ঘুম থেকে উঠার পর অনেকেরই বমি বমি ভাব, অস্থির ও মাথাব্যথার মতো সমস্যা হয়। কেউ কেউ এ ধরনের অস্বস্তিদায়ক সমস্যাকে ফ্লু মনে করেন। কেউ আবার ভাবেন, আগের রাতে এমন কী খাবার খেয়েছেন, যে কারণে এমনটা অনুভব হচ্ছে। এ ঘটনার সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। কিন্তু কেউ কী কখনো নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, কেমন এমনটা হয়?
সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যারিজোনার স্কটসডেলে অবস্থিত মায়ো ক্লিনিক-প্রশিক্ষিত ঘুম বিশেষজ্ঞ ডা. ওয়াইজ ওয়াসি বলেন, ঘুমের পর বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা বা ঘোরার মতো লক্ষণগুলো খুবই সাধারণ। এসব সমস্যা হালকা হলেও আপনার দিন নষ্ট করতে পারে এবং এর পেছনে বিভিন্ন কারণও থাকতে পারে। এর চিকিৎসাও ভিন্ন ভিন্ন।
ঘুম থেকে উঠার পর অসুস্থ বোধ হওয়ার কারণ:
ঘুমের জড়তা:
ডা. ওয়াসি বলেন, ঘুমের জড়তা বলতে মূলত মাথাঘোরা, হালকা মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব ও অস্থির অবস্থাকে বোঝায়। এসব সমস্যার কারণে অনেকেই ঘুম থেকে উঠার পর অসুস্থ বোধ করেন।
সাধারণত ঘুমের চক্র প্রায় ৯০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এর মধ্যে তিনটি ঘুমের পর্যায় এবং রেম অন্তর্ভুক্ত। মানুষ সাধারণত প্রতি রাতে তিন বা চারটি ঘুম চক্রের মধ্য দিয়ে যায়। কিন্তু ঘুমের সময় যদি সেই পূর্ণ চক্র সম্পন্ন না করে ঘুম থেকে উঠা হয়, তাহলে প্রায়ই নানা সমস্যা অনুভব করেন বলে জানিয়েছেন ডা. ওয়াসি।
ফিলাডেলফিয়ার ট্রিপল বোর্ড-সার্টিফাইড স্লিপ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ফাঙ্কে আফোলাবি-ব্রাউন বলেন, ঘুমের জড়তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হালকা অবস্থা দেখা দেয় এবং প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে তা নিজ থেকেই ঠিক হয়ে যায়। তবে সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করলে চার থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী দুর্বলতা, বমি বা আতঙ্কের মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
ঘুমের জড়তা ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট নয়:
রাতের বেলায় ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠার ক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে। এ ব্যাপারে ডা. ওয়াসি বলেন, এটি খুব কমই হয়ে থাকে। কেননা, যে কেউ কয়েকটি ঘুমের চক্র সম্পন্ন করে জেগে উঠার পর আবার পুনরায় ঘুমিয়ে তা সম্পন্ন করে। তবে যাদের স্লিপ অ্যাপনিয়া, অনিদ্রা বা ঘুমের অভাব রয়েছে, তাদের ঘুমের জড়তার তীব্র লক্ষণগুলো বেশি দেখা দিয়ে থাকে।
গ্যাস্ট্রো-ইনটেস্টাইনাল সমস্যা:
এ সমস্যা বলতে পরিপাকতন্ত্রের জটিলতাকে বোঝায়। এ ব্যাপারে টেক্সাসের হিউস্টনে অবস্থিত বোর্ড-সার্টিফাইড গ্যাস্ট্রো-এন্টেরোলজিস্ট ডা. ভরত পোথুরি বলেন, অ্যাসিড রিফ্লাক্স, যাকে গ্যাস্ট্রো-ইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স বা বুকজ্বালাও বলা হয়, বিশ্রামের পর বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা ও বুকে ব্যথার একটি সাধারণ সমস্যা। পেটের অ্যাসিড খাদ্যনালীতে প্রবেশ করে ও খাওয়ার পর শুয়ে থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
তিনি বলেন, অধিকাংশ মানুষই মাঝে মধ্যে অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা অনুভব করেন। বিশেষ করে চর্বিযুক্ত বা অ্যাসিডিক খাবার খাওয়ার পর এ সমস্যা বেশি অনুভব করেন। কখনো আবার কিছু মানুষের এ সমস্যা গুরুতর আকার ধারণ করে। রাতে ঘুমানোর পরও পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অ্যারিজোনার স্কটসডেলের বোর্ড-সার্টিফাইড গ্যাস্ট্রো-এন্টেরোলজিস্ট ডা. রুচা মেহতা শাহ বলেছেন, খাদ্যাভ্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চর্বিযুক্ত, ভাজা, দুগ্ধজাত খাবার বা উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবারের মতো কিছু খাবার দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয় এবং তা থেকে এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
অন্যান্য কারণ:
পানিশূন্যতা ও রক্তে শর্করার পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার কারণেও ঘুম থেকে উঠার পর কেউ অসুস্থ বোধ করতে পারেন বলে জানিয়েছেন ডা. ওয়াসি। স্লিপ অ্যাপনিয়া এমন একটি অবস্থা, যেখানে ঘুমের সময় হঠাৎ শ্বাস বন্ধ হয়ে যায় ও শুরু হয়, যা মাথাব্যথা, গলা ব্যথা এবং উদ্বেগের মতো লক্ষণের কারণ। শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যাঘাতের কারণে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে
ঘুমের সময় কী গুরুত্বপূর্ণ:
ডা. ওয়াসি বলেন, সবসময় ২০ মিনিট বা এর কম ঘুমানোর জন্য উৎসাহিত করা হয়। যদি ২০ মিনিটের বেশি ঘুম হয়, তাহলে তা গভীর ঘুমে রূপ নিতে পারে। কেননা, গভীর ঘুমের মধ্যে জেগে উঠা হলে তখন অপ্রীতিকর লক্ষণগুলো বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদি অল্প সময়ের মধ্যে শুয়ে পড়া যথেষ্ট মনে না করেন, তাহলে নিজেকে ৯০ মিনিটের একটি পূর্ণ ঘুম চক্র সম্পন্ন করার সময় দিন। রোগীদের ২০ মিনিট বা ৯০ মিনিটের ঘুম দিতে বলি আমি।
ডা. পোথুরি বলেন, যদি গ্যাস্ট্রো-ইনটেস্টাইনাল সমস্যা তৈরি করে, তাহলে আধ ঘণ্টার মধ্যে ঘুমানোর জন্য সময় রাখতে হবে। ২০ মিনিট ঘুমানোর পর পাচনতন্ত্র ধীর হয়ে যায়। অর্থাৎ, খাবার পেটে দীর্ঘক্ষণ থাকে। আবার পাশাপাশি সময় কম থাকার হলে পেটের অ্যাসিড খাদ্যনালীতে জ্বালাপোড়া করার জন্য সময়ও কম পায়।
Leave a Reply