সবগুলো মহাসাগর পৃথিবী পৃষ্ঠের প্রায় ৭০ শতাংশ জায়গায় বিস্তৃত। কিন্তু পৃথিবীর পৃষ্ঠের অভ্যন্তরে সব মহাসাগরের ৯ গুণ জায়গাজুড়ে রয়েছে একটি মাত্র পদার্থ। সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীর কেন্দ্রভাগে (কোর) থাকা পদার্থটি হচ্ছে হাইড্রোজেন। এটি পুরোপুরি প্রমাণিত হলে এই গ্রহ হবে সবচেয়ে বড় হাইড্রোজেন ভাণ্ডার।
গবেষকদর হিসাব অনুযায়ী, এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। পৃথিবীর কোরে সর্বোচ্চ ৪৫টি মহাসাগরের সমপরিমাণ হাইড্রোজেন আটকে থাকতে পারে বলে ধারণা তাদের। অন্যভাবে বললে, হাইড্রোজেন পৃথিবীর মোট কোরের ওজনের প্রায় ০.৩৬ শতাংশ থেকে ০.৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) নেচার কমিউনিকেশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় এমনটাই জানানো হয়েছে।
এই তথ্য ইঙ্গিত দেয়, পৃথিবী তার গঠনের প্রাথমিক পর্যায়েই অধিকাংশ পানি অর্জন করেছিল। মূলত এই গ্রহ সৃষ্টির সময়ই পানির প্রধান উৎস তথা হাইড্রোজেন পৃথিবীতে যুক্ত হয়। গবেষণার প্রধান লেখক, পেকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড স্পেস সায়েন্সেসের সহকারি অধ্যাপক ডংইয়াং হুয়াং এ কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম এক মিলিয়ন বছরের মধ্যেই কোরে সবচেয়ে বেশি পানি সঞ্চিত হয়। এরপর পানির পরিমাণের দিক থেকে রয়েছে ম্যান্টল ও ভূত্বক। আর যেখানে জীবন বাস করে অর্থাৎ পৃষ্ঠভাগে, পানির পরিমাণ সবচেয়ে কম।
পৃথিবীর জন্ম ও কোরের গঠন
প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে সূর্যকে ঘিরে থাকা শিলা, গ্যাস ও ধূলিকণার সংঘর্ষে পৃথিবীর জন্ম হয়। সময়ের সঙ্গে এসব সংঘর্ষই পৃথিবীর কোর, ম্যান্টল ও ভূত্বক গঠনে ভূমিকা রাখে। গভীর অভ্যন্তরে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে লোহা ও নিকেলসমৃদ্ধ ঘন ও উত্তপ্ত তরল ধাতব কোর ঘূর্ণায়মান হতে থাকে, যা পৃথিবীর সুরক্ষামূলক চৌম্বক ক্ষেত্রের উৎস।
টেক্সাসের রাইস ইউনিভার্সিটির আর্থ সিস্টেমস সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক রাজদীপ দাসগুপ্ত বলেন, ‘হাইড্রোজেন কেবল তখনই কোর গঠনের ধাতব তরলে প্রবেশ করতে পারে, যখন পৃথিবীর প্রধান গঠনের সময় এটি উপস্থিত থাকে এবং কোর তৈরির প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।
হাইড্রোজেনের উৎস ও বণ্টন বুঝতে গেলে গ্রহের গঠন ও পৃথিবীতে জীবনের বিবর্তন বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা জানতে চেয়েছেন, পৃথিবীর গলিত ধাতব কোরে কতটা হাইড্রোজেন লুকিয়ে থাকতে পারে। তবে কোর এত গভীরে অবস্থিত এবং সেখানকার চাপ এত বেশি যে সরাসরি পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষাগারে পরিস্থিতি হুবহু অনুকরণ করা কঠিন।
হুয়াং বলেন, ‘হাইড্রোজেন পরিমাপ করা কঠিন, কারণ এটি সবচেয়ে হালকা ও ক্ষুদ্র মৌল। ফলে সাধারণ বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে একে নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
পরমাণু স্তরের পর্যবেক্ষণ
এর আগে কোরের কম ঘনত্ব থেকে বিজ্ঞানীরা হাইড্রোজেনের উপস্থিতির ইঙ্গিত পেয়েছিলেন, তবে সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ কঠিন ছিল। আগের গবেষণাগুলোতে এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন ব্যবহার করে লোহার স্ফটিক কাঠামো বিশ্লেষণ করা হতো। এসব গবেষণার ফলাফলে ব্যাপকভাবে ভিন্নতা দেখা যেত। যেমন—ওজনের হিসাবে প্রতি মিলিয়নে ১০ অংশ থেকে শুরু করে প্রতি মিলিয়নে ১০ হাজার অংশ। পর্যন্ত (অর্থাৎ ০.১ থেকে ১২০টিরও বেশি মহাসাগরের সমপরিমাণ)।
নতুন গবেষণায় সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। হুয়াং জানান, গবেষকেরা প্রায় ২০ ন্যানোমিটার ব্যাসের সূচের মতো আকৃতির নমুনা তৈরি করেন এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রিত উচ্চ ভোল্টেজের অধীনে রাখেন। এরপর পরমাণুগুলোকে আয়নিত করে একটির পর একটি গণনা করা হয়।
এই হিসাব পেতে বিজ্ঞানীরা কোরের তাপমাত্রা ও চাপ অনুকরণ করে লেজারের মাধ্যমে লোহা গলান, যা তরল ধাতব কোরের প্রতিরূপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ‘ডায়মন্ড অ্যানভিল সেল’ নামের উচ্চচাপ যন্ত্রে এই পরীক্ষা চালানো হয়। পরে ‘অ্যাটম প্রোব টোমোগ্রাফি’ ব্যবহার করে হাইড্রোজেনসহ অন্যান্য উপাদান সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হয়, যা পরমাণু স্তরে ত্রিমাত্রিক ছবি ও রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করতে সক্ষম
এই গবেষণায় কোরে পরমাণুগুলোর বিন্যাস এবং সেখানে সিলিকন, অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন কীভাবে ছড়িয়ে আছে—এ নিয়ে কিছু অনুমান করা হয়েছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, ধাতু ঠান্ডা হওয়ার সময় ন্যানোস্ট্রাকচারে হাইড্রোজেন ও সিলিকনের অনুপাত ছিল প্রায় ১:১। এই অনুপাত এবং কোরে সিলিকনের পূর্ববর্তী হিসাব মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা কোরে হাইড্রোজেনের পরিমাণ অনুমান করেছেন।
অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ গবেষণা
হুয়াং বলেন, ‘সিলিকন, অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের পারস্পরিক সম্পর্ক কোর থেকে ম্যান্টলে তাপ সঞ্চালনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়, যা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আর এটি পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলতে অপরিহার্য।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরোক্ষ পদ্ধতিতে কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। এটি কোরের হাইড্রোজেনের পরিমাণ নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন সব রাসায়নিক ক্রিয়া এখনো পুরোপুরি বিবেচনায় আনা হয়নি গবেষণায়।
দাসগুপ্ত বলেন, ‘যদি এই গবেষণার পরিমাপ ও ধারণা সঠিক হয়, তবে তা প্রমাণ করবে যে পৃথিবীর গঠনের পুরো সময়জুড়েই হাইড্রোজেন সরবরাহ হয়েছে। এই নতুন গবেষণা আমাদের ভবিষ্যৎ আলোচনা ও বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
Leave a Reply