যুক্তরাষ্ট্রে লেবার ডে ছুটির পর আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। নির্বাচনের আর মাত্র দুই মাস বাকি। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় রেকর্ড ধস নেমেছে। এতে কংগ্রেসে সামান্য ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা রিপাবলিকানদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন মূলত প্রেসিডেন্টের কার্যক্রমের ওপর একধরনের গণভোট। গত এক দশক ধরে মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রে থাকা ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি প্রযোজ্য। তাই মেয়াদের শেষ দুই বছরে তাঁকে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হতে পারে।
নির্বাচনী পূর্বাভাস বলছে, প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। তেমনটি হলে দলটি ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড তদন্তের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি যেকোনো আইন পাসে হোয়াইট হাউসকে সমঝোতায় বাধ্য করতে পারবে। ডেমোক্র্যাটিক নেতারা ইতিমধ্যে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সেখানে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্পের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের নিয়োগ আটকে দিতে পারবেন। প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টের কোনো শূন্য আসনেও প্রেসিডেন্টের মনোনীত প্রার্থীর নিয়োগ ঠেকাতে পারবেন তাঁরা।
রয়টার্স ও ইপসোসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এর পেছনে মূল কারণ ইরান যুদ্ধ এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ। ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের তুলনায় ট্রাম্পের প্রতি অনাস্থার হার এখন প্রায় দ্বিগুণ। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কম থাকায় ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে অতিরিক্ত ৪০টি আসন জিতেছিল।
জরিপে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের সমর্থন রিপাবলিকানদের চেয়ে ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। সাম্প্রতিক প্রাইমারি ও বিশেষ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতিও তাঁদের পক্ষে উদ্দীপনার প্রমাণ দেয়। ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানও ডেমোক্র্যাটদের অনুকূলে, কারণ ১৯৩৮ সালের পর প্রায় প্রতিটি মধ্যবর্তী নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারিয়েছে।
তবে ডেমোক্র্যাটদের সামনেও চ্যালেঞ্জ আছে। দলের ভেতরে মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীল শিবিরের দ্বন্দ্বে বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে প্রগতিশীলরা জিতেছেন। এতে দলের নেতৃত্ব, বার্তা ও ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রিপাবলিকানদেরও কিছু কাঠামোগত সুবিধা আছে। প্রতিনিধি পরিষদে তারা এখন ২১৮-২১৪ আসনে সামান্য এগিয়ে। সাম্প্রতিক সংসদীয় সীমানা পুনর্নির্ধারণের লড়াইয়ে জিতে দলটি নির্বাচনী মানচিত্রের সুবিধায় বাড়তি ১০টি আসন পেতে পারে। আগামী ৩ নভেম্বর প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি এবং সিনেটের ১০০টি আসনের এক-তৃতীয়াংশে ভোট হবে।
সিনেটের নির্বাচনী মানচিত্রও ডেমোক্র্যাটদের জন্য কঠিন। জর্জিয়া, মেইন, মিশিগান ও নর্থ ক্যারোলাইনার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে জিতলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে তাঁদের আলাস্কা, আইওয়া, ওহাইও ও টেক্সাসের মধ্যে অন্তত দুটি অঙ্গরাজ্যে জিততে হবে।
প্রচারণার তহবিলে এগিয়ে রিপাবলিকান সমর্থিত সুপার প্যাকগুলো। ট্রাম্পের নিজস্ব সুপার প্যাকেই জমা আছে ৪০ কোটি (৪০০ মিলিয়ন) ডলার। রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের ‘সমাজতন্ত্রী’ ও ‘কমিউনিস্ট’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন এই লড়াইকে ‘সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বনাম পাগলামির লড়াই’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তবে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মুখে এসব রাজনৈতিক আক্রমণ কতটা কাজে দেবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। আইওয়ার কৃষকরা জ্বালানি খরচ ও শুল্কনীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। টেক্সাসের গবাদিপশু খামারিরা বিদেশি গরুর মাংস আমদানিতে কর প্রত্যাহারে ক্ষুব্ধ। কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যিক উত্তেজনায় চাপে পড়েছে মিশিগান ও মেইনের অর্থনীতি।
অথচ কৃষকরাই ট্রাম্পের ভোটারদের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই এই অংশের সমর্থকদের চাঙ্গা করতে রিপাবলিকানরা চলতি সপ্তাহে ব্যতিক্রমী এক মধ্যবর্তী দলীয় সম্মেলন আয়োজন করছে। তবে সম্মেলনে শুধু ট্রাম্পকেন্দ্রিক বক্তব্য থাকলে তা দুর্বল আসনের রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের বাকি মাত্র ৮ সপ্তাহ। এত অল্প সময়ে অর্থনীতি নিয়ে মানুষের নেতিবাচক মনোভাব বদলানো রিপাবলিকানদের জন্য প্রায় অসম্ভব।
ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার সেন্টার ফর পলিটিক্সের নির্বাচন বিশেষজ্ঞ কাইল কনডিক প্রশ্ন তোলেন, রিপাবলিকানরা কি তাদের সমর্থকদের মধ্যে উদ্দীপনা আরেকটু বাড়াতে পারবে। তিনি আরও বলেন, এর উল্টো দিকটি হলো-পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আর নেই এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার এই পতন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। তাঁর মতে, এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটিই।
Leave a Reply