বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

ফুটবল-ক্রিকেটের বাইরে যেমন ছিল বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন

অনলাইন ডেস্ক
  • আপলোডের সময় : রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৫ বার

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে জনপ্রিয়তার শীর্ষে বরাবরের মতোই ছিল ক্রিকেট ও ফুটবল। তবে ২০২৫ সালে এই দুই খেলাকে ছাপিয়ে না উঠলেও, তাদের বাইরের ডিসিপ্লিনগুলোও বছরের বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে সাফল্য, ব্যর্থতা ও নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে। হকি, কাবাডি, আর্চারি, টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন কিংবা দাবা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ছিল উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন। আবার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, দল নির্বাচন ও নৈতিক স্খলন নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্নও।
২০২৫ সালে ক্রিকেট–ফুটবলের বাইরে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন তাই একদিকে যেমন অর্জনের গল্প লিখেছে, অন্যদিকে তেমনি দেখিয়েছে কাঠামোগত দুর্বলতা ও ব্যবস্থাপনার সংকট।
যুব হকিতে ইতিহাস, সিনিয়র দলে হতাশা
বছরের সবচেয়ে আলোচিত সাফল্য এসেছে যুব হকিতে। প্রথমবারের মতো যুব হকি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই দারুণ চমক দেখায় লাল-সবুজের দল। চ্যালেঞ্জার্স ট্রফি জয়ের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রিয়ার মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে নজর কাড়ে বাংলাদেশ। ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও তারা লড়াই করেছে চোখে পড়ার মতো আত্মবিশ্বাস নিয়ে।
দলীয় পারফরম্যান্সের বাইরেও যুব বিশ্বকাপ আলোচনায় ছিল এক ব্যক্তিগত কীর্তির কারণে। ফরোয়ার্ড আমিরুল ইসলাম পাঁচটি হ্যাটট্রিকসহ ১৮ গোল করে যুব বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়েন। এই কীর্তি যুব হকির ইতিহাসেই অনন্য, যা বাংলাদেশ হকিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন করে পরিচিত করে তোলে।
তবে সিনিয়র পর্যায়ে চিত্র ছিল উল্টো। যে এএইচএফ কাপ জয় একসময় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে ফাইনালেই উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। দল নির্বাচন নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা, বিশেষ করে অভিজ্ঞ তারকা রাসেল মাহমুদ জিমিকে বাদ দেয়ায়। বিষয়টি তদন্তে নামতে বাধ্য হয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। পাকিস্তান নাম প্রত্যাহার করায় এশিয়া কাপে খেলার সুযোগ পেলেও সেটি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয় দল।
২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো নারী কাবাডি বিশ্বকাপের আয়োজন করে বাংলাদেশ। স্বাগতিক হিসেবে প্রত্যাশা ছিল আরও বড় কিছু। তবে শেষ পর্যন্ত ব্রোঞ্জ পদকেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এশিয়ান নারী কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ ও যুব এশিয়ান গেমসেও একই চিত্র-সর্বোচ্চ অর্জন ছিল ব্রোঞ্জ পদক। ধারাবাহিকভাবে মঞ্চে ওঠা গেলেও শিরোপা ছোঁয়ার স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়।
ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে ঐতিহাসিক সাফল্য
ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উজ্জ্বল সাফল্য আসে টেবিল টেনিসে। জাবেদ আহমেদ ও খই খই মারমা মিশ্র দ্বৈতে রৌপ্য জিতে ইতিহাস গড়েন। টেবিল টেনিসে আন্তর্জাতিক আসরে এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাফল্য।
একই গেমসে ভারোত্তোলনে মারজিয়া আক্তার তিনটি ব্রোঞ্জ পদক জিতে নিজের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করেন। উশুতে শিখা খাতুনও একটি ব্রোঞ্জ পদক এনে দেন।
আর্চারিতে স্বর্ণ, প্রশাসনে উত্থান ও তারকাদের বিদায়
২০২৫ সালে আর্চারিতে আবারও সাফল্যের গল্প শোনা যায়। এশিয়ান কাপ আর্চ্যারিতে স্বর্ণ জেতেন আবদুর রহমান আলিফ। ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত এশিয়ান আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপেও বাংলাদেশ দুইটি ইভেন্টে পদক অর্জন করে। কম্পাউন্ড মিশ্র বিভাগে হিমু বাছাড় ও বন্যা জুটি রৌপ্য জেতে, আর নারী এককে ব্রোঞ্জ জেতেন কুলসুম আক্তার মনি।
প্রশাসনিক পর্যায়েও সুখবর আসে আর্চারি থেকে। দেশের সফল সংগঠক কাজী রাজিব উদ্দিন আহমেদ প্রথমবারের মতো ওয়ার্ল্ড এশিয়ান আর্চ্যারির সভাপতি নির্বাচিত হন, যা বাংলাদেশের ক্রীড়া কূটনীতির জন্য বড় অর্জন।
তবে বছরের শেষদিকে আর্চারিতে আসে হতাশার খবরও। অভিমানে দেশের তারকা জুটি রোমান সানা ও দিয়া সিদ্দিকী যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান গোপনে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে ২০২৫ সালের শুরুতে, যা নিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে শুরু হয় নতুন বিতর্ক।
দাবা ও ব্যাডমিন্টনে নতুন মাইলফলক
দাবায় বাংলাদেশের জন্য ২০২৫ ছিল স্মরণীয়। ওয়াদিফা আহমেদ দেশের চতুর্থ নারী হিসেবে মহিলা আন্তর্জাতিক মাস্টার খেতাব অর্জন করেন।
ব্যাডমিন্টনেও আসে ঐতিহাসিক সাফল্য। ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল সিরিজে প্রথমবার আন্তর্জাতিক আসরে সেরা হয় বাংলাদেশের শাটলাররা। পুরুষ দ্বৈতে স্বর্ণ জেতেন গৌরব সিংহ ও জহির তানভীর। মিশ্র দ্বৈতে আল-আমিন জুমার ও উর্মি আক্তার জিতেন রৌপ্য।
ভলিবলে ব্যর্থ স্বাগতিক, প্রশাসনে বিতর্ক
কাভা কাপ ভলিবলের স্বাগতিক ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু প্রত্যাশার চাপ সামলাতে পারেনি দল। ঘরের মাঠে হতাশাজনক পারফরম্যান্সে প্রশ্ন ওঠে প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়ে।
২০২৫ সালে বিভিন্ন ফেডারেশন কমিটিতেও আসে পরিবর্তন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয় মহিলা ক্রীড়া সংস্থার নতুন কমিটি। যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠে নানা প্রশ্ন।
শুটিংয়ে সাফল্যের চেয়ে বড় বিতর্ক
শুটিংয়ে ২০২৫ সালে সাফল্যের চেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল যৌন হয়রানির অভিযোগ। ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক জিএম হায়দারের বিরুদ্ধে একাধিক নারী শুটার অভিযোগ তোলেন। সাবেক শুটার রত্না মামলা করেন, আর তাসমিয়াতি এমা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। বিষয়টি ক্রীড়াঙ্গনে নৈতিকতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে সংশ্লিষ্টদের।
সবশেষ বলা যায়, ২০২৫ সাল ক্রিকেট ও ফুটবলের বাইরের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ছিল সম্ভাবনা আর সংকটের মিশ্র বছর। একদিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইতিহাস গড়া সাফল্য, অন্যদিকে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও বিতর্ক। এই দুই বাস্তবতার মাঝেই দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন নতুন বছরের দিকে তাকিয়ে আছে- আরও পরিকল্পিত, স্বচ্ছ ও টেকসই অগ্রগতির আশায়।

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories