রাজধানীসহ গাজীপুর জুড়ে অলিগলি সড়ক মহা-সড়কের ব্যাপক উন্নয়ণ কর্মকান্ড আর দখলকৃত ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযান কার্যক্রম চলমান এবং উড়াল সেতু, ফ্লাইওভার ব্রিজ নির্মাণের পরও মহানগরগুলোর একটি বড় অংশজুড়ে প্রতিদিন যানজট লেগেই থাকে। এ যানজটে ১০ মিনিটের পথ তিন ঘণ্টায় অতিক্রম করাও কঠিন হয়ে ওঠে। রাজধানী ঢাকা বা গাজীপুর মহানগরে এ যানজট প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জন্য শুধু নয়, দেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, রাজধানীসহ আশপাশের শহরে যানজটে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা, বছরে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। যানজট যে রাজধানী ও গাজীপুরবাসী বা মোটা দাগে দেশবাসীর জন্য কতটা অভিশাপ হয়ে উঠেছে প্রতিদিন অন্তত ৫০ কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার বিষয়টিতে তা স্পষ্ট হয়। যানজট নিরসনে আরো বেশী বেশী একের পর এক ফ্লাইওভার নির্মাণের চেয়েও ট্রাফিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সরকারকে বেশি নজর দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে রাজধানীজুড়ে ফ্লাইওভারের জাল বুনলেও কোনো কাজ হবে না। তাছাড়া যানবাহন চালকদের অদক্ষতা বিরুপ আচরণ যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ বলে দাবী বোদ্ধা মহলের। তাছাড়া ফুটপাথ দখল করে দোকানপাট বসিয়ে চাঁদাবাজি, যেখানে সেখানে গাড়ি পার্কিং, যাত্রীবাহী যানবাহনের স্টেশন বসানাে যানজটের প্রধান অন্তরায়। রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কতিপয় নামধারী নেতারা যানজটের জন্য অনেকাংশে দায়ী। ফুটপাথ দখল করে যেসব দোকানপাট বসে তার প্রতিটি থেকে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা নির্ভিগ্নে চাঁদা আদায় করে আর এ চাঁদার একটা বিশাল অংশ যায় আইনশৃংখলা বাহিনীর কতিপয় সদস্যদের পকেটে। যানজট নিরসনে প্রাইভেট গাড়ি চলাচলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও জরুরি। তবে সবকিছুর আগে সরকার বা আইনশৃংখলা বাহিনীর সদিচ্ছা থাকার বিকল্প নাই। বাস-ট্রাক মালিকদের সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশের গোপন সমঝোতা বন্ধও যানজট নিরসনের জন্য জরুরি।
সামনে দিন যতই এগিয়ে আসছে জটিলতাও ততই প্রকট হচ্ছে। এই যানজটে একদিকে যেমন অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ অর্থনেতিক ক্ষতিও হচ্ছে। ক্ষতি হচ্ছে স্বাস্থ্য এবং মানসিক অবস্থারর। রাজধানীসহ গাজীপুর ঘুরে দেখা গেছে, ছোট ছোট সড়কে রিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেল, ইজিবাই, অটোরিকশা, লেগুনা, সিএনজি চালকদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার কারণে যত্রতত্র যানজটের ঘটনা নিত্যদিনের। সঙ্গে প্রধান প্রধান সড়কে অতিমাত্রায় স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠানো-নামানোর ফলে রাস্তায় সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। ওইসব যানজটের প্রভাব ছোট ছোট সড়কে পড়ায় রাজধানীতে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। ফলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগর-মহানগরবাসীকে। কিছু মহল মনে করে, ঢাকা গাজীপুরের যানজট শুধুমাত্র যানবাহন চলাচলে বিশৃঙ্খলা বা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের অব্যবস্থাপনার ফল নয়। যানজটের আরো কয়েকটি বড় কারণ আছে। প্রথমত, এ দুটি জনবহুল বিশাল শহরে প্রায় আড়াই কোটি মানুষের এই মহানগরে সড়কের তুলনায় যানবাহনের যে প্রাচুর্য সৃষ্টি হয়েছে, তা একেবারেই অস্বাভাবিক। বিদ্যমান সড়ক ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ কতসংখ্যক যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলাচল করতে পারে, তা বিবেচনায় না নিয়ে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে তীব্র যানবাহন নিবন্ধন করা হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। ঢাকার রাজধানী এবং গাজীপুরে তীব্র যানজটের আরেকটি কারণ হচ্ছে, বিভিন্ন সড়কে রোড ডিভাইডেশনের কাজগুলো একসঙ্গে সচল রাখা। ফলে প্রতিদিন অফিসের বেঁধে দেওয়া সময়ে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এভাবে চলতে থাকলে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক । অন্যদিকে দীর্ঘ যানজটে বসে থাকায় মানসিক ভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ।
কিন্তু এটাও শেষ পরিণতি নয়। কারণ, যানজট ক্রমেই আরো বেড়ে চলেছে এবং সামনের দিনগুলোতে স্পষ্টতই আরো বাড়বে। ভবিষ্যতে কি যানজট বৃদ্ধি থেমে যাবে নাকি আরো কয়েকগুন বৃদ্ধি পাবে, তা এ মুহূর্তে বলা অসম্ভব।
যানজট নিয়ন্ত্রণ কমাতে চাইলে প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে ঢাকা এবং গাজীপুর মহানগরের মোট কতসংখ্যক যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে, পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সরিয়ে নেওয়া। দ্বিতীয়ত ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে বড় আকারের বাসের সংখ্যা বাড়ানোর নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
অপরদিকে ঢাকা এবং গাজীপুর মহানগরের মোট সড়কের প্রায় ৪৫/৫০ শতাংশ জুড়েই চলাচল করে ব্যক্তিগত গাড়ি, অথচ এগুলো বহন করে মাত্র ১২ শতাংশ যাত্রী। কিন্তু ৫০ শতাংশ বড় বাসে প্রায় ৮৮ শতাংশ যাত্রী পরিবহন সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলেন, উন্নত মানের ফ্র্যাঞ্চাইজভিত্তিক বাস সেবা চালু করাই আমাদের সর্বোত্তম বিকল্প। এ ছাড়া যা করা দরকার, তা হলো ফুটপাতগুলোকে হাঁটাচলার উপযোগী করা এবং সড়কের দু-পাশে যানবাহন পার্কিং, স্টেশন, দোকানপাট পুরোপুরি বন্ধ বা উচ্ছেদ করা একান্ত জরুরী।
Leave a Reply