ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান-নীতি অনেকটা তার নিজ রাজ্য ফ্লোরিডার আবহাওয়ার মতো। আপনার পছন্দ না হলে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন, বদলে যাবে। গত শুক্রবার (২০ মার্চ) মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, যুদ্ধ শিগগিরই ‘শেষ’ হতে পারে। তার মতে, সামরিক লক্ষ্যগুলোর বেশিরভাগই অর্জিত হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখলেও তাতে তিনি বিচলিত নন, কারণ আমেরিকা এই জলপথ ‘ব্যবহার’ করে না।
কিন্তু তার এই নমনীয় সুর টিকেছিল মাত্র শনিবার (২১ মার্চ) পর্যন্ত। সেদিন তিনি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার জন্য ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা হবে বলে হুঁশিয়ার করেন তিনি। তার এই বক্তব্য যুদ্ধ শেষের ইঙ্গিত তো দেয়-ই না, বরং নতুন অস্থিরতার শঙ্কা তৈরি করে।
ট্রাম্প সমর্থকদের দাবি, ক্ষণে ক্ষণে বক্তব্য পরিবর্তন তার কৌশলের অংশ। তবে অধিকাংশের কাছেই স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র একটি ত্রুটিপূর্ণ কৌশল নিয়ে এই যুদ্ধে প্রবেশ করেছে। যার প্রথম উদাহরণ, ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধের বিষয়টি আঁচ করতে না পারা।
চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশ করা ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের সামনে এখন চারটি পথ খোলা। আলোচনা, সরে আসা, বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা অথবা উত্তেজনা বাড়ানো। কিন্তু এখনও যদি তিনি কোনও পথ বেছে না নিয়ে থাকেন, তার কারণ কোনওটিই সন্তোষজনক নয়।
অল্পসংখ্যক কূটনীতিক এখনো বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সময় দু’বার হামলার শিকার হওয়ায় ইরান নতুন করে আলোচনায় যেতে অনিচ্ছুক।
শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমা আরোপ, এ ধরনের সীমিত চুক্তি যথেষ্ট হবে না। যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় বসলে আরও অনেক দাবি উত্থাপন করবে। যেমন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে কঠোর সীমা এবং দেশে দেশে মিলিশিয়াদের প্রতি সমর্থন বন্ধ করা। অন্যদিকে, ইরানও ক্ষতিপূরণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধের মতো দাবি তুলবে। কোনও পক্ষই এসব ইস্যুতে আপস করবে বলে আশা করা কঠিন।
যদি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করা সম্ভব না হয়, তবে ট্রাম্প সরাসরি যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টা করতে পারেন। কিছু উপদেষ্টা তাকে বিজয় ঘোষণা করতে উৎসাহ দিচ্ছেন। ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে, নৌবাহিনী ডুবে গেছে, ক্ষেপণাস্ত্র কারখানাগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে–এসব ঢালাও যুক্তি দিয়ে তিনি বিজয় ঘোষণা করতেই পারেন। তবে এতে যুদ্ধের সত্যিকারের সমাপ্তি ঘটবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা থেকে যাবে।
কারণ ইরান বলেছে, যুদ্ধ কতদিন চলবে, সে বিষয়টি তারা নির্ধারণ করবে। আর তারা যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখে, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে ট্রাম্পের বিজয় ঘোষণা ঠুনকো প্রমাণিত হবে।
তৃতীয় বিকল্প হলো বর্তমান অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আরও কয়েক সপ্তাহ বিমান হামলা চালাতে পারে, যা অনেক ইসরায়েলি কর্মকর্তা সমর্থন করেন। ওয়াশিংটনের কিছু কট্টরপন্থীও মনে করেন, আরও কয়েক সপ্তাহ হামলা চালালে ইরানের সরকার পতনও ঘটতে পারে।
তবে এসব পরিকল্পনা সফল হবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। ইরান হয়তো ভেঙে পড়বে, আবার নাও পড়তে পারে। যতদিন তারা বিচ্ছিন্নভাবে জাহাজে হামলা চালাতে পারবে, ততদিন প্রণালি বন্ধ রাখতেও সক্ষম হবে। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়বে এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হবে।
শেষ বিকল্প হলো উত্তেজনা বাড়িয়ে পরে তা কমানোর চেষ্টা। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গত রোববার (২২ মার্চ) এই প্রস্তাব দেন। সেক্ষেত্রে মার্কিন পদক্ষেপগুলো হবে, ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা, খারগসহ হরমুজের কাছে অবস্থিত তিনটি দ্বীপ দখল এবং ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করা।
তবে এই পথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নিয়মিত ড্রোন হামলার মুখে দখল করা দ্বীপ ধরে রাখা কঠিন হবে। পারমাণবিক স্থাপনায় অভিযান চালাতে হলে কয়েকদিন শত্রু এলাকায় অবস্থান করতে হতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় হামলা চালায়, তবে ইরান তাদের বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগারে হামলার হুমকি দিয়েছে। খারগ দ্বীপে হামলা হলে উপসাগরের তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলোতেও বড় আঘাত আসতে পারে। গত ১৮ মার্চ কাতারের এলএনজি প্লান্টে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যার ফলে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় ৩% পাঁচ বছর পর্যন্ত বন্ধ থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন কাতারি কর্মকর্তারা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিকল্পগুলোর কোনওটিই যুদ্ধের সমাপ্তি নিশ্চিত করবে না। ট্রাম্প বিজয় ঘোষণা করতে পারেন, কিন্তু ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধই রাখবে। কয়েক সপ্তাহ যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েও একই অচলাবস্থায় পড়া সম্ভব। উত্তেজনা বাড়ানো কোনও সমাধান নয়। আর খারগ দ্বীপ দখল করলেও যদি ইরান আলোচনায় রাজি না হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র কী করবে?
মোদ্দা কথা, যুদ্ধ শুরু করা সহজ ছিল, কিন্তু তা শেষ করাই ট্রাম্পের জন্য এখন সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।
Leave a Reply