শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ট্রিলিয়ন অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ট্রাভেল পাস দেওয়া হবে না: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নে নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন মোংলা থেকে উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে: প্রধানমন্ত্রী এআই যেন দেশের বেকারত্ব আরও প্রকট না করে, সতর্ক করলেন রাষ্ট্রপতি লংমার্চে গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান হলে আমরাই করতাম: মীর শাহে আলম এইচএসসিতে এক-দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ২ ডিসেম্বর শুরু: শিক্ষামন্ত্রী গাজীপুরে কলকারখানায় স্বস্তি, কাজে ফিরছেন শ্রমিকেরা ২০২৭ সালের সরকারি ছুটির তালিকা প্রকাশ, প্রজ্ঞাপন জারি বগুড়ার নন্দীগ্রামে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপনে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত

অসুর-বিনাশীনি, মঙ্গলময়ী মা দূর্গা ও আমাদের পূজা অর্চনা

মৃণাল চৌধুরী সৈকত
  • আপলোডের সময় : সোমবার, ১১ অক্টোবর, ২০২১
  • ৩৮৬ বার

মৃণাল চৌধুরী সৈকত

অসুর-বিনাশীনি মঙ্গলাময়ী মা দূর্গা ও আমাদের পূজা অর্চনা সামান্য কিছু সারসংক্ষেপ তুলে ধরতেই আমার প্রয়াস। দেবী দূর্গা বা দূর্গা পূজা সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রহ্নানুসারে দূর্গা পূজার সূচনা, দূর্গা পূজা কেন, কখন, কোথায় কি ভাবে হয়েছিলো ? তা নিয়ে আজকের আলোচনায় আসা যাক। দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হল সনাতন ধর্মাম্বলীদের ‘দেবী দুর্গা’র পূজাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত একটি উৎসব। দুর্গা পূজা সমগ্র সনাতন বা হিন্দু সমাজেই যুগ যুগ ধরে প্রচলিত। তবে বাঙালী হিন্দু সমাজে এটি অন্যতম বিশেষ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। আশ্বিন বা চৈত্র মাসের শুক্ল পক্ষে দুর্গাপূজা করা হয়। আশ্বিন মাসের দুর্গা পূজা শারদীয়া দুর্গা পূজা এবং চৈত্র মাসের দুর্গা পূজা বাসন্তী বা দুর্গা পূজা নামে পরিচিত। শারদীয়া দুর্গা পূজার জনপ্রিয়তা সনাতন বা হিন্দু সম্প্রদায়ে বেশী। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে “দুর্গাষষ্ঠী”, “মহাসপ্তমী”, “মহাষ্টমী”, “মহানবমী” ও “বিজয়াদশমী” নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় “দেবীপক্ষ”। দেবীপক্ষের সূচনালগ্নের অমাবস্যাটির নাম মহালয়াা। এই দিন হিন্দুরা তর্পণ করে তাদের পূর্ব পুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধার্জ্ঞ নিবেদন করেন। দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হল কোজাগরী পূর্ণিমা। এই দিন সনাতন বা হিন্দু সম্প্রদায়ের অপর দেবী ‘লক্ষ্মী’র পূজা করা হয়। কোথাও কোথাও পনেরো দিন ধরে দুর্গা পূজা পালিত হয়। সে ক্ষেত্রে মহালয়ার আগের নবমী তিথিতে পূজা শুরু হয়। পশ্চিম বঙ্গের বিষ্ণুপুর শহরের মৃন্ময়ী মন্দির এবং অনেক পরিবারে এই রীতি আজো প্রচলিত আছে। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাতে মহাসপ্তমী থেকে বিজয়াাদশমী পর্যন্ত (শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মহাসপ্তমী থেকে কোজাগরী বা লক্ষ্মীপূজা পর্যন্ত) চার দিন সরকারি ছুটি থাকে। বাংলাদেশে বিজয়াদশমীতে সর্ব-সাধারণের জন্য মাত্র এক দিন এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য ৩ দিন সরকারি ছুটি থাকে। পারিবারিক দুর্গা পূজাগুলিতে শাস্ত্রাচার পালনের উপরই বেশী জোর দেওয়া হয়ে থাকে।
সৃষ্টির প্রথম যুগে পরমাত্মা কৃষ্ণ বৈকুণ্ঠের আদি-বৃন্দাবনের মহারাসমলে প্রথম দুর্গা পূজা করেন। এরপর মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুরের ভয়ে ব্রহ্মা দ্বিতীয় দুর্গা পূজা করেছিলেন। ত্রিপুর নামে এক অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে শিব বিপদে পড়ে তৃতীয় দুর্গা পূজার আয়োজন করেন। দুর্বাসা মুনির অভিশাপে লক্ষ্মীকে হারিয়ে ইন্দ্রদেব যে পূজার আয়োজন করেছিলেন, সেটি ছিল চতুর্থ দুর্গা পূজা। এরপর থেকেই পৃথিবীতে মুনিঋষি, সিদ্ধপুরুষ, দেবতা ও মানুষেরা নানা দেশে নানা সময়ে দুর্গা পূজা করে আসছে।
শাক্তধর্মের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে, ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু। মনু পৃথিবীর শাসক হয়ে ক্ষীরোদ সাগরের তীরে মাটি দিয়ে দুর্গার মূর্তি তৈরি করে পূজা করেন। ওই সময় তিনি “বাগ্ভব” বীজ জপ করতেন এবং আহার ও শ্বাস গ্রহণ ত্যাগ করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে একশো বছর ধরে তপস্যা করেন। এর ফলে তিনি শীর্ণ হয়ে পড়লেও, কাম ও ক্রোধ জয় করতে সক্ষম হন এবং দুর্গানাম চিন্তা করতে করতে সমাধির প্রভাবে স্থাবরে পরিণত হন। তখন দুর্গা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বর দিতে আসেন। মনু তখন দেবতাদেরও দুর্লভ একটি বর চাইলেন। দুর্গা সেই প্রার্থনা রক্ষা করেন। সেই সঙ্গে দুর্গা তার রাজ্যশাসনের পথ নিষ্কণ্টক করেন এবং মনুকে পুত্রলাভের বরও দেন ।
অপরদিকে, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-এ কৃষ্ণকে দুর্গা পূজার প্রবর্তক বলা হয়েছে। বিভিন্ন দেবদেবীরা কিভাবে দুর্গা পূজা করেছিলেন, তার একটি তালিকা ওই পুরাণে পাওয়াা যায়। তবে এ প্রসঙ্গে কোনো পৌরাণিক গল্পের বিস্তারিত বর্ণনা ওই পূরাণে দেওয়া হয়নি।
বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রহ্নানুসারে জানা যায়, দুর্গা পুজোর সূচনা হয়েছিল বহু প্রাচীন কালেই। দুর্গার পুজো শুরুর যথার্থ নথিপত্র না পাওয়া গেলেও, বৈদিক সাহিত্যে দুর্গার পরিচয় দেয়া আছে। বিভিন্ন তথ্যসূত্র মতে, সম্ভবত মোঘল আমল থেকেই ধনী পরিবারগুলোতে দুর্গা পুজো করা হতো। ইতিহাস সূত্রে, দেবীর পুজো সম্ভবত ১৫০০ শতকের শেষ দিকে প্রথম শুরু হয়। সম্ভবত দিনাজপুর-মালদার জমিদার স্বপ্নাদেশের পর প্রথম পারিবারিক ভাবে দুর্গা পুজো শুরু করেছিলেন। তবে এই দুর্গার রূপ ছিল অন্যরকম। লোককথা মতে আদি দুর্গার চোখ গোলাকার ও উজ্জ্বল এবং দেবী সাদা বাঘ ও সবুজ সিংহের উপর বিরাজ করেন।
অন্যান্য সূত্রানুসারে, তাহেরপুরের রাজা কংস নারায়নন বা নদীয়ার ভবানন্দ মজুমদার বাংলায় প্রথম শারদীয়া বা শরৎ দুর্গা পূজা সংগঠিত করেন। এরপরে রাজশাহীর রাজা এবং বিভিন্ন গ্রামের হিন্দু রাজারা প্রতি বছর এই পুজো করেন। আবার কলকাতায় ১৬১০ সালে বারিশার রায় চৌধুরী পরিবার প্রথম দূর্গা পুজার আয়োজন করেছিল বলে জানা যায়। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পর রাজা নব কৃষ্ণদেব লর্ড ক্লাইভের সন্মানে কলকাতার শোভা বাজার রাজবাড়িতে দূর্গা পূজার মাধ্যমে বিজয় উৎসবের আয়োজন করেছিলেন এবং তাঁর জন্য বিদেশ থেকে নিকি বাঈ নামে এক নর্তকীকে এনেছিলেন। ব্রিটিশ বাংলায় এই পূজা ক্রমশঃ বৃদ্ধি পায় এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দূর্গা পুজো স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে জাগ্রত হয়।
পূজা উপলক্ষে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনের-সমাগম হয়। অন্যদিকে আঞ্চলিক স্তরে এক একটি অঞ্চলের বাসিন্দারা যৌথ ভাবে যে দুর্গা পূজার আয়োজন করেন তা বারোয়াারি পূজা বা সার্বজনীন পূজা নামে পরিচিত।
সনাতন (হিন্দু) ধর্মাম্বলীদের বছরের সব চেয়ে ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে শারদীয়া শ্রী শ্রী দূর্গা দেবীর পূঁজা অর্চনা। ইতিমধ্যে এ সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। সারাবিশ্বে সনাতন বা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সোমবার ১১ অক্টোবর ২০২১ ইং মহা ষষ্টির মধ্যদিয়ে পূঁজা শুরু হয়েছে।
সারা বিশ্ব ন্যায় ব্যতিক্রম নেই টঙ্গীসহ গাজীপুর মহানগরের বিভিন্ন এলাকা। বিশ্বব্যাপী মহামারী কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস এবং এডিস মশার উপদ্রব বৃদ্ধি তথা ডেঙ্গু জ্বরের পার্দুভাব শিথিল হওয়ায় এ বছর পূঁজা অর্চনাকারীরা বেশ আমেজের সাথেই পূজা অর্চনা করবেন এমন মনোভাব অনেকের। হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে চলছে পুজার আমেজ। হয়ত তাই অনেকটা স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারী নির্দেশনা মেনেই সনাতন বা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন কেনাকাটা, প্রতিমা বা মন্দির সাঁজানো, অতিথি আপ্যাায়নের প্রস্তুতি সেরে নিয়েছেন। মন্দিওে মন্দিরে বাজছে ডাক, ঝাজর, ঘন্টা আর চলছে আরতি। বিভিন্ন তথ্যানুসারে গাজীপুর জেলায় সম্ভাব্য ৩০৯টি, দেশের বৃহত্তম গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এ বছর সম্ভাব্য ১০৩ টি। এর মধ্যে টঙ্গী পূর্ব থানা এলাকায় ৭ টি এবং টঙ্গী পশ্চিম থানা এলাকায় ২টি পূঁজা হওয়ার কথা রয়েছে।
মৃৎশিল্পীরা গত প্রায় ১৫ দিবস রাত-দিন এক করে একের পর এক বাহারী রংয়ে ফুটিয়ে তুলছেন দেবী দুর্গা, লক্ষি, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিকের প্রতিমা। বিভিন্ন পূঁজা মন্ডবে কাদা-মাটি, বাঁশ, খড়, সুতলি দিয়ে শৈল্পিক শ্রদ্ধায় তিলতিল করে গড়ে তোলা হয়েছে মহামায়া দেবী দুর্গাকে। এ বছর মহামারী করোনা বা ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়েছে সব ধরনের পূঁজা সংশ্লিষ্ট উপকরণের দাম। তাই এবার খরচ একটু বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন, পূঁজা উদ্যাপনকারী সংশ্লিষ্টরা। মৃৎশিল্পীরা জানান, অনেক দিন পরে একটু মন খুলে কাজ করতে পেরে খুব ভাল লেগেছে। করোনা ও ডেঙ্গুকালীন সময়ে সব ধরনের পণ্যের দাম বেশি হওয়ায় এবার পূঁজায়ও ব্যাপক খরচ গুনতে হচ্ছে। দেশে কোভিড-১৯ করোনা মহামারী চলছে, চলছে ডেঙ্গু জ্বরের প্রবণতা। তবে আগের চেয়ে করোনা বা ডেঙ্গু অনেকটা কম, ততাপিও সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মেনে, এবছরও শারদীয় দূর্গা দেবীর পূঁজা অর্চনা করা হবে।
এদিকে, গাজীপুর জেলা আইন শৃংখলা বাহিনী, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ, র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যটালিয়ন র‌্যাব, ডিবি পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাদ্বয় সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী সু-শৃংখল এবং শান্তিপূর্ণভাবে সনাতন ধর্মাম্বলীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয়া দূর্গা দেবীর পূঁজা উদ্যাপনে সকল প্রকার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানা গেছে। এছাড়া প্রতিটি পূঁজা মন্ডবে নিজ নিজ দায়িত্বে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহনের ক্ষেত্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, ২৪ ঘন্টা নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী বা ভলান্টিয়ার রাখা, স্বাস্থ্যবিধি যাতে করে উপেক্ষিত না হয় তার জন্য প্রতিটি মন্দির ও মন্দির প্রাঙ্গনে জন-সমাগম এড়িয়ে চলা, বাধ্যতামূলক মাস্ক ব্যবহার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও সাবান দিয়ে হাত ধুয়া বা স্প্রে’র ব্যবস্থা গ্রহনে পূঁজা অর্চনা এবং উদ্যাপনকারী সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশনা রয়েছে বলেও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

লেখক, মৃণাল চৌধুরী সৈকত
কবি, সাংবাদিক, সংগঠক

আমাদের সাথেই থাকুন

2 responses to “অসুর-বিনাশীনি, মঙ্গলময়ী মা দূর্গা ও আমাদের পূজা অর্চনা”

  1. Titon gosh says:

    Khov valo akti online

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর

Categories