দীর্ঘ ৭৫ দিন বন্ধ থাকার পর মূল ফটকের তালা ভেঙে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রবেশ করেছেন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে তালা ভাঙেন তারা। এ সময় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ১৫-২০ জন নেতাকর্মী ও অফিস সহকারী ছিলেন। পরে সেখানে কেন্দ্রীয়সহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত হন। এ সময় তারা সরকারবিরোধী নানা স্লোগান দেন।
ভেতরে প্রবেশের পর রিজভী সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত ২৮ অক্টোবর পুলিশ নারকীয় তাণ্ডব চালিয়ে কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে দেয়। ওই সময়ে কার্যালয়ের সামনে কেউ এলেই আটক করা হতো। সেই তালা ভেঙে নেতাকর্মীরা কার্যালয়ে ঢুকেছেন। কিন্তু এভাবে নিপীড়ন করে জনগণকে দমিয়ে রাখা যাবে না। গণতন্ত্রের বিজয় হবেই।
২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির মহাসমাবেশ কেন্দ্র করে ব্যাপক সংঘাত হয়। প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে সমাবেশ পণ্ড হয়ে যায়। ওইদিন থেকেই কার্যালয়ের মূল ফটকে তালা ছিল। কার্যালয়টির পাশে পুলিশের অবস্থান ছিল। বন্ধ ছিল গুলশানের বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ও। তবে ৮ জানুয়ারি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয় খুলে সংবাদ সম্মেলন করেন দলটির নেতারা।
মহাসমাবেশে সংঘর্ষের জেরে গ্রেফতার হন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র একাধিক নেতা। সারা দেশে অভিযানে মোট ২৫ হাজারের মতো নেতাকর্মী গ্রেফতার হন। এ অবস্থায় ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। বিএনপিসহ অনেকগুলো দল সেই নির্বাচন বর্জন করে। বুধবার নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা শপথ নেন, আবার নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম ঘোষণা হয়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তারা শপথ নেন।
সরেজমিন দেখা যায়, রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে হাতুড়ি দিয়ে তালা ভেঙে কার্যালয়ের ভেতরে যান নেতাকর্মীরা। কার্যালয়ের মূল ফটক থেকে প্রতিটি সিঁড়িতে ধুলার স্তর পড়ে আছে। ভেতরের মেঝেতে পত্রিকা, খাবারের প্যাকেট, ময়লা কাপড় এবং পানির বোতল। এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে আসবাবপত্র। বিএনপি নেতাকর্মীরা তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশের সময় পুলিশ বাধা দেয়নি।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, সেই দিনের তাণ্ডবের পর দেখেছেন আপনাদের চোখের সামনে তালা লাগিয়ে পুলিশ চাবি নিয়ে যায়। এরপর কত নাটক ওরা করেছে। আমরা পুলিশের কাছে চাবি চেয়েছিলাম। সেটা তারা দেয়নি। দেশের একটি নিয়মতান্ত্রিক কার্যকর রাজনৈতিক দল বিএনপি। এই দল বারবার রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে, দক্ষতার সঙ্গে। সেই দলের প্রধান কার্যালয় একটি মাফিয়াতন্ত্র, একটি মাফিয়া সরকার বন্ধ করে রেখেছিল।
তিনি বলেন, পুরো কার্যালয়ে কী ভয়ংকর ধুলোবালি জমেছে! এটা এখন আমাদের পরিষ্কার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্রের কথা বলেন। নিজেদের মধ্যে নিজেরা নির্বাচন করেন। নিজেদের জয়, নিজেদের পরাজয় এককভাবে ওদের নিজের জয়।
পরে কেন্দ্রীয় অনেক নেতা দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান। যাদের মধ্যে অনেকেই এতদিন আত্মগোপনে ছিলেন। কার্যালয়ে যান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম, বেগম সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী, জয়নুল আবদিন ফারুক, ফজলুর রহমান, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ, কেন্দ্রীয় নেতা শিরিন সুলতানা, মীর নেওয়াজ আলী, সেলিম রেজা হাবিব, তাইফুল ইসলাম টিপু প্রমুখ। সেখানে বিকালে সংবাদ সম্মেলনও করা হয়।
পুলিশের বক্তব্য : এদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় নিয়ে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে নিজেদের অবস্থান ও বক্তব্য জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ডিএমপি বলছে, বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় পুলিশ কখনোই তালা দিয়ে রাখেনি। ২৮ অক্টোবর সমাবেশ শেষে বিএনপি প্রধান কার্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মী সোহাগ কার্যালয়টিতে রাত্রিযাপন করেন। পরদিন সকালে কার্যালয়ের গেটে তালা দিয়ে চাবি নিয়ে অফিস ত্যাগ করেন। এ সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ ডিএমপির কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। কাজেই বিএনপি অফিসে তালা দেওয়া সম্পর্কিত রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্য সত্য নয়।
Leave a Reply