আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের মতোই আলোচনায় মুখর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ক্যাম্পাসও। চা-স্টল থেকে শুরু করে ক্লাসরুম, সব জায়গায়ই চলছে তরুণদের তর্ক-বিতর্ক, বিশ্লেষণ আর ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে নানা স্বপ্ন ও শঙ্কার গল্প।জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম জাতীয় নির্বাচন এটি। দীর্ঘ সময় পর তুলনামূলক উন্মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে ভোট দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে এ প্রজন্ম। তাই উৎসাহ, প্রত্যাশা আর আশঙ্কা– সব মিলিয়ে এক বিশেষ উত্তেজনা বিরাজ করছে জেনজি প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, এ নির্বাচন যেন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের মাধ্যম না হয় বরং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠুক।
ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী তাজমিন রহমান বলেন, আমি এমন একটি নির্বাচনের স্বপ্ন দেখি, যেখানে ভোট মানে হবে নাগরিকের স্বাধীন মত প্রকাশের নিশ্চয়তা। ভয় নয়, দায়িত্ববোধ তাড়িত করবে মানুষকে ভোটকেন্দ্রে যেতে। নির্বাচনের পর দেশ যেন বিভক্ত না হয়- বিজয় ও পরাজয় দুটোই যেন গণতান্ত্রিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এ নির্বাচন যেন বিভাজনের নয়, বরং ঐক্য ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রতীক হয়– এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থী সারোয়ার হোসেন সাকিব বলেন, বাংলাদেশ সংগ্রামের ইতিহাসের দেশ। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ- সবক্ষেত্রেই জনগণের অধিকারই ছিল মূল প্রেরণা। তাই জাতীয় নির্বাচন আমাদের জন্য কেবল সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের আস্থার সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা। আমার স্বপ্ন একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি নাগরিক ভয়মুক্তভাবে ভোট দিতে পারবে, আর নির্বাচন হবে প্রতিযোগিতামূলক, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য। তবে উদ্বেগও কম নয়– অতীতের কিছু অভিজ্ঞতা ভোটার উপস্থিতি, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নির্বাচন যেন কোনো গোষ্ঠীর সম্পত্তি না হয়ে জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে। নির্বাচন কমিশনকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং জনগণের আস্থার রক্ষক।
ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল স্টাডিজ বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী জয়নব ফেরদৌস জিনিয়া বলেন, আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা নির্বাচনহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটবে। আমি আশা করি, দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই বৈষম্যহীন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতে পারবে। ভোটের দিন কেন্দ্র দখলসহ নানা অপচেষ্টার আশঙ্কা রয়েছে, যা ভোটারদের অংশগ্রহণে বাধা হতে পারে। সরকার যেন সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, যাতে সবাই নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে।
ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী জুনাইদুল মোস্তফা বলেন, আমার প্রত্যাশা– এবারের নির্বাচনটি হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক। জনগণের প্রকৃত মতামতই প্রতিফলিত হবে ভোটের মাধ্যমে। শুধু ভোটের সময় নয়, জনপ্রতিনিধিদের পুরো মেয়াদ জুড়েই জনগণের পাশে থাকা উচিত। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়, এটি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার একটি সুযোগ।
আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী রেজাউল ইসলাম রাকিব বলেন, আমি জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছি। আমার প্রত্যাশা– এবারের নির্বাচন বিগত সব প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনকে পেছনে ফেলে একটি আদর্শ উদাহরণ হয়ে উঠবে। জনগণ যেন ভয়মুক্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে পারে, সেটিই সবচেয়ে বড়ো চাওয়া। নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সবার কাছে প্রত্যাশা- তারা যেন নিরপেক্ষতা ও দায়িত্ববোধের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কথায় স্পষ্ট- তারা পরিবর্তনের আশা নিয়ে নির্বাচনের অপেক্ষায়, তবে আশঙ্কা এখনো কাটেনি। তারা এখন এ দেশে বিভাজনের রাজনীতি আর দেখতে চায় না। তরুণদের এ মিশ্র অনুভূতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা।
Leave a Reply