শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ, সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করল পুলিশ আজ দেবীর বোধন, কাল থেকে শুরু শারদীয় দুর্গোৎসব উত্তরায় ২ ঘণ্টা পর সড়ক ছাড়লেন শ্রমিকরা, যান চলাচল স্বাভাবিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে নারী পুরুষ শিক্ষকের মারামারির ভিডিও ভাইরাল ৮ মাসে প্রশাসনে রদবদল: ২ হাজারের বেশি বদলি-পদায়ন, বাধ্যতামূলক অবসরে ৩২ জন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই দিয়ে মিথ্যা কন্টেন্ট যে বানায়, আর যারা শেয়ার করে সবাই অপরাধী: মেহজাবীন চৌধুরী ডেঙ্গু মোকাবিলায় দেশবাসীর জন্য প্রধানমন্ত্রীর জরুরি বার্তা আগামী ১২ দিন বন্ধ থাকবে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ী স্থলবন্দর বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা জরুরি: আইএমএফ শারদীয় দূর্গােউৎসবে মণ্ডপের নিরাপত্তা ইস্যুতে পুলিশের একগুচ্ছ পরামর্শ

রংপুরে ৪ খুন: জবানবন্দিতে উঠে এল নতুন তথ্য, দুই আসামির ডিএনএ ও ডোপ টেস্ট হবে জানালো পুলিশ

মৃণাল চৌধুরী সৈকত
  • আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৩ বার

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার ২আসামির ডিএনএ পরীক্ষা ও ডোপ টেস্ট করা হবে। একই সঙ্গে ময়নাতদন্ত ও আসামিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উঠে আসা বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
তিনি বলেন, রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ সংগ্রহ এবং ডোপ টেস্ট করা হবে।
কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, একই পরিবারের ৪ জনকে হত্যার ঘটনায় ময়নাতদন্ত ও পুলিশের তদন্তে বেশ কিছু তথ্য সামনে এসেছে। নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তে ২জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ সময় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ২ আসামি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ এবং সাক্ষীদের আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দি তুলে ধরেন তিনি।
পুলিশ কমিশনার বলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সীমান্ত দাস বলেছেন, সে একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করে। আর সিদ্ধার্থ দাস স্বর্ণের দোকানের কারিগর হিসেবে কাজ করে। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সঙ্গে সিদ্ধার্থদের বাড়ি লাগোয়া ছিল। গণপতি স্যার যে জমিতে বাড়ি করেছিলেন, সেটি আগে সিদ্ধার্থদের পূর্বপুরুষদের জমি ছিল। পরে গণপতি স্যার জমিটি কিনে বাড়ি করেন।
সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি আগে মাঝেমধ্যে উৎসবের সময় ইয়াবা সেবন করতো। তবে ঘটনার আগের এক মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার একটি করে ইয়াবা সেবন করতো। সিদ্ধার্থের বড় ভাইয়ের সম্প্রতি বিয়ে হয়। এরপর নানা কারণে তিনি প্রায় ৬-৭ মাস ধরে বিজয় কাকুর বাসায় ঘুমাতো। সেখানে খাওয়া-দাওয়া করতো। তবে ঘটনার আগের এক মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার সে সা্ক্ষী সীমান্তদের বাসায় থাকতো। সীমান্ত নেশা করেন না। ঘটনার বিষয়েও তিনি কিছু জানতেন না। আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় সীমান্তের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।
সিদ্ধার্থের বক্তব্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর তিনি ইয়াবা নিয়ে মুগ্ধকে সঙ্গে করে সীমান্তদের বাসায় যান। সেখানে দুজন মিলে তিনটি ইয়াবা সেবন করে। রাত ৩টার দিকে আরও ইয়াবা সেবনের ইচ্ছা হলে তারা ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্তর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। এরপর শান্তর বাড়ির সামনে থেকে আরও ৪টি ইয়াবা সংগ্রহ করেন। ইয়াবা নেওয়ার সময় তারা মোবাইল ফোন বন্ধক রেখেছিলো। ৪টি ইয়াবা নেওয়ার পর তারা আবার সীমান্তদের বাসায় যান। রাত ৩টার পর সেখান থেকে বের হয়। রাস্তায় কুকুর থাকায় তারা সরাসরি গেট দিয়ে না গিয়ে দেয়াল টপকে দেবুদের বাড়িতে প্রবেশ করেন। দেবুদের বাড়ির ছাদে রেলিং নেই। তাই তারা ওই ছাদ থেকে গণপতি স্যারের বাড়ির ছাদে যায়। দুই ছাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল প্রায় দুই থেকে আড়াই ফুট।
গণপতি স্যারের ছাদের চারপাশে হাফওয়াল ছিল। ফলে বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন শুরু করে। তারা ইয়াবা সেবন করতে করতে খেয়াল করেননি কখন ভোর হয়ে গেছে। এরপর ধারাবাহিত ভাবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর তারা ওই বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা নেয়। এর মধ্যে সিদ্ধার্থ ভাগে পায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা। ওই টাকা দিয়ে সে শান্তর থেকে বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেয়। ওই ইয়াবা ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, সেদিন তারা মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেন। এর আগে তারা একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা সেবন করেছিলো। মুগ্ধের জবানবন্দিতে অবশ্য সেদিন ৯টি ইয়াবা সেবনের কথা এসেছে। এটি ৮টি ও পরে আরও একটি ইয়াবা সেবনের হিসাব হতে পারে।
ভোরে গণপতি চক্রবর্তী স্যার ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাদের দেখে ফেলেন। তিনি তাদের ধমক দিয়ে বলেন, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস ? তখন তারা ভয় পেয়ে যায়। তাদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। তাদের আশঙ্কা ছিল স্যার চিৎকার করবে। এরপর তারা স্যারকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় বলে জবানবন্দিতে এসেছে। সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ স্যারের গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেয়। একপর্যায়ে স্যার মারা যান।
পরে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে শ্বাসরোধজনিত মৃত্যুর বিষয়টি উঠে আসে। তাদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে ময়নাতদন্তের ওই তথ্যের মিল পাওয়া গেছে।
স্যারের মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখার সময় সম্ভবত শব্দ পেয়ে তার স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে চলে আসেন। তারা চিৎকার শুরু করেন। তখন মুগ্ধ স্যারের স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন। আর সিদ্ধার্থ স্যারের মেয়ের গলা চেপে ধরেন। এক পর্যায়ে স্যারের স্ত্রীর গলায় থাকা গামছা দিয়েই মেয়েটির গলায় প্যাঁচ দেওয়া হয়। পরে পাশের কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি নিয়ে মেয়েটির গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেওয়া হয়। এভাবে মা ও মেয়েকেও হত্যা করা হয়।
এরপর বাড়িতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কি না, সেই আশঙ্কা থেকে তারা নীচতলায় যায়। সেখানে একটি পুরোনো প্লাস পায়। সেটি দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন, যাতে কোনো ক্যামেরা থাকলেও সেটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে তারা আবার ছাদে যায়। মা ও মেয়ের মরদেহ ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির দিকে রেখে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, দেবুদের বাড়ির ছাদ থেকে যেন মরদেহ দেখা না যায়। এরপর তারা স্যারের ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়ে দেখে, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে গেছে। শিশুটি সিদ্ধার্থকে চিনতে পারে এবং বলে, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন ?
পুলিশ কমিশনার বলেন, এর আগে আমরা শিশুটি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল বলে যে তথ্য পেয়েছিলাম, তখন সেই তথ্যের ভিত্তিতেই বিষয়টি জানিয়েছিলাম। কিন্তু আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তারা বলেছে, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে চিনে ফেলে এবং তার নাম ধরে ডাকে।
শিশুটি চিৎকার করে অন্যদের জানিয়ে দিতে পারে-এই আশঙ্কায় তারা তাকে হত্যা করে। জবানবন্দি অনুযায়ী, কাপড় দিয়ে শিশুটির গলায় প্যাঁচ দিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়। এরপর তারা দুজনই অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তারা গোসল করে। গোসলের পর তাদের কাছে থাকা আরেকটি ইয়াবা সেবন করেন। এরপর মুগ্ধের মাথায় বাড়িটিতে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর পরিকল্পনা আসে। তারা ঘরের ড্রয়ার খুলে জিনিসপত্র এলোমেলো করতে থাকে।
মুগ্ধ বিভিন্ন অলংকার এনে দেয়। সিদ্ধার্থ সেগুলো প্লাস্টিকের বাক্স ও কাপড়ের প্যাকেটে রাখে। বাড়ি থেকে তারা ১৫ হাজার টাকা নেয়। জুমার নামাজের সময় বাইরে মানুষের চলাচল কমে গেলে তারা স্যারের বাড়ির ছাদ থেকে দেবুদের বাড়ির ছাদে যায়। এরপর দেয়াল টপকে বাইরে বের হয়ে যায়। মুগ্ধ ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যায়। আর স্বর্ণালংকারের ব্যাগ নিয়ে সিদ্ধার্থ একটি গলিতে যায়। পরে কাউকে বুঝতে না দিয়ে পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পেছনে মাটির নিচে স্বর্ণালংকারগুলো রেখে দেয়। বিজয় কাকা ও পূর্ণিমা কাকি এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না।
এরপর সিদ্ধার্থ বাড়িতে গিয়ে আবার গোসল করে। পরে মুগ্ধের কাছে গিয়ে তার ভাগের ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেয়। ওই টাকা দিয়ে বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন। পরদিন সিদ্ধার্থ স্বাভাবিক ভাবে দোকানে কাজে যায়। অন্যদিকে মুগ্ধ বাড়িতেই ছিলো। পরে পুলিশ মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করে।
মুগ্ধ দাসের আদালতের জবানবন্দিতেও ঘটনার প্রায় একই বর্ণনা পাওয়া গেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২১ তারিখ রাত আনুমানিক ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে ইয়াবা সেবনের জন্য তারা দেবুদের বাড়ির সীমানা প্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করে।
দেবুদের বাড়ির নিচতলার নির্মাণকাজ তখনও শেষ হয়নি। সিঁড়িতে কোনো দরজা ছিল না। ফলে সেখানে সহজেই যাতায়াত করা সম্ভব ছিল। ছাদটিও খোলা ছিল। মুগ্ধের বক্তব্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থের পরামর্শেই তারা গণপতি স্যারের ছাদে যায়। সিদ্ধার্থ তাকে বলেছিলো, এর আগেও সে ওই ছাদে এক-দুই দিন ইয়াবা সেবন করেছে।
গণপতি স্যারের ছাদে পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন করে। মুগ্ধের হিসাবে সেদিন মোট নয়টি ইয়াবা সেবন করা হয়। এরপর ভোরের আলো ফুটে যায় এবং গণপতি স্যার তাদের দেখে ফেলে। এরপর সেই একই রকম তথ্য দিয়েছে। সেই চিৎকারের বিষয়ে একজন স্থানীয় নারী সাক্ষ্য দিয়েছেন বলেও তদন্তে পাওয়া গেছে।
ওই নারী ঘটনার বিষয়ে পুলিশকে তথ্য দেওয়ার পর তার স্বামী তাকে মারধর করেছে বলেও জানা গেছে। পুলিশ কমিশনার বলেন, এ ধরনের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কোনো ঘটনা শুনে থাকলে বা দেখে থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দেওয়া উচিত।

আমাদের সাথেই থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories