এক ছেলেকে মুক্ত করার শর্তে আরেক ছেলেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন বাবা-মা। আট মাস পর সেই ছেলে মারা যায় কুখ্যাত মেগিদ্দো কারাগারে। কিন্তু আজও সন্তানের মরদেহ ফেরত পাননি হতভাগা দম্পতি। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর চলমান নির্যাতন ও চিকিৎসা অবহেলার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। সোমবার (০২ ফেব্রুয়ারি) মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ইসরায়েলি বর্বরতায় কারাগারগুলোতে নজিরবিহীন সংখ্যক বন্দি মৃত্যুবরণ করেছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়া হয় ২০ বছর বয়সী আহমেদ তাজাজাকে। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ সুস্থ, কোনো পরিচিত রোগের ইতিহাসও ছিল না। কিন্তু কেন তাকে ‘ওয়ান্টেড’ ঘোষণা করা হয়েছিল, তা আজও জানেন না তার বাবা-মা। তবে হাজারো তরুণ ফিলিস্তিনির মতো তাকেও আটক করা হয় প্রশাসনিক আটক আইনে, যেখানে কোনো অভিযোগ, বিচার কিংবা আইনজীবীর সহায়তা ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য কারাবন্দি রাখা হয়।
ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ‘নিরাপত্তা বন্দি’ হিসেবে ১০ হাজার ৪৬৫ জন ফিলিস্তিনি পুরুষ আটক ছিলেন, যাদের মধ্যে ৭ হাজার ৪২৫ জন পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের বাসিন্দা।
আহমেদের বাড়ি উত্তর পশ্চিম তীরের কাবাতিয়া শহরে। মাসের পর মাস ইসরায়েলি বাহিনীর তল্লাশি, ভাঙচুর, হুমকি ও হয়রানির শিকার হন তারা। এক পর্যায়ে তার বাবা ও ভাইকে আটক করে বলা হয়, অন্য ছেলেকে হাজির না করলে মুক্তি মিলবে না। হামলা করা হবে তাদের বাড়িতেও। দুই সন্তান ও সংসার থাকা ভাইকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত আহমেদকেই তুলে দিতে বাধ্য হন বাবা-মা।
তার মা নাজাহ আবদুল কাদের মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আমরা তাকে নিজের হাতে তুলে দিয়েছি। ও তাকিয়ে ছিল আমাদের দিকে। আমি জানতাম, সে আর ফিরবে না।’ তিনি অনুতাপ করে বলেন, ‘এখন আমি অনুতপ্ত। আমি তাকে নিজের হাতে হত্যা করতে দিয়েছি। আমি আমার ছেলেকে আমার শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছি। কিন্তু আমরা তাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম।
আট মাস কারাবন্দি থাকার পর ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট, ২১ বছর বয়সে মেগিদ্দো কারাগারে মারা যান আহমেদ তাজাজা। ফিজিশিয়ান ফর হিউম্যান রাইটস ইসরায়েলের (পিপিএইচআরআই) এক চিকিৎসকের করা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আটকের সময় তিনি সুস্থ ছিলেন। কারাগারে ডায়রিয়া, স্ক্যাবিস এবং মৃত্যুর কয়েক দিন আগে গলা ব্যথার কথা উল্লেখ আছে। মৃত্যুর আগে তিনি রক্তমাখা কাপড় নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এরপর তার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
ময়নাতদন্তে সম্ভাব্য রক্ত ক্যানসারের ইঙ্গিত থাকলেও ‘হঠাৎ মৃত্যুর’ কোনো সুস্পষ্ট কারণ পাওয়া যায়নি। তবে আহমেদের পরিবার এই প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করছে। তারা আট মাসে একবারও ছেলের সঙ্গে দেখা বা কথা বলতে পারেননি। অন্যান্য মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিদের কাছ থেকেই তারা খবর পেতেন।
পরিবারের দাবি, আহমেদকে মারধর করা হয়, কুকুর দিয়ে কামড়ানো হয় এবং গুরুতর অবস্থার পরও চিকিৎসা দেয়া হয়নি। যদিও সংবাদমাধ্যমটি এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি, তবে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বি’তসেলেম ও পিএইচআরআইয়েরনথিভুক্ত সাক্ষ্যগুলোর সঙ্গে এসব অভিযোগের মিল রয়েছে।
গত সপ্তাহে বি’তসেলেম ইসরায়েলি কারা ব্যবস্থাকে “নির্যাতন শিবিরের নেটওয়ার্ক” হিসেবে বর্ণনা করে জানায়, সেখানে বন্দিদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, কুকুর দিয়ে আক্রমণ, অমানবিক জীবনযাপন ও চিকিৎসা বঞ্চনা চলছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, কারাগারে মারা যাওয়া ৮৪ জন বন্দির মধ্যে মাত্র চারজনের মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত দেয়া হয়েছে।
ইসরায়েলের হারেৎজ পত্রিকা জানায়, বর্তমানে ইসরায়েল অন্তত ৭৭৬ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ আটকে রেখেছে, যাদের মধ্যে ৮৮ জন ইসরায়েলি হেফাজতেই মারা গেছেন। এটিকে পরিবারগুলোর ওপর ‘প্রতিশোধমূলক নীতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পিএইচআরআইয়ের হিসাবে, অক্টোবর ২০২৩ থেকে আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত অন্তত ৯৪ জন ফিলিস্তিনি বন্দি কারাগারে মারা গেছেন, যা এখন বেড়ে ১০১-এ পৌঁছেছে। সংগঠনটির মতে, এর প্রধান কারণ পরিকল্পিত চিকিৎসা অবহেলা।
সংস্থাটির পরিচালক নাজি আব্বাস বলেন, ‘এটি আর আগের মতো অবহেলা নয়। এটি চিকিৎসা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার নীতি। একজন ফিলিস্তিনি বন্দির চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কোনো বাস্তব সুযোগ নেই। ছোট একটি সংক্রমণও মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে, যেন আমরা ১৮০০ সালের যুগে ফিরে গেছি।’
এই বাস্তবতার প্রতীক হয়ে আছে আহমেদ তাজাজার বাড়ির আলমারিতে ঝুলে থাকা তার জামাকাপড়। মরদেহ না পাওয়ায় আজও তার মা বিশ্বাস করতে চান না যে ছেলে মারা গেছে।
Leave a Reply