডুবে থাকতো -তার কারণ আরবের আলো-বাতাস, জলবায়ু ও পানাহার ছিল না। তার মূল ছিল অসুস্থ্য দর্শন এবং তা থেকে সৃষ্ট আত্মপচন। এরূপ আত্মপচনের ফলেই আরবগণ নানারূপ নিষ্ঠুরতায় নেমেছিল। এবং প্রবল প্রতিরোধ গড়েছিল ইসলামের বিরুদ্ধে। সে আত্মপচনের মূলে ছিল আখেরাতের ভয়শূণ্য পৌত্তলিক দর্শন। চেতনার নির্মাণে সাহিত্যের ভূমিকাটি বিশাল। কারণ সাহিত্যই দর্শনের বাহক। পানির পাইপ যেমন ঘরে ঘরে পানি পৌঁছায়, সাহিত্য তেমনি জনগণের চেতনায় দর্শন পৌঁছায়। তাই একটি দেশের মানুষ কি লেখে এবং কি পড়ে -তা থেকে জনগণের চেতনা, চরিত্র ও সংস্কৃতির পরিচয় মেলে। তাই যারা কুর’আন-হাদীস অধ্যয়ন করে এবং যারা রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প ও গান পাঠ করে তাদের চেতনা কখনোই এক হয় না। তৎকালীন আরবের জনগণের বিবেক বিষাক্ত করা ও হত্যা করার কাজে কাজ করেছিল ইমরুল কায়েস ও তার সমগোত্রীয় কবিগণ। বাংলাদেশে সে অভিন্ন কাজটি করছে রবিন্দ্রনাথ ও তাঁর সমগোত্রীয়রা। বাংলাদেশ এ চলতি শতাব্দীর শুরুতে বিশ্ব মাঝে দুর্বৃত্তিতে পর পর ৫ বার প্রথম হয়েছিল। বিশ্বজুড়া এই কলংকের ইতিহাসের জন্য বাংলাদেশের আলো-বাতাস, জল-বায়ু, ভূ-গোল ও ভাত-মাছ দায়ী নয়। এতটা নীচে নামতে হলে চেতনা বা বিবেক মারাত্মক ভাবে অসুস্থ্য বা মৃত হতে হয়। একমাত্র তখনই দেশ গুম, খুন, চুরিডাকাতি, ভোটডাকাতি, ধর্ষণ ও ধর্ষণের সেঞ্চুরি গড়তে পারে এবং গড়তে পারে নৃশংস ফ্যাসিবাদের রেকর্ড। বাংলাদেশ এখনো পতনের সে মানটিই বহাল রেখে চলেছে।

তবে আরবদের সৌভাগ্য হলো, জাহেলিয়াত যুগের আত্মপচন থেকে তারা যে শুধু রক্ষা পেয়েছিল তা নয়, সমগ্র মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতারও জন্ম দিয়েছিল। তারা দ্রুত বিশ্বশক্তিতেও পরিণত হয়েছিল। নীতি-নৈতিকতার ক্ষেত্রে তারা এতোটাই উচ্চতায় পৌঁছেছিল যে অন্য কোন জাতি সে স্তরে কোন কালেই পৌঁছতে পারিনি। আজও নয়। কীরূপে তারা সে পচন থেকে রক্ষা পেল, কীভাবে তারা এতোটা উচ্চতায় উঠলো এবং বাঙালী মুসলিমেরাই বা কেন এতো দ্রুত নীচে নামছে -সেটিই হলো সমাজ বিজ্ঞানের অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পতিত আরবদের এতো দ্রুত উপরে উঠার মাঝেই নিহীত রয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কারণ শয্যাশায়ী কান্সারের রোগীও যে ঔষধে সুস্থ্য হয়ে উঠে সে ঔষধের খোঁজ নেয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর কি হতে পারে? আরবগণ জেগে উঠে প্রমাণ করেছে, আত্মপচন যতই গভীর হোক তা থেকে আরোগ্যলাভেরও মোক্ষম উপায় আছে। মানবজাতির জন্য সে শিক্ষাটিই হলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষা। আকাশে উড়া, চাঁদে নামা ও আনবিক বোমার তৈরীর বিদ্যা না শিখিয়ে তারা শিখিয়ে গেছে আত্মপচনের চুড়ান্ত পর্যায় থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রূপে বেড়ে উঠার বিদ্যা। এর চেয়ে উপকারি বিদ্যা মানব জাতির জন্য আর কি হতে পারে? দেহে যে রোগ আছে শুধু এটুকু জেনে লাভ কী? লাভ তো রোগের চিকিৎসাটি জানায়। বাঙালী মুসলিমের এখানেই ব্যর্থতা।

গার্মেন্টস শিল্পে বাংলাদেশে বিশ্বে দ্বিতীয়, মৎস্য উৎপাদনে চতুর্থ, পাঠ উৎপাদনে শীর্ষে। কিন্তু দেশে চোরডাকাত, ভোটডাকাত, খুনি, ধর্ষক ও ফ্যাসিবাদীদের উৎপাদন বিপুল সংখ্যায় হওয়ায় অন্য সব অর্জন ম্লান করে দিয়েছে। দুর্বৃত্তদের কারণে বাংলাদেশ দ্রুত বাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ফলে হাজার হাজার বাঙালী মুসলিম দেশ ছাড়ছে রহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে। নিজ দেশ ছেড়ে নৌকায় চড়ে গভীর সমুদ্রে গিয়ে ভাসছে। আরবদের পচনটি কোন কালেই কি এ পর্যায়ে পৌছেছে? নিজ দেশ ছেড়ে তারা কি কখনো সাগরে গিয়ে ভেসেছে? গভীর সংকটের আরো কারণ, এরূপ ভয়ানক বিপর্যের মাঝে পড়েও বাঙালী মুসলিমের আগ্রহ নেই রোগের কারণ ও তার চিকিৎসা নিয়ে। দেশে কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য, মৎস্য চাষ, গরুমহিষের আবাদ বা মনুষ্যজীবের রপ্তানি বেড়েছে। কিন্তু তা দিয়ে কি আত্মপচন থেকে বাঁচা যায়? আত্মপচনের কারণটি অর্থাভাব, খাদ্যাভাব, দেহের অপুষ্টি বা রোগব্যাধী নয়। বরং সেটি চেতনার অঙ্গণে প্রচণ্ড অপুষ্টি ও অসুস্থ্যতা। মনের সে অপুষ্টি ও অসুস্থ্যতার কারণ হলো জ্ঞানশূণ্যতা। এবং সে জ্ঞানশূণ্যতাটি পবিত্র ওহীর জ্ঞানের।

দেহ বল পায় পুষ্টিকর খাদ্য থেকে এবং বিবেক পুষ্টি পায় সত্য জ্ঞান ও সঠিক দর্শন থেকে। নিরেট সত্য ও সঠিক দর্শনের উৎস্য তো মহান আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত গ্রন্থ্য। চেতনার রোগ সারাতে ও বিবেককে সবল করতে সে নাযিলকৃত সত্যের সামর্থ্যটি বিশাল। সেটি প্রমাণিত হয়েছে আজ থেকে সাড়ে ১৪ শত বছর আগে। মুসলিম মন তখন প্রবল পুষ্টি পেয়েছিল পবিত্র কুর’আন থেকে। তাতে দূর হয়েছিল আরব মনের অসুস্থ্যতা। ফলে এককালের অসভ্য আরবগণ অতিদ্রুত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবে পরিণত হতে পেরেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাঙালী মনের সে অসুস্থ্যতা সারাতে বাংলাদেশে সত্যজ্ঞান ও দর্শনের উৎস্যটি কি? সেটি কি পৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান? সেটি কি সেক্যুলার বাঙালী সাহিত্যিকদের লেখা প্রবন্ধ, গল্প ও উপন্যাস? সেটি কি মুক্তমনা নাস্তিকদের দর্শন? সেক্যুলার বাঙালীরা তো ভেবেছে এগুলিই তাদের শান্তি ও প্রগতির পথ দেখাবে। কিন্তু সেটি যে মিথ্যা –সেটির নাশকতা প্রমাণ করতে কি আরো নীচে নামতে হবে? আরো কত হাজার বাঙালীকে সমুদ্রে ভেসে মূত্রপান করতে হবে? আরো কত হাজার নারীকে ধর্ষণ ও সে ধর্ষণের ইতর উৎসব দেখতে হবে? শাপলা চত্বরের গণহত্যাই আর কত বার সহ্য করবে? কতবার দেখবে ভোট-ডাকাতির নির্বাচন?

সেক্যুলার রাজনীতির নাশকতা
বাংলাদেশে আজ যে ভয়ানক আত্মপচন তার মূল কারণ: চেতনায় ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ভয়ানক বিষক্রিয়া। সেটির কারণ: সেক্যুলার রাজনীতি ও কুসাহিত্যে। পানির পাইপের ন্যায় কুসাহিত্যের মাধ্যমে নরনারীর চেতনায় লাগাতর বিষপান ঘটে। বাংলাদেশে সে কাজটি প্রচণ্ড ভাবে হয়েছে। বিগত শত বছরে বাঙালীর ভাত-মাছ-ডাল-শাক-সবজি তথা খাদ্যে কোন পরিবর্তন আসেনি। বাংলার গাছপালা, আলোবাতাস বা জলবায়ুতেও তেমন পরিবর্তন আসেনি। ফলে বর্তমান বিপর্যয়ের জন্য এরূপ কোন একটিকেই দোষ দেয়া যায় না। বিগত শত বছরে বাংলার বুকে বিশাল পরিবর্তন এসেছে মূলত দুটি ক্ষেত্রে। এক). বাংলার মুসলিম গৃহে শত বছর আগে রবীন্দ্র সাহিত্য ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চা ছিল না। নাচগানও ছিল না। নাচগান সীমিত ছিল হিন্দু ও পতিতাপল্লির বাইজীদের গৃহে। কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নাচগান এখন নেমে এসেছে সাধারণ মানুষের গৃহে। সমগ্র দেশজুড়ে হাজার হাজার এনজিও গড়ে উঠেছে যাদের কাজ হয়েছে সেগুলি শেখানো। দুই). শত বছর আগে বাংলার রাজনীতিতে সেক্যুলারিস্টদের স্থান ছিল না। রাজনীতিতে তখন ইসলামের প্রতি প্রবল অঙ্গিকার ছিল। ফলে বাংলার মাটিতে সেদিন গড়ে উঠেছিল খেলাফত আন্দোলন ও পাকিস্তান আন্দোলনের ন্যায় দুটি বিশাল গণআন্দোলন। অথচ আজ দেশ অধিকৃত হয়ে আছে ধর্মচ্যুৎ ও ইসলামচ্যুৎ উগ্র সেক্যুলারিস্টদের হাতে। তাদের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে। কুর’আনে তাফসির বন্ধ করা, জিহাদবিষয়ক বই বাজেয়াপ্ত করা, ইসলামপন্থিদের ফাঁসিতে ঝুলানো, মুসল্লীদের হত্যাকরা এবং তাদের লাশকে ময়লার গাড়িতে তুলে গায়েব করাই তাদের সংস্কৃতি। তাদের নেতৃত্বে দেশে যা শুরু হয়েছে তা মূলত পৌত্তলিক সাহিত্য এবং সেক্যুলার রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ভয়ানক বিষক্রিয়া। বাঙালী মুসলিমের আজকের আত্মপচনের মূল কারণ হলো এটি।

দেশে আজ স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পত্র-পত্রিকার সংখ্যা বিপুল। কিন্তু তাতে সত্য জ্ঞান ও সত্য-দর্শনের আবাদ বাড়েনি; বরং বেড়েছে ঈমানবিনাশী বিষপানের মহা আয়োজন। জনগণের জীবনে এখন শুরু হয়েছে তারই বিষক্রিয়া। ইসলামের পূর্বে আরবী সাহিত্যে বিষপানের যে আয়োজনটি ছিল, সে তুলনায় বাংলাভাষার ভাণ্ডারটি বিশাল। পৌত্তলিকদের এতবড় সাহিত্য ভাণ্ডার বিশ্বের আর কোন ভাষায় নেই। এ কাজে রবীন্দ্রনাথের তো নবেল প্রাইজও মিলেছে। তবে এ ভাণ্ডার শুধু রবীন্দ্রনাথ বা বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্ট নয়, বরং গড়ে উঠেছে শত শত বাঙালী পৌত্তলিক সাহিত্যিকের সম্মিলিত চেষ্টায়। আধুনিক বাংলা সাহিত্য গড়ে উঠেছে মূলত হিন্দুদের দ্বারা। এবং সেটি হিন্দুদের গোড়া হিন্দু রূপে গড়ে তোলার প্রয়োজনে। বাংলা ভাষার শতকরা ৮০ ভাগের বেশী বইয়ের লেখক তারাই। ফলে বেদ, পুরান, গীতা, উপনিষদ, রামায়ন, মহাভারতের চরিত্রগুলি তাই বাংলা সাহিত্যে অতি সরব ও সোচ্চার। শুধু বঙ্কিম সাহিত্যে নয়, রবীন্দ্র সাহিত্যেও হিন্দু ধর্ম, হিন্দু একতা ও হিন্দুরাজের চেতনাটি অতি প্রকট।

ঈমান, আমল ও সৎ চরিত্র নিয়ে বাঁচতে হলে চেতনার সুস্বাস্থটি জরুরি । চেতনার মানচিত্রে লাগাতর বিষ ঢুকলে সেটি সম্ভব নয়। অথচ পৌত্তলিক সাহিত্য পাঠে তো সেটিই ঘটে। ধর্মপ্রাণ মুসলিমগণ অতীতে এ বিষের ভাণ্ডারকে তাই সতর্কতার সাথে পরিহার করেছে। তারা বরং চেতনায় পুষ্টি জুগিয়েছে উর্দু ও ফার্সী ভাষা থেকে। কিন্তু ১৯৭১’য়ের ডিসেম্বরে যুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিকৃতি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর সংযোগ গড়া হয় হিন্দুদের গড়া পৌত্তলিক বিষ ভান্ডারের সাথে। জ্ঞানচর্চার অঙ্গণে সংযোগ ছিন্ন করা হয় পবিত্র কুর’আনের সাথেও। বাঙালী মুসলিমের চেতনায় তখন বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় ঢুকানো হয় পৌত্তলিক সাহিত্য, সিনেমা ও গান। পৌত্তলিক চেতনায় সমৃদ্ধ বরীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দেয়া হয়। অথচ সে লক্ষে এ গানটি লেখা হয়নি।

বিবেকে বিষক্রিয়া
শিক্ষা ও সাহিত্যের নামে লাগাতর বিষপান হলে বিবেকে বিষক্রিয়া দেখা দিবে –সেটিই তো স্বাভাবিক। তখন সৃষ্টি হয় চরম নৈতিক বিপর্যয়। মুসলিম শিশুদের মুসলিম রূপে গড়ে তোলার কাজটি বিশাল। একাজ শুধু পিতামাতা ও মসজিদ-মাদ্রাসার দ্বারা হওয়ার নয়। বরং সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত টিভি, পত্রপত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থার। ছাত্রদের শুধু বিষপান থেকে বাঁচালে চলে না, তাদের চেতনায় কুর’আনী জ্ঞানের পুষ্টিও জোগাতে হয়। রাষ্ট্রের ঘাড়ে এটিই সবচেয়ে বড় দায়ভার। অথচ বাংলাদেশের ন্যায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে সরকারের পক্ষ থেকে সে দায়িত্ব পালিত হয়নি। মুসলিম শিশুকে মুসলিম রূপে গড়ে তোলার কাজটি সরকারি মহলে সাম্প্রদায়িকতা গণ্য হয়। অথচ স্কুল-কলেজে পৌত্তলিক সাহিত্য পড়ানোর কাজটি সরকার নিজ কাঁধে নিয়েছে। অথচ সেটিকে সাম্প্রদায়িক বলা হয় না। অতি পরিকল্পিত ভাবেই ছাত্র-ছাত্রীদের কুর’আন বুঝার সামর্থ্য বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অথচ সে সামর্থ্য অর্জনটি প্রতিটি মুসলিম নরনারীর উপর ফরজ। সরকারের এরূপ ইসলামবিরোধী শিক্ষানীতির কারণে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, কৃষিবিদ, আইনবিদ, হিসাববিদ ও অন্যান্য পেশাধারি তৈরী হলেও সত্যিকার মুসলিম তৈরী হচ্ছে খুব কমই। যারা হচ্ছে তারা নিজ উদ্যোগে। কুর’আনী জ্ঞানের জ্ঞানশূণ্যতায় কি ঈমান বাঁচে? বাঁচে কি চরিত্র? ফলে যা হবার তাই হয়েছে। ঈমাননাশ ও চরিত্রনাশের মহামারি ছেয়ে গেছে সমগ্র দেশ জুড়ে। ফলে জাহেলী যুগের আরবদের চেয়েও ভয়াবহ দুর্বৃত্তি নেমে এসেছে বাংলাদেশের উপর। লাগাতর বিষপানের পরিণতিতে এ ভয়ানক বিষক্রিয়া। ইসলামপূর্ব যুগে আরবের জাহেলগণ দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে শিরোপা পেয়েছে -সে প্রমাণ ইতিহাসে নেই। লুন্ঠনে লুন্ঠনে দেশের বুকে তারা দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছে বা মহিলাদের মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য করেছে -সে প্রমাণও নেই। বরং জাহিলিয়াতের যুগেও মেহমানদারিতে তাদের সুনাম ছিল, হাতেম তায়ীর মত ব্যক্তিও তাদের মাঝে জন্ম নিয়েছে। বিদেশীদের ঘরে তারা কখনোই নিজেদের কন্যা, বোন বা স্ত্রীদের রপ্তানি করেনি। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশী জাহেলদের নীচে নামার অর্জনটি তো বিশাল। দুর্বৃত্তিতে বিশ্বে ৫ বার প্রথম হওয়ার কুকীর্তির ইতিহাসটি তো একমাত্র তাদের। ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে বহু লক্ষ মানুষের জীবনে মৃত্যু ডেকে এনেছে। কাপড়ের অভাবে মহিলারা বাধ্য হয়েছে মাছধরা জাল পড়তে। এবং নারী রপ্তানি পরিণত হয়েছে দেশের অর্থনীতিতে।

শেখ হাসিনা বর্বরতার আরেক ইতিহাস গড়েছে অন্য ভাবে। সেটি প্রাণ বাঁচাতে আসা ও সমুদ্রে ভাসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের বঙ্গীয় উপকূলে উঠতে না দিয়ে। সে বর্বরতাটিও বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। এমন কি জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল মিষ্টার বান কি মুনও তাকে এরূপ নিষ্ঠুর আচরন পরিহারে আহবান জানিয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের প্রতি সদয় হতে বলেছিলেন। কিন্তু বিবেকহীন নিষ্ঠুরতাই যার রাজনীতির মূলমন্ত্র, তার কাছে কি মানবতা বা কারো সুপরামর্শ গুরুত্ব পায়? অবশ্য পরবর্তীতে হাসিনা আন্তর্জাতিক চাপে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়। এখন রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে খোদ বাংলাদেশীরা কদর্য ইতিহাস গড়ছে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও নানা দেশে চাকুরির সন্ধানে নেমে। মালয়েশিয়ার সরকারের দাবী, সমূদ্রে ভাসা উদ্বাস্তুদের শতকরা ৭০ ভাই বাংলাদেশী।(এ প্রবন্ধের লেখক নিজে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় এমন বাংলাদেশীদের দেখেছেন যারা নিজেরাই লেখককে বলেছে, রোহিঙ্গা পরিচয় দিয়ে তারা তুরস্কের সরকার থেকে নিয়মিত ভাতা নিচ্ছে এবং সে সাথে কারখানায় কাজও করছে।) অপর দিকে বিহারীদের সাথে কৃত নিষ্ঠুরতা কি কম? স্রেফ অবাঙালী হওয়ার কারণে প্রায় ৪ লক্ষ বিহারীকে তাদের ঘরবাড়ী ও দোকান-পাট থেকে নামিয়ে সেগুলির দখল করে নিয়েছে বাঙালীরা। অথচ ১৯৭১’য়ের পর ১০ লাখের বেশী বাঙালী আশ্রয় নিয়েছে এবং নানারূপ পেশায় নিয়োজিত রয়েছে পাকিস্তানের অবাঙালীদের মাঝে।

কোন দেশই দুয়েকজন নাগরিকের আত্মপচন, চুরিডাকাতি ও খুনখারাবীর কারণে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ে না। সেরূপ রেকর্ড গড়তে আত্মপচনটি মহামারি রূপে দেখা দেয়া জরুরি। তেমনি এক আত্মপচনের মহামারি ছেয়ে গেছে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে। ফলে দেশজুড়ে ভোট ডাকাতি, ব্যাংক ডাকাতি, শেয়ার মার্কেট লুট বা শাপলা চত্বরের ন্যায় নৃশংস গণহত্যাও তখন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। বিবেকের এ মহামারিতে চিকিৎসাতেও কোন আগ্রহ থাকে না। চোর-ডাকাতদের পাড়ায় চুরি-ডাকাতি, খুন-ধর্ষণ ও সন্ত্রাস নিয়ে তাই কখনো বিচার বসে না। তা নিয়ে কারো লজ্জাবোধও হয় না।বরং সে মহল্লায় পাপকর্মে যার অধীক সামর্থ্য তাকে নিয়ে গর্ব হয়; এবং উৎসবেরও আয়োজন হয়। জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরির উৎসব এবং বাংলা নববর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণে মহিলাদের কাপড় খুলে শ্লীলতাহানির উৎসবের পিছনে তো তেমনি এক অসুস্থ্য চেতনা কাজ করেছে। ধর্ষকদের কাছে প্রতিটি সফল ধর্ষণ এবং ডাকাতদের কাছে প্রতিটি সফল ডাকাতিতেই তো উৎসব। তাই যে দুর্বৃত্তপাড়ায় ধর্ষণ হয় বা ডাকাতি হয় সেখানে প্রচণ্ড উৎসবও হয়। ডাকাতিতে সফল নেতৃত্বের জন্য সর্দার বা সর্দারনীকে বিপুল সংবর্ধনাও দেয়া হয়। ২০১৮ সালে দেশ জুড়ে ভোটডাকাতির সফতার প্রেক্ষিতে প্রতিদিন উৎসব লেগে আছে বাংলাদেশের মন্ত্রীপাড়ায়, সরকারি দলের অফিসে, দলীয়কর্মীদের ঘরে ঘরে এবং সরকারি প্রশাসনে। এমন উৎসবমুখর মহলে ভোটডাকাতি, ব্যাংকডাকাতি, দুর্বৃত্তি, সন্ত্রাস, মানবপাচার, নারীপাচার, গভীর সমূদ্রে ভাসমান হাজার হাজার বাংলাদেশী ও জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গাদের প্রস্রাবপান নিয়ে তাদের মাঝে দুশ্চিন্তা থাকার কথা নয়। লজ্জা-শরম থাকারও কথা নয়। বরং যা হবার তাই হচ্ছে। সেটি ভোট-ডাকাতিতে সফল নেতৃত্ব দেয়ায় ও দলীয় নেতাকর্মীদের চুরিডাকাতির সুযোগ করে দেয়ায় হাসিনার বিপুল সংবর্ধনার। আত্মপচনের এর চেয়ে বড় আলামত আর কি হতে পারে?

রবীন্দ্র সাহিত্যে বিষভান্ডার
রবীন্দ্রসাহিত্যে হিন্দুদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রচুর উপকরণ থাকলেও বাঙালী মুসলিমদের জন্য তা ছিল এক বিশাল বিষভান্ডার। রবীন্দ্রনাথ যে কতটা মুসলিম বিরোধী ছিলেন সেটি কোন গোপন বিষয় নয়, নানা ভাবে তার প্রকাশ ঘটেছে। সে চেতনাটির প্রথম প্রকাশ ঘটে ১৯০৫ সালে। বিহার, বাংলা এবং আসাম নিয়ে তখন বৃহত্তর বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি প্রদেশ ছিল। ব্রিটিশ শাসকদের পক্ষে বিশাল এ প্রদেশের উপর প্রশাসনিক নজরদারী রাখা তখন কঠিন পড়ে। তাই নিজেদের প্রশাসনিক স্বার্থে তারা প্রদেশটিকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়, এবং ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে গঠন করে একটি নতুন প্রদেশ। এ নতুন প্রদেশের রাজধানি হয় ঢাকা।এ সিদ্ধান্তের পিছনে ব্রিটিশদের মনে কোনরূপ মুসলিমপ্রীতি কাজ করেনি, বরং কাজ করেছে সাম্রাজ্যবাদি স্বার্থ। কিন্তু হিন্দুরা বিষয়টিকে হিন্দু স্বার্থের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর রূপে গণ্য করে। পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিল দরিদ্র মুসলিম। পূর্ব বাংলার সম্পদে পশ্চিম বাংলার মানুষের উন্নতি ঘটলেও পূর্ব বাংলার মানুষের তাতে কোন পরিবর্তন ঘটেনি। পূর্ববাংলা ছিল কলকাতা কেন্দ্রীক কলকারখানার কাঁচা মালের প্রধানতম উৎস, কিন্তু তাদের উন্নয়নে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ১৯০৫ সালে নতুন প্রদেশ সৃষ্ট হওয়াতে পূর্ব বাংলার মুসলিমগণ শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অঙ্গণে কিছুটা উন্নয়নের মুখ দেখেছিল। কিন্তু সেটি গণ্য হয় বহু যুগ ধরে প্রতিষ্ঠিত বর্ণহিন্দুদের কায়েমি স্বার্থের উপর প্রচণ্ড আঘাত রূপে। তখন বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের অজুহাত খাঁড়া করে বর্ণ হিন্দুরা নতুন এ প্রদেশকে বাতিল কররা দাবীতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে আন্দোলনে সকল হিন্দু জমিদার, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা এক হয়ে যান। সেই সময় ভারতীয় কংগ্রেস শুরু করে স্বদেশী আন্দোলন। সে আন্দোলনে প্রয়োজন ছিল একজন জাতীয় হিন্দু নেতার মডেল। সে প্রয়োজন তারা ইতিহাস থেকে তুলে আনেন শিবাজীর ন্যায় ভারতের মুসলিম শাসনের কট্টোর বিরোধী ও সন্ত্রাসী শিবাজীকে। কংগ্রেসি নেতা বাল গঙ্গাধর তিলক শিবাজীকে ভারতীয় হিন্দু-জাতীয়তাবাদের জনক রূপে খাড়া করেন। তখন থেকেই রাজনীতির ময়দানে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গোড়াপত্তন। শিবাজীকে ভারতীয় হিন্দুদের জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ১৯০৪ সালে চালু করা হয় শিবাজী উৎসব। এর আগে ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় “গো-রক্ষিণী সভা”। এ সব আয়োজনের মাধ্যমে হিন্দু মুসলিমের মধ্যে তৈরি হয় সাম্প্রদায়িক হানাহানির পরিবেশ। ব্রিটিশ সরকার ১৮৯৭ সালে এর জন্য তিলককে গ্রেফতার করে। রবীন্দ্রনাথের সাম্প্রদায়িক চেতনা তখন আর গোপন থাকেনি। ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জনক তিলককে মুক্ত করতে তিনি তখন রাস্তায় নেমে পড়েন। তাকে মুক্ত করার জন্য অর্থ সংগ্রহে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতেও তিনি দ্বিধা করেননি। শুধু অর্থ ভিক্ষা নয়,তিলকের আবিষ্কৃত শিবাজীর পথকেই ভারতীয় হিন্দুদের মুক্তির পথ রূপে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি নিজে মেতে উঠেছিলেন শিবাজী বন্দনায়।
রবীন্দ্রনাথের নিজের একটি রাজনৈতিক দর্শন ছিল, ভারতীয় রাজনীতিতে সে দর্শন নিয়ে একটি প্রবল পক্ষ ছিল এবং সে পক্ষের সাথে রবীন্দ্রনাথের গভীর একাত্মতাও ছিল। সে রাজনৈতিক দর্শনের প্রবল প্রকাশ ঘটেছে তার লেখা কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও গানে। “শিবাজী উৎসব” কবিতাটি হলো রবীন্দ্রনাথের তেমনি এক রাজনৈতিক দর্শনের কবিতা। সে দর্শনটি ছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদের। রবীন্দ্রনাথকে বুঝবার জন্য তাঁর রচিত এ কবিতাটিই যথেষ্ট, কোন বৃহৎ গবেষণার প্রয়োজন নেই। এ কবিতাটিতে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর রাজনৈতিক ভাবনার পাশাপাশি তার পূজনীয় বীরের ছবি। বাঙালী হলেও রবীন্দ্রনাথ ভাবনাটি বাংলার আলো-বাতাস ও ভূগোল দিয়ে সীমিত ছিল না। তিনি ভাবতেন অখন্ড ভারত নিয়ে। অখন্ড ভারতের সে মানচিত্রে মুসলিমদের জন্য কোন স্থান ছিল না। রবীন্দ্রনাথের পিতা ও পিতামহ ব্রাহ্মধর্মের অনুসারি হলেও রবীন্দ্রনাথ স্বপ্ন দেখতেন একজন গোঁড়া হিন্দু রূপে। তার স্বপ্নটি ছিল সমগ্র ভারতজুড়ে হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার। সে হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে যিনি বীর রূপে যিনি গণ্য হয়েছেন তিনিও বাঙালী নন, বরং সূদুর মহারাষ্ট্রের অবাঙালী শিবাজী। “শিবাজী-উৎসব” কবিতাটিতে প্রকাশ পেয়েছে শিবাজীর সে রাজনৈতিক মিশনের সাথে রবীন্দ্রনাথের একাত্মতা। শিবাজীকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেন:

মারাঠার কোন শৈলে অরণ্যের অন্ধকারে ব’সে,
হে রাজা শিবাজী,
তব ভাল উদ্ভাসিয়া এ ভাবনা তড়িৎপ্রভাবৎ
এসেছিল নামি-
“এক ধর্মরাজ্য পাশে খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত
বেধে দিব আমি।”

“খণ্ড চ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত” ভারতকে আবার এক অখণ্ড হিন্দু ধর্মরাজ্য রূপে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন শিবাজী দেখেছিল সেটিই ছিল রবীন্দ্রনাথের নিজের স্বপ্ন। সে অভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে রবীন্দ্রনাথ আর শিবাজীর চেতনা একাকার হয়ে গেছে। এখানেই রবীন্দ্রনাথ দাড়িয়েছেন শিবাজীর ন্যায় ইসলাম ও মুসলিমের প্রতিপক্ষ রূপে। ভারত জুড়ে তখন মোগলদের শাসন। হিন্দু ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিবাজী বেছে নেয় মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসের পথ। শিবাজীর মুসলিম শাসনবিরোধী সে বিদ্রোহ ও সন্ত্রাস শতাধিক বছর পূর্বে হলেও রবীন্দ্রনাথের মনে তা নিয়ে উৎসব মুখর হয়ে উঠে। “শিবাজী-উৎসব” কবিতায় তো সেটিরই প্রকাশ ঘটেছে। রবীন্দ্র সাহিত্যে এভাবেই মুসলিম বিরোধী নাশকতার শুরু। রবীন্দ্রনাথের মাঝে এ নিয়ে প্রচণ্ড দুঃখবোধ ছিল যে, বাঙালীগণ সে সময় শিবাজীকে চিনতে পারিনি এবং তার স্বপ্ন ও সন্ত্রাসের সাথে একাত্ম হতে পারিনি। রবীন্দ্রনাথ তার কবিতাটিতে বাঙালী বলতে যাদের বুঝিয়েছেন সেখান বাংলাভাষী মুসলিমদের কোন স্থান ছিল না। বাঙালী বলতে তিনি একমাত্র হিন্দুদেরই বুঝিয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র তার লেখায় “আমাদের পাড়ায় বাঙালী ও মুসলিমদের খেলা” যে বাঙালীদের বুঝিয়েছিলেন সে বাঙালীদের মাঝেও বাঙালী মুসলিমদের জন্য কোন স্থান ছিল না।

বাঙালী মুসলিমের বিষপান

রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন। অখণ্ড ভারত জুড়ে শিবাজীর ন্যায় তার মনেও হিন্দুধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠায় প্রচণ্ড আগ্রহ জাগবে -তাতেই বা দোষের কি? হিন্দু মন্দির গড়বে, হিন্দু ধর্মরাজ্য গড়বে সেটিই তো স্বাভাবিক। বাঙালী ও মুসলিমদের মাঝে চেতনার পরিচয়ে যে বিভাজন রেখা টানবেন –তাতেই বা অপরাধ কি? মানুষে মানুষে বিভাজন তো গড়ে উঠে ধর্ম, সংস্কৃতি ও চেতনার সে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে। সে ভিন্ন পরিচয় নিয়ে বাঙালী হিন্দু ও মুসলিমগণ যে সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন ধারার এবং তাদের মাঝে মিলন যে অসম্ভব –সেটি রবীন্দ্রভক্ত বাঙালী মুসলিমগণ না বুঝলেও রবীন্দ্রনাথ বুঝতেন। ফলে রবীন্দ্রনাথ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় হিন্দুত্বের সে ধারায় গিয়ে মিশে গেছেন। যে কোন মিশনারীর ন্যায় রবীন্দ্রনাথও চাইতেন অন্যরাও তার সে হিন্দুত্বের ধারায় মিশে যাক। হিন্দুত্বের সে ধারাটিতে রয়েছে ভারতের বুকে মুসলিম প্রভাবের বিলুপ্তির প্রবল ব্যগ্রতা। রয়েছে হিন্দু ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠায় আপোষহীনতা। এমন রবীন্দ্রনাথের ন্যায় এমন এক উগ্র হিন্দুর সাহিত্যকে আপন রূপে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে এখানেই মুসলিমদের মূল সমস্যা। হিন্দুধর্ম রাজ্যের এমন এক উগ্র ধ্বজাধারীকে একজন মুসলিম তার নিজ চেতনার প্রতিনিধি রূপে গ্রহণ করে কি করে? তার লেখা গান ও কবিতাই একজন মুসলিম গায় কি করে? এটি তো বিষপান। তার জন্ম দিনে উৎসবই বা করে কি করে? ইসলাম ও মুসলিমদের সাথে রবীন্দ্রভক্ত বাংলাদেশীদের এখানেই বড় গাদ্দারী। এ গাদ্দারগণই মুসলিম চেতনায় লাগাতর বিষ ঢালছে।

স্বপ্নটি হিন্দু ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠার
শিবাজী মারা গেছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার দর্শন ও রাজনৈতিক অভিলাষটি মারা পড়েনি। ভারতে সে চেতনাটি বেঁচে আছে শিবসেনা, আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজিপি) ন্যায় বিভিন্ন উগ্র হিন্দুবাদি দলগুলোর মাঝে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও যে ভূগোলের স্বপ্নটি দেখতেন সেটি অবিভক্ত বাংলার নয়। সেটি অখণ্ড হিন্দু ধর্মরাজ্য ভারতের। নিজের জীবদ্দশাতে রবীন্দ্রনাত সে হিন্দু ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকারটি দেখতে পেয়েছিলেন বাল গঙ্গাধর তিলকের রাজনীতিতে। তিলক তার কাছে গণ্য হয়েছিল শিবাজী’র মিশনকে এগিয়ে নেয়ার রাজনীতিতে আদর্শ নেতা রূপে। শিবাজী সে মিশনকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থেই তিলক নিজ রাজ্য মহারাষ্ট্রে শিবাজী উৎসবের শুরু করেন। সে উৎসবের সাথে একাত্মতার ঘোষণা দিতে বাঙালী কংগ্রেস নেতা সুরেন্দ্রনাথ বানার্জি ছুটে যান বোম্বাইয়ে। মারাঠীদের ন্যায় কলকাতার বাঙালী হিন্দুদের উদ্যোগে শিবাজী উৎসব শুরু হয় বাঙলার বুকেও।
শিবাজী তার হিন্দু ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠার যুদ্ধটি শুরু করে মোগল সম্রাট আরোঙ্গজেবের সময়। কিন্তু সে প্রচেষ্ঠা ব্যর্থ হয়। বাংলার মানুষই শুধু নয়, ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরাও শিবাজীর সে আন্দলনে সারা দেয়নি। শিবাজীর মিশনটিকে চিনতে বাঙালীর সে ব্যর্থতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মনে প্রচণ্ড আফসোস ছিল। কিন্তু এবারে তার মনে গভীর আনন্দ।এবং মনের সে বিপুল আনন্দ নিয়েই রবীন্দ্রনাথের শিবাজী উৎসব কবিতা। সেটি একারণে যে, বাঙালীরা শিবাজীকে চিনতে পেরেছে এবং তার দর্শন নিয়ে মারাঠীদের সাথে মিলে উৎসব শুরু হয়েছে। তবে বাঙালীদের থেকে রবীন্দ্রনাথের চাওয়াটি আরেকটু গভীর। তিনি চান, বাঙালীগণ আবির্ভূত হোক হিন্দু ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার সৈনিক রূপে। রবীন্দ্রনাথ এখানে আবির্ভূত হয়েছেন স্রেফ কবি হিসাবে নয়, বরং হিন্দু ধর্মরাজ্যে স্বপ্নদ্রষ্টা ও রাজনৈতিক নেতা রূপে। তাই তিনি লিখেছেন,

“মারাঠার প্রান্ত হতে একদিন তুমি ধর্মরাজ,
ডেকেছিলে যবে
রাজা ব’লে জানি নাই, মানি নাই, পাই নাই লাজ
হে ভৈরব রবে।
তোমারে চিনেছি আজি, চিনেছি চিনেছি হে রাজন,
তুমি মহারাজ।
তব রাজকর লয়ে আট কোটি বঙ্গের নন্দন
দাঁড়াইবে আজ।

বাল গঙ্গাধর তিলকের নেতৃত্বে হিন্দু ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলনটি রবীন্দ্রনাথের মনে যে কীরূপ উম্মাদনা সৃষ্টি করে সেটিই প্রকাশ পায় শিবাজী-উৎসব কবিতায়। মনের মাধুরি মিশিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

“সেদিন শুনিনি কথা
আজি মোরা তোমার আদেশ
শির পাতি লব,
কণ্ঠে কণ্ঠে বক্ষে বক্ষে
ভারতে মিলিবে সর্বশেষ ধ্যান-মন্ত্র তব।
ধ্বজা ধরি উড়াইব বৈরাগীর উত্তরী বসন
দরিদ্রের বল,
এক ধর্ম রাজ্য হবে এ ভারতে
এ মহাবচন করব সম্বল।
মারাঠির সাথে আজি,হে বাঙ্গালী
এক কণ্ঠে বল ‘জয়তু শিবাজী।
মারাঠির সাথে আজি,হে বাঙ্গালি,
এক সঙ্গে চলো মহোৎসবে সাজি।
আজি এক সভা তলে
ভারতের পশ্চিম পুরব দক্ষিণ ও বামে
একত্রে করুক ভোগ এক সাথে একটি গৌরব
এক পুণ্য নামে।

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories