সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কুয়ালালামপুরে সাঁড়াশি অভিযান, বাংলাদেশিসহ ২০০ অভিবাসী আটক নিউইয়র্কে অপহরণ ও নির্যাতনের দায়ে বাংলাদেশি নারী দোষী সাব্যস্ত বিশ্বকাপ চলাকালে স্টেডিয়ামের আশপাশ থেকে ৬০০টির বেশি ড্রোন জব্দ করেছে এফবিআই ২৯০ কিমি বেগে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানলো সুপার টাইফুন ‘বাভি’ ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃত বেড়ে ৩৩৪২, চলছে উদ্ধার অভিযান সব নাগরিককে ডিজিটাল সেবার আওতায় আনতে হবে : অর্থমন্ত্রী ন্যাশনাল ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেন জাহিদুল হক নোয়াখালীতে ইসলামী ব্যাংকের এসএমই উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ সমাপ্ত আজ রোনালদোর অগ্নিপরীক্ষা, চ্যালেঞ্জ স্পেনের টিকিটাকা নরওয়ের বিপক্ষে পেনাল্টিসিদ্ধান্ত আমার নয়, কোচের ছিল: ভিনিসিয়ুস

গাজীপুরের বেলাই বিল : প্রকৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবিকার অনন্য এক জলাশয়

মৃণাল চৌধুরী সৈকত
  • আপলোডের সময় : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৮ বার

ভোরের আলো ফুটতেই লাল-সাদা-গোলাপূ রংয়ের শাপলায় ঢেকে যায় বিলের বুক। মৃদু বাতাসে দুলতে থাকা শাপলার ফাঁকে ভেসে চলে ছোট ছোট নৌকা। কোথাও জেলে জাল ফেলছেন, কোথাও কৃষক নৌকা বেয়ে যাচ্ছেন নিজের জমিতে। আবার বিকেলে সূর্যের সোনালি আভা জলে মিশে তৈরি করে এক মায়াবী দৃশ্য। প্রকৃতি যেন প্রতিদিন নতুন করে সাজায় গাজীপুরের বেলাই ঐতিহ্যবাহী বিলকে।
গাজীপুর সদর উপজেলার খুদে বর্মী, দিগধা, বলধা, পাড়াগাঁও, কেশোরীতা, আতুড়ি, বাড়িয়া ও রেওলা গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে বেলাই বিল। বর্ষা এলেই এই জলাভূমি যেন প্রাণ ফিরে পায়। বাহারী ধরনের মাছ, শাপলা, নৌকা ও সবুজে ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশ মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে গাজীপুরের অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান।
প্রচলিত আছে, প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে এই বিলটির নামকরণ হয় বেলাই বিল। বলা হয়, পড়ন্ত বেলায় সূর্যাস্তের রঙিন আলো যখন বিলের জলে প্রতিফলিত হয়ে অপূর্ব এক দৃশ্যের জন্ম দিত, তখন সেই দৃশ্যের অনুপ্রেরণাতেই এর নাম রাখা হয় ‘বেলাই বিল’।
ইতিহাসও জড়িয়ে আছে এই জলাভূমির সঙ্গে। জনশ্রুতি রয়েছে, ভাওয়াল রাজা রমেন্দ্র নারায়ন রায় এবং গাজী বংশের জমিদাররা এখানে নৌকা বাইচের আয়োজন করতেন। মাছ শিকার ছিল তাদের অন্যতম বিনোদন। প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বভাব কবি গোবিন্দ চন্দ্র দাস মহাশয় এবি বেলাই বিলের পাড়ে বসে বহু বিকেল কাটিয়েছেন। প্রকৃতির সান্নিধ্যেই লিখেছেন অনেক কবিতা।
গাজীপুর শহরের পূর্ব দিক থেকে ভাওয়াল রাজবাড়ি, নুরুন, জাঙ্গালিয়া, বক্তারপুর, মরাশ, আওড়াখালী ও আজমতপুর এলাকা পেরিয়ে আঁকাবাঁকা পথে বিস্তৃত হয়েছে এই বিল। এক সময় বেলাই বিলে প্রবল স্রোত ছিল। সময়ের পরিবর্তনে সেই স্রোত আজ অনেকটাই ক্ষীণ হলেও বিলের প্রাণচাঞ্চল্য কমেনি।
বর্ষাকালে বেলাই বিল মিঠা পানির দেশীয় মাছের অন্যতম আধার। রুই, কাতলা, শিং, মাগুর, টেংরা, কৈসহ নানা প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে এখানে। বিলপাড়ের বহু পরিবার মাছ ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
বাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান খান জানান, বর্ষা মৌসুমে এই বিলাই বিল অসংখ্য মানুষের আয়ের প্রধান অবলম্বন। একই গ্রামের জিন্নাত আলী বলেন, সুস্বাদু দেশীয় মাছের টানে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসেন।
শুধু মাছ নয়, বেলাই বিলের আরেকটি বড় আকর্ষণ লাল-সাদা-গোলাপী রংয়ের শাপলা ফুলের সমারোহ। বর্ষার সময় বিলের বিশাল অংশজুড়ে ফুটে থাকা শাপলা যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত চিত্রপট। এই সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই আসেন প্রকৃতি প্রেমী, ভ্রমণ পিপাসু ও আলোকচিত্র শিল্পীরা। ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হয় বিলের নৈসর্গিক রূপ।
বিলের বুকে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট দ্বীপের মতো গ্রামগুলোও এই অঞ্চলের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রায় প্রতিটি পরিবারেই রয়েছে নিজস্ব নৌকা। নৌকা তাদের চলাচলের প্রধান মাধ্যম। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নৌকার আনাগোনায় মুখর থাকে পুরো বেলাই বিল।
বেলাই বিলের আশাপাশের মানুষের জীবনে রয়েছে প্রকৃতির প্রতি গভীর মমত্ববোধ। বর্ষাকালে তারা সচেতন ভাবেই পোনা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকেন, যাতে মাছের বংশ বিস্তার অব্যাহত থাকে। পরে পানি কমে এলে উৎসবমুখর পরিবেশে সবাই মিলে মাছ ধরেন। এই ঐতিহ্য যুগযুগ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে আসছে।
শুকনো মৌসুমে পানি সরে গেলে বিলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে শুরু হয় বোরো ধানের আবাদ। সবুজ ধানের মাঠে ফিরে আসে কৃষকের ব্যস্ততা। পাড়াগাঁও গ্রামের শিক্ষক শামসুল আলম শিবলী জানান, ধান কাটার মৌসুমে স্থানীয় কৃষকেরা কাজের ফাঁকে পুঁথি পাঠের আসর বসান। গ্রামীণ সংস্কৃতির এই ঐতিহ্য আজও এলাকাবাসীর কাছে সমান ভাবে লালিত।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ জীব-বৈচিত্র্য, ইতিহাস, লোককথা ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার অনন্য সমন্বয়ে বেলাই বিল শুধু একটি জলাশয় নয়; এটি গাজীপুরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে বেলাই বিল ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় প্রকৃতি ও ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories