থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্তে সোমবার (৮ ডিসেম্বর) ভোরে হঠাৎ করে আবারও গোলাগুলি ও সামরিক উত্তেজনা শুরু হয়েছে। থাই সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, উবন রাতচাথানি সীমান্ত অঞ্চলে কম্বোডিয়ার সেনাদের গুলিতে একজন থাই সেনা নিহত এবং আরও চারজন আহত হয়েছেন। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তের ওপারে কম্বোডিয়ার সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান দিয়ে হামলা চালায় থাইল্যান্ড। এ ঘটনায় সীমান্তের আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন ও বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ম্বোডিয়া অবশ্য থাইল্যান্ডের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি-তারা কোনো আক্রমণ চালায়নি এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়া থেকে বিরত রাখতে তারা এখনো কোনো পাল্টা হামলাও করেনি। কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ বলছে, থাইল্যান্ডের অভিযোগ একতরফা এবং তাদের এই আচরণই সীমান্তে নতুন আগ্রাসনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এদিকে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে ভয় ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। থাইল্যান্ড আজ সকালে ব্যাপকভাবে লোকজন সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সরকারি হিসাবে, প্রায় চার লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের কাছাকাছি বসবাস করছিলেন-তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। শিশুসহ পরিবারগুলো আতঙ্কের মধ্যে রাতভর গ্রাম ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র বা আত্মীয়দের বাড়িতে যেতে বাধ্য হয়েছে।
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে দুই দেশের মধ্যে একটি নতুন শান্তিচুক্তি সই হয়েছিল। সেই চুক্তির মধ্যস্থতায় ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চুক্তিতে ঘোষণা করা হয়-সীমান্তে অস্ত্রবিরতি কার্যকর থাকবে, ভারী অস্ত্র ও সামরিক উপস্থিতি কমানো হবে, সীমান্তে মাইন অপসারণ ও বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। চুক্তিটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় প্রতিশ্রুতি হিসেবেই দেখা হয়েছিল।
কিন্তু শান্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গত মাসে সীমান্ত এলাকায় একটি ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে থাই সেনা আহত হওয়ার পর থাইল্যান্ড অভিযোগ তোলে-কম্বোডিয়া নতুন করে মাইন পুঁতছে। সেই অভিযোগের জেরে তারা শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন স্থগিত করে। যদিও কম্বোডিয়া জানায়-সেগুলো আগের সংঘর্ষের সময়কার পুরোনো মাইন, এতে তাদের কোনো হাত নেই। কিন্তু দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাস এতটাই জমাট বেঁধেছে যে চুক্তির মূল ভরসাই নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন-সীমান্ত বিরোধ শত বছরের পুরোনো এবং তা রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ও জাতীয় গর্বের সঙ্গে জড়িত। তাই কেবল অস্ত্রবিরতি করলেই এই সমস্যার সমাধান হয় না। সঠিক সীমান্ত নির্ধারণ, পারস্পরিক বিশ্বাস গঠন এবং স্থায়ী পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি ছাড়া এই অঞ্চল আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠছে আজকের ঘটনা তারই প্রমাণ। এই হামলা ও পাল্টা উত্তেজনার ফলে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় কুয়ালালামপুরে সই হওয়া শান্তি চুক্তি আজ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
এখন আন্তর্জাতিক মহল বারবার আহ্বান জানাচ্ছে-দুই দেশ আবারও আলোচনার টেবিলে বসুক এবং সংঘাত যেন আর বাড়তে না পারে। পর্যবেক্ষকেরা সতর্ক করে বলেছেন-যদি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান নেয়া না হয়, তবে সীমান্ত উত্তেজনা যে কোনো সময় বৃহত্তর ও আরও প্রাণঘাতী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
Leave a Reply