গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৪০ নং ওয়ার্ডের পুবাইল থানাধীন মেঘডুবি মধ্যপাড়া ও চামুড্ডা বাজার এলাকায় কয়েকটি কালি কারখানার কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আবাসিক ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি এসব কারখানা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া ও বর্জ্যের কারণে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, চামুড্ডা বাজার ও মেঘডুবি মধ্যপাড়া এলাকায় বেশ কয়েকটি কালি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয়ভাবে “মজিদ মিয়ার টাইগার কালি ফ্যাক্টরি” এবং তপন দাদা কালি ফ্যাক্টরি” নামে পরিচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের কোন কোনটি কখনো মেঘডুবি, কখনো চামুড্ডা বাজারের ঠিকানা ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে।
সরেজমিনে কয়েকটি কারখানার প্রবেশপথে প্রতিষ্ঠানের নাম, মালিকানা, যোগাযোগের তথ্যসহ দৃশ্যমান সাইনবোর্ড পাওয়া যায়নি। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচয় ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য নেই কারো কাছে্।
কারখানাগুলোর দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে প্রতিষ্ঠানের নাম, মালিকানা, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত অনুমোদন, ট্রেড লাইসেন্স, কারখানা লাইসেন্স, ভ্যাট নিবন্ধনসহ প্রয়োজনীয় সরকারি নথিপত্র দেখতে চাইলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নথিপত্র দেখাতে পারেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারখানাগুলোর কয়েকজন জানান, মালিক বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তা উপস্থিত না থাকায় তারা এসব বিষয়ে বক্তব্য দিতে পারবেন না।
পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অনেকেই ফোন রিসিভ করেননি। কেউ কেউ জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান “সিস্টেম অনুযায়ী” পরিচালিত হচ্ছে। তবে কোন সরকারি অনুমোদন বা নির্দিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় কারখানাগুলো পরিচালিত হচ্ছে—এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে দিতে অপারগতাপ্রকাশ করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কারখানাগুলো থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া ও ধুলাবালির কারণে আশপাশের পরিবেশে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্য নিয়েও তারা শঙ্কিত।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, কারখানাগুলো যদি জনবসতি থেকে দূরে ফাঁকা জায়গায় স্থাপন করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কারখানার শ্রমিকদের অনেককে কাজের সময় কালি ও রাসায়নিক পদার্থে শরীরের বড় অংশ ঢেকে কাজ করতে হয়। এতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের বিষয়ে কোনো চিকিৎসা বা পরীক্ষার কোন তথ্য এ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে এ বিষয়ে চিকিৎসা বা বিশেষজ্ঞ মতামতের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের আরও দাবি, কারখানাগুলোর আশপাশের গাছপালা ও কৃষিজমির ওপরও এর প্রভাব পড়ছে। তাদের অভিযোগ, আগে যে এলাকায় গাছে নিয়মিত ফল ধরত, বর্তমানে সেখানে ফলন কমে গেছে। তবে এ দাবির সঙ্গে কারখানারয় ব্যবহৃত ক্যামিকেলের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা জরুরী।
অন্যদিকে, কারখানাগুলোর পরিবেশগত ছাড়পত্র, অগ্নিনিরাপত্তা, সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন, ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট নিবন্ধন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র যে নেই তা নিশ্চিত। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো সব ধরনের আইনগত ও পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা যথাযথ ভাবে পালন করছে কি না, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহলের বক্তব্য, জনবসতির আশপাশে শিল্প-কারখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশ, অগ্নিনিরাপত্তা, শ্রমিক নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান পরিচিতি, অনুমোদন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের তথ্য জনসাধারণের জন্য সহজে জানার সুযোগ থাকা উচিত।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, গাজীপুর কার্যালয়ের কর্মকর্তা আরিফিন বাদলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আপনারা তথ্য দিন, আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
মেঘডুবি ও চামুড্ডা বাজার এলাকার এসব কালি কারখানার পরিবেশগত ছাড়পত্র, অগ্নিনিরাপত্তা, শ্রমিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সরকারি অনুমোদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের স্বার্থে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও প্রয়োজনীয় তদন্তের দাবি রাখে।
Leave a Reply