শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:১১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির দায়িত্ব নিলেন আইরিন খান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৪০ কিলোমিটার যানজট গাজীপুরের কালীগঞ্জে জামাইয়ের হাতে শশুর খুন লক্ষ্মীপুরে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংবর্ধনা দুধ দিয়ে গোসল করে প্রেমকে বিদায় জানালেন জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার তারিকুল ইসলাম সবকিছু বিবেচনা করে মক্কা চুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার: আইনমন্ত্রী স্বপ্ন ছুঁতে গিয়ে কফিনে ফিরলো নওগাঁর আত্রাইয়ের সাত প্রবাসী আশুলিয়ায় ভুয়া পত্রিকার আড়ালে নকল কনডমের কারখানা, জব্দ ২ কোটি টাকার পণ্য দেশের বাজারে আবারও কমলো সোনার দাম শেষ হয়ে আসছে মার্কিন অস্ত্রের মজুত, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ

স্বপ্ন ছুঁতে গিয়ে কফিনে ফিরলো নওগাঁর আত্রাইয়ের সাত প্রবাসী

নওগাঁ প্রতিনিধি
  • আপলোডের সময় : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার

ঘটনা ঘটছে কতদিন হয়া গেল, আর লাশ পাঠাইলো আজকা! এতগুলো দিন আমি ঘুমাইতে পারি নাই। আগুনে আমার ছেলে দুটাকে একবারে কয়লা বানায়া দিছে। নিজের চোখটারে বিশ্বাস করতে পারতেছি না যে, এরা আমার সেই সোনা বাজান। আল্লাহ, তুমি আমারে এত বড় কষ্ট কেন দিলা?
এসব কথা বলে আহাজারি করছিলেন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গণ্ডগোহালী গ্রামের ময়না খাতুন। তাঁর দুই ছেলে সুমন ও মোহন সৌদি আরবে সোফা কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যায়। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বাড়িতে তাদের মরদেহ পৌঁছালে কথাগুলো বলেন তিনি।
গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া নয়জনের মরদেহ বৃহস্পতিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে। এর মধ্যে সাতজনের বাড়িই নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রশাসনের সহায়তায় রাত দেড়টার দিকে তাাের মরদেহ আত্রাইয়ে পৌঁছায়। পরে শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় উপজেলার মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজ মাঠে একসঙ্গে সাতজনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজা শেষে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলে নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান স্বজনরা। জানাজায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, নওগাঁর জেলা প্রশাসক, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।
নওগাঁর ৭জন হলেন: আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দীনের ছেলে মো. ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামানিক, একই গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন আলী ও সুমন আলী এবং বজলুর রহমানের ছেলে কলিমুদ্দিন, ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদারের ছেলে সোহেল রানা এবং উপজেলার পারকাসুন্দা গ্রামের তমেজ উদ্দিন সরদারের ছেলে আব্দুল জলিল সরদার।
গণ্ডগোহালী, উদনপৈ ও ডুবাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামগুলোর সড়কে ঢুকতেই কান্নার রোল পড়ে যায় চারদিকে। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স দেখে আর্তনাদে ভেঙে পড়েন স্বজনরা। কেউ দুই হাত তুলে সন্তানের বেহেশত কামনা করছিলেন, কেউ আবার শেষবারের মতো সন্তানের নাম ধরে ডাকছিলেন। প্রিয় মানুষের মরদেহ ফিরে পেলেও স্বজনদের মধ্যে ছিল না কোনো স্বস্তি। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন মরদেহের দিকে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হলেও শেষ দেখাটা যে এমন হবে, তা মেনে নিতে পারছিলেন না কেউ।
মাঝে মাঝে কান্না থামিয়ে দুই ছেলের সঙ্গে কথোপকথন তুলে ধরে ময়না খাতুন বলেন, আমার ছেলে দুটো বলতো, ‘মা আর কয়েকদিন পরেই দেশে ফিরবে। দেশে এসে বাড়ির কাজ শেষ করবো। তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে সুখে থাকবো। আমার দুনিয়া থেকে সবকিছুই চলে গেল। আমার আর কিছু থাকলে না। আমার স্বামীও প্রতিবন্ধী। তাকে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবো, বুঝতে পারছি না। সরকারের কাছে অনুরোধ, সরকার যেন আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়।
গণ্ডগোহালী গ্রামের নিহত কলিমউদ্দিনের বাবা বজলুর রহমান বলেন, ‘বিদেশে গেল আমাগো ভাগ্যের চাকা ঘুরাইতে, আর আমরা পাইলাম ওর লাশ! কয়দিন পর পর শুনি আগুনে কতে মা-বাপের কোল খালি হয়। ওখানকার ফ্যাক্টরিতে কোনো নিরাপত্তা আছিল না কেন? আমার ছেলের মতো আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন খালি না হয়।
গণ্ডগোহালী গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, এর আগে এতেগুলো মরদেহ কখনো দেখিনি। এ ঘটনার পর থেকেই আমাদের গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যে ছেলেগুলো মারা গেল, তারা সবাই পরিবারের উপার্জনের একমাত্র উৎস ছিল। তাদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো আর্থিকভাবেও ভেঙে পড়েছে।
উদনপৈ গ্রামের নিহত ফরিদের মা সাফিয়া খাতুন বলেন, ‘ছেলেটাই আছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। পেটের টানেই তোরে পাঠাইছিলাম দেশের বাইরে। আগুনে সব শেষ হয়া গেল রে! এখন আমি এই সংসার নিয়া কই যামু? আমার বুকের মানিকরে তো আর কেউ ফিরায়া দিতে পারবো না।
ডুবাই গ্রামের সোহেল রানার বাবা বাদল তরফদার বলেন, ‘একটা সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় দেশের বাইরে পাঠায়ছিলাম। এখন আমার তো আর কেউ নাই রে বাবা! তোরে বুকে ধইরা কষ্ট কইরা মানুষ করছিলাম। তুই ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার আর কে আছিল? আমার বুড়া বয়সের লাঠিটারে কে কাইড়া নিলো রে আল্লাহ।’
এদিকে, ১২জনের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত না হওযায় তাঁদের মরদেহ কবে দেশে ফিরবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন স্বজনরা। আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালী গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল বিবি চোখ মুছতে মুছতে বলেন, কতোদিন ধইরা ছেলের মুখটা দেখার জন্য ব্যাকুল হইয়া আছি। হামার ছাওয়ালের লাশ নাকি শনাক্ত হয়নি, এ জন্য পরে আসবে। শেষবার একটু ছোঁয়াও পাবো না? সরকারের কাছে আবদার, হামার ছেলের লাশ য্যান দ্রুত নিয়ে আসে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘একসঙ্গে নওগাঁর ১২ জন বাসিন্দা সৌদিতে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর ঘটনা খুবই দুঃখজনক। সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও তাদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। এসব সহযোগিতা নিহতদের পরিবারে পৌঁছে দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, অন্যদের মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলমান। ডিএনএ মিললেই দ্রুত তাঁদের মরদেহ দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories