যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইরান তেল বিক্রি ও জরুরি পণ্য আমদানিতে আরও বেশি করে অনানুষ্ঠানিক ও ‘অস্বচ্ছ ট্রাস্টি’ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে। তবে এই ব্যবস্থাকে ঘিরে বিপুল অঙ্কের অর্থ ফেরত না আসা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির অভাব এবং দুর্নীতির ঝুঁকি নিয়ে দেশটির বিচার বিভাগ ও বিশেষজ্ঞ মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আল জাজিরা বলছে, রাষ্ট্র–সংযুক্ত এক বিস্তৃত ‘ট্রাস্টি’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞাভুক্ত পণ্য বিশেষ করে তেল রপ্তানি করছে দেশটি। তেল নির্বাহী, আইনপ্রণেতা ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় অর্জিত বিলিয়ন ডলারের বড় অংশ এখনও দেশে ফেরেনি। চলতি মাসে বিচারক ও প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনিদ জানান, আর্থিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তিনি অজ্ঞাত ট্রাস্টিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন এবং অর্থ ফেরত আনার নির্দেশ দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এসব ট্রাস্টির অডিট নিশ্চিত করেছিল তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি?
বিপুল অর্থের হিসাব নেই
ইরানের বিশাল তেল আয়ের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘদিন ধরেই সরকার হিমশিম খাচ্ছে। লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি ও জাতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের মধ্যে এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নাফতিরান ইন্টারট্রেড কোম্পানির (নিকো) সাবেক প্রধান নির্বাহী সিইও আলী আকবর পুর ইব্রাহিম বলেন, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবনের আশা ভেঙে পড়ার পর তেল আয়ের ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসে।
তিনি বলেন, হাসান রুহানির সময়ে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় সরাসরি তেল আয়ের তহবিল সামলাত। কিন্তু পরবর্তী ইব্রাহিম রাইসির প্রশাসন সময়ে মন্ত্রণালয়কে সরিয়ে দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আওতাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে ‘ব্যাংক ট্রাস্টি’ বসানো হয়। নাম না বলেই তিনি বলেন, শুরু থেকেই জানা ছিল ট্রাস্টিরা অর্থ আত্মসাৎ করবে। তার হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার ফেরত আসেনি দেশটিতে।
অর্থ পাচার, শেল কোম্পানি ও বিদেশে বিলাসী জীবন
পোর এব্রাহিমের অভিযোগ, ট্রাস্টিরা অর্থ গ্রহণের পরে প্রতিবেশী পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নাগরিকদের ব্যবহার করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলে এবং শেল কোম্পানির মাধ্যমে তহবিল স্থানান্তর করে। তার ভাষায়, তেল আয়ের টাকায় তারা রাতারাতি দুবাইয়ে রোলস–রয়েসের মালিক হওয়ার পাশাপাশি দামি হোটেলের পেন্টহাউসে বসবাস শুরু করে। তিনি জানান, ২০২৪ সালের এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় রাইসির মৃত্যুর আগে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে অবহিত করে পর্যালোচনার নির্দেশ দেয়া হলেও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়নি।
সংসদের অর্থনৈতিক কমিশনের সদস্য হোসেইন সামসামি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, কিছু এজেন্ট ব্যাংক ট্রাস্টিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অর্থ জমা হয়েছে বলে দেখালেও বাস্তবে টাকা জমা পড়ে না। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মাহমুদ খাঘানি বলেন, স্বাধীন অডিট হলে আত্মসাতের অঙ্ক ১১ বিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি বের হবে।
তিনি বলেন, ‘দুই দশক আগে পারমাণবিক ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ার সময় এক ‘শ্যাডো গভর্নমেন্ট’ গড়ে ওঠে। তখন থেকে আইআরজিসি–ঘনিষ্ঠ ও অনির্বাচিত রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা তেল বাণিজ্যে ঢুকে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে, সংসদ, বিচার বিভাগ, সরকার এবং নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার বেশ কয়েকজন ব্যক্তি তেল চুক্তিতে প্রবেশ করেছিলেন। এটা শুধু তেলে সীমিত নয়—মাফিয়া সর্বত্র।
খাদ্য আমদানিকারক থেকে তেল ব্যবসায়ী
তেহরানভিত্তিক এক তেল বিশেষজ্ঞ আর জাজিরাকে জানান, অস্বচ্ছ ট্রাস্টি মডেল স্বাভাবিকভাবেই দুর্নীতিকে উসকে দেয়। অর্থনীতিবিদ মোর্তেজা আফগাহ বলেন, এই অর্থ মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে পারত। নিষেধাজ্ঞা ও বৈদেশিক মুদ্রা সংকটে প্রযুক্তিগত দক্ষতার বাইরে থাকা গোষ্ঠীর হাতে কৌশলগত পণ্য তুলে দেয়া যুক্তিযুক্ত নয়।
তবু যুদ্ধের প্রস্তুতিতে সরকার ট্রাস্টি নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। কৃষিমন্ত্রী গোলামরেজা নুরি ঘেজেলজেহ ঘোষণা দেন, আগামী বছর থেকে জরুরি পণ্যের আমদানিকারকদের তেল দেয়া হবে। তারা তেল বিক্রি করে বা তেলের বিনিময়ে খাদ্য আমদানি করতে পারবে সর্বোচ্চ ১.৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। এতে করে অগ্রাধিকারমূলক বিনিময় হার বাতিল হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকরাই নতুন সুবিধা পাবে।
যুদ্ধকালীন ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ
জানুয়ারির শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সীমান্ত প্রদেশগুলোর গভর্নরদের ডেকে জানান, যুদ্ধ হলে জনগণের জীবিকা–সম্পর্কিত পণ্য আমদানিতে তাদের বাড়তি ক্ষমতা দেয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে- বিদেশি মুদ্রা ছাড়াই আমদানি, বার্টার ও সহজ কাস্টমসের সুযোগ।
নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান তার ‘শ্যাডো ফ্লিট’ ব্যবহার করে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে সমুদ্রে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর করে থাকে। এ প্রেক্ষিতে পোর্টস অ্যান্ড মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের সাবেক কর্মকর্তা ও নিকোর পরামর্শক মাজিদ আলী নাজি বলেন, নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজ স্ক্র্যাপে বিক্রি করে নতুন জাহাজ কেনার অনুমোদন মিলেছে। একটি নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজ মাত্র ১৪ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছে, যেখানে অ–নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ট্যাঙ্কারের দাম অনেক বেশি। তার যুক্তি, সিঙ্গাপুর থেকে চীন বা মালয়েশিয়ায় জাহাজ ভাড়া ও দৈনিক ডিমারেজের খরচ বিবেচনায় নতুন অ–নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজ কেনাই লাভজনক।
Leave a Reply