২০২৬ সালের পুনে গ্র্যান্ড ট্যুর সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় কয়েক সপ্তাহ আগে নজরকাড়া আধিপত্য দেখিয়েছিল লি-নিং স্টার দল। বিস্ময়ের বিষয়, সেই দলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চীনা শীর্ষস্থানীয় সাইক্লিস্টই ছিলেন না। দৃশ্যটা অনেকের কাছেই ফ্রান্সের ২০১৮ ফুটবল বিশ্বকাপজয়ী দলের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিলিয়ান এমবাপ্পে থেকে এন’গোলো কানতে ও পল পগবা; ফ্রান্সের সেই সাফল্যের পেছনে ছিল পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান এবং দক্ষিণ ইউরোপে ছড়িয়ে থাকা শিকড়ের গল্প।
২০২৪-২৫ বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফির সময় অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের (এবিসি) ক্রীড়া উপস্থাপক ও প্রাক্তন ফুটবলার পল কেনেডি একটি চমকপ্রদ তথ্য তুলে ধরেন। তার তথ্য অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় অনূর্ধ্ব-১২ পর্যায়ে ক্রিকেট খেলা শিশুদের প্রায় ৪০ শতাংশই দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত।
কেনেডি এমনকি মন্তব্য করেন, ‘ভারতীয় বা দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত ক্রিকেটাররাই হয়তো ভবিষ্যতে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠবে।
এই বাস্তবতা আবারও স্পষ্ট হচ্ছে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। বিভিন্ন দলের স্কোয়াডেই এমন বহু ক্রিকেটার আছেন, যাদের শেকড় দক্ষিণ এশিয়ায়। টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্যমতে, এর মধ্যে পাকিস্তানেরই আছে অন্তত ৩০ জনের মতো। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ১০ জনই তো পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত। এর বাইরেও আছে যুক্তরাষ্ট্র-নেদারল্যান্ডসের মতো দলে।
পাকিস্তানি বংশোদ্ভূতদের মধ্যে অন্যতম আমিরাতের পেসার মুহাম্মদ জাওয়াদ উল্লাহ। মালাকান্দে জন্ম নেয়া ২৬ বছর বয়সি এই ক্রিকেটারের বিশ্বকাপ যাত্রা মোটেই সহজ ছিল না। জাওয়াদের কাছে ক্রিকেট শুরুতে ছিল নিছক বিনোদন। আট সদস্যের পরিবারে বড় হওয়া এই তরুণ টেনিস বল নিয়ে খেলতেন ফাঁকে ফাঁকে। কোনও কোচিং ছিল না, ছিল না কোনও কাঠামো।
২০২০ সালে জীবনে বড় মোড় আসে। পারিবারিক দায়িত্ব বেড়ে যাওয়ায় তিনি পাড়ি জমান আরব আমিরাতে। পরে ওমান উপসাগরের তীরে ছোট শহর খোর ফাক্কানে বসবাস শুরু করেন। জীবিকা পেলেও ক্রিকেটের সময় মিলত না। ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতে গিয়ে ভোর থেকে রাত; শরীরের ক্লান্তিতে ক্রিকেট যেন দূরের স্বপ্ন। যে সামান্য সময় পেতেন, সেটুকুও ছিল ধার করা।
জাওয়াদ বলেন, এক-দু’ঘণ্টার বেশি সময় পেতাম না। তখনও টেনিস বলেই খেলতাম, কারণ হার্ড বল ক্রিকেট খেলতে অন্তত পাঁচ-ছয় ঘণ্টা সময় দরকার।
নেদারল্যান্ডসের সাকিব জুলফিকার দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি। তার বাবা জুলফিকার আহমেদের ১৯৬৬ সালে সিয়ালকোটে জন্ম। ডাচ ক্রিকেটে খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে যুক্ত ছিলেন তিনি। সেই পথ ধরে তার তিন ছেলেই নেদারল্যান্ডসের হয়ে খেলেছেন।
জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক সিকান্দার রাজ়ার গল্প আবার আলাদা। সিয়ালকোট থেকে জিম্বাবুয়ে; এই যাত্রাপথে ক্রিকেটই প্রথম স্বপ্ন ছিল না। পাইলট হওয়ার ইচ্ছে, গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটিংয়ে ডিগ্রি; সব পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটই হয়ে ওঠে তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।
এদিকে, আগের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পারফরম্যান্স দিয়ে আলোচনায় উঠে আসেন যুক্তরাষ্ট্রের ফাস্ট বোলার আলি খান। ১০ ফেব্রুয়ারি আবার মুখোমুখি হবে দুই দল। যুক্তরাষ্ট্রের শায়ান জাহাঙ্গির থেকে ইংল্যান্ডের রেহান আহমেদ ও আদিল রশিদ, ইতালি ও স্কটল্যান্ড থেকে ওমান ও কানাডা; এই বিশ্বকাপ যেন আধুনিক অভিবাসনের মানচিত্র।
বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ৩০ জন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার
যুক্তরাষ্ট্র: শায়ান জাহাঙ্গির, আলি খান, মোহাম্মদ মহসিন
নেদারল্যান্ডস: সাকিব জুলফিকার
জিম্বাবুয়ে: সিকান্দার রাজ়া
ওমান: মোহাম্মদ নাদিম, শাকিল আহমেদ, হাম্মাদ মির্জা, ওয়াসিম আলি, শাহ ফয়সাল, নাদিম খান, শফিক জান, আমির কালিম
ইংল্যান্ড: রেহান আহমেদ, আদিল রশিদ
ইতালি: জাইন আলি, আলি হাসান, সৈয়দ নাকভি
স্কটল্যান্ড: সাফিয়ান শরিফ
কানাডা: সাদ বিন জাফর
ইউএই: মুহাম্মদ ওয়াসিম, মুহাম্মদ আরফান, জুনায়েদ সিদ্দিকি, আলিশান শরাফু, হায়দার আলি, মুহাম্মদ ফারুক, মুহাম্মদ জাওয়াদ উল্লাহ, মুহাম্মদ জোহাইব, রোহিদ খান, সোহাইব খান
Leave a Reply